ইমরুলের ব্যাটে মাশরাফির স্বপ্ন পূরণ

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৮:৫০ পিএম, ২১ অক্টোবর ২০১৮

‘শেরে বাংলার উইকেট আনপ্রিডিক্টেবল! আচরণ রহস্যময়। দুর্বোধ্য। তারওপর আট মাস পর আবার আন্তর্জাতিক ম্যাচ। টস জিতে ব্যাটিং না ফিল্ডিং করাই কি ভাল হতো না? উইকেটের আচার আচরণ, গতি প্রকৃতি বুঝে পরে ব্যাট করা যেত। তাতে হয়ত ঝুঁকি কম থাকতো।’

রোববার দুপুরে খেলা শুরুর আধা ঘন্টা পর থেকে বাংলাদেশ ইনিংসের মাঝামাঝি সময় অবধি শেরে বাংলার প্রেসবক্স, গ্যালারি, গ্র্যান্ডস্টান্ড আর টিভির সামনে বসে থাকা কোটি বাংলাদেশ সমর্থক সবার মুখেই ছিল এমন কথা; কিন্তু টাইগারদের ইনিংস শেষ হবার পর আর সে কথা কেউ বললেন না। কি করে বলবেন? বাংলাদেশের স্কোর যে ২৭০ পার হয়ে গেছে!

আগের দিন শেরে বাংলার উইকেট নিয়ে অনেক কথার ভিড়ে টাইগার ক্যাপ্টেন মাশরাফি তো বলেই রেখেছেন, ‘শেরে বাংলার উইকেট আনপ্রেডিক্টেবল! আচরণ রহস্যময়। দুর্বোধ্য। যার চরিত্র সত্যিই বোঝা দায়। কখন, কোন রকম আচরণ করবে- তা বোঝা দায়। ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ শুরু করে। হঠাৎ করেই আচরণ বদলে যায়। কিছু ডেলিভারি টার্ন হতে থাকে, আবার কিছু বল নিচু হয়ে আসে। তাই শেরে বাংলার উইকেট সম্পর্কে আগে থেকে বলা খুব কঠিন। তারপরও, সাধারণত ২৫০-৬০ রান হলে ম্যাচ ভাল হয়। আগে ব্যাট করা দলের জেতার সুযোগ বেশি থাকে।’

অধিনায়ক যেখানে আড়াইশোর বেশি রানকে মোটামুটি নিরাপদ ও ডিফেন্ড করার মত বলে মন্তব্য করেন, সেখানে টাইগারদের ২৭১ রান যে অনেক! এই স্কোর যথেষ্ট কিনা, তা বলে দেবে সময়। তবে যা হয়েছে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকার কথা অধিনায়ক মাশরাফির।

শুরুটা ভাল হয়নি। তবুও লক্ষ্য পূরণ হয়েছে মূলতঃ ওপেনার ইমরুল কায়েসের দায়িত্ব সচেতনতায়। কখনো কখনো অভিজ্ঞতা সবচেয়ে কার্যকর দাওয়াই। শেরে বাংলার রহস্যময় ও দূর্বোধ্য উইকেটে ইমরুলের খেলার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। শেরে বাংলায় তার ট্র্যাক রেকর্ডও বেশ সমৃদ্ধ।

দেশের মাটিতে ৩৭ ম্যাচে তার হাফ সেঞ্চুরি ছিল ৯টি। আর সেঞ্চুরি ছিল মাত্র একটি। যার সাত হাফ সেঞ্চুরি ও এক সেঞ্চুরি এই মাঠে। তামিম নেই, লিটন দাসের সাথে ইমরুলের অভিজ্ঞতা এবং ঘরের মাঠে ভাল খেলার রেকর্ডটাই মূল্যায়তি হলো। তাই নাজমুল হোসেন শান্তকে বসিয়ে রেখে ইমরুলকেই খেলানোর সিদ্ধান্ত হলো।

যদিও ভবিষ্যতের কথা ভেবে শান্তর কথাও ভাবা হয়েছিল। সকালে প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদিন নান্নুর কথায় মিলেছিল তেমন ইঙ্গিত; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইমরুলে আস্থা। আর শেষ পর্যন্ত তাতেই রক্ষা। ইমরুল খেললেন। দলের সংকটে ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ন হলেন। আস্থা-আত্ববিশ্বাসের প্রতিমূর্তি হয়ে জিম্বাবুইয়ান বোলারদের সব বোলিং প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিলেন।

তার সাহসী, শুধু দলের বিপদে শক্ত হাতে হাল ধরা, চাপের মুখে ঝুঁকিপূর্ণ শটস খেলার বদলে রয়েসয়ে সিঙ্গেলস-ডাবলসে খেলে খেলে পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে এক সময় খোলস পাল্টে বেশ কিছু চটকদার ও ‘বিগ শটস’ হাঁকিয়ে মাঠ গরম করে ভক্ত ও সমর্থকদের প্রচুর আনন্দও দিলেন।

পরিসংখ্যান সে সাক্ষীই দিচ্ছে। ইমরুল পঞ্চাশে পা রাখলেন ৬৪ বলে। শতক পূর্ণ করতে খেললেন ১১৮ বল। এবং শেষ ২২ বলে করলেন ৪৪। সব মিলে ১৪০ বলে ১৪৪ রানের দুর্দান্ত ইনিংস।

এমন এক অবিস্মরনীয় ইনিংস খেলার পথে ৭ রানে একবার জীবন পেয়েছেন। জিম্বাবুইয়ান পেসার তিরিপানোর বলে ফ্লিক করতে গিয়ে ডিপ স্কোয়ার লেগে সীমানার ১ গজ সামনে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন ইমরুল; কিন্তু ফিল্ডার মাভুতা বলের ফ্লাইট নির্ণয় করতে ভুল করে বসেন। বল তার হাতে লেগে মাটিতে পড়ে সীমানার ওপারে চলে যায়।

এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তামিম ইকবালের (১৫৪) পর মুশফিকুর রহীমের সাথে যৌথভাবে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ওয়ানডে ইনিংসটির মালিক বনে গেছেন মেহেরপুরের এ বাঁ-হাতি ওপেনার। রেকর্ড ইনিংস খেলার পথে ইমরুল বন্ধু হিসেবে পেলেন দুই তরুণ মিঠুন ও সাইফউদ্দিনকে।

দলের বিপদ ও সংকট কাটাতে ইমরুলের প্রথম সঙ্গী মিঠুন। ৬৬ রানে লিটন, ফজলে রাব্বি আর মুশফিক ফেরার পর চতুর্থ উইকেটে মিঠন আর ইমরুলের ৭১ রানের জুটিতে শুরুর ধাক্কা সামলে ওঠে বাংলাদেশ। জিম্বাবুইয়ান স্পিনারদের বেধড়ক পিটিয়ে ৪০ বলে তিন বিশাল ছক্কায় ৩৭ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে জিম্বাবুইয়ান বোলিংকে এলোমেলো করে দিয়ে যান মিঠুন।

আর পরের অংশে ইমরুলের সাথে ছিলেন আরেক তরুণ সাইফউদ্দিন। ধরা হয় অলরাউন্ডার; কিন্তু আগের তিন ওয়ানডেতে (সর্বোচ্চ সংগ্রহ ১৬, তিন ম্যাচের ৩০ রান) একবারের জন্য নিজের ব্যাটিং সামর্থ্য জানান দিতে পারেননি সাইফউদ্দিন।

আজ দলের প্রয়োজনে নিজেকে মেলে ধরেছেন এ তরুণ। বিকেএসপিতে থার্ড সিমার হিসেবে খেলতে নেমে বেশি সমীহ আদায় (৩২ রানে ৩ উইকেট দখল করেছিলেন) করে নিয়েছিলেন জিম্বাবুয়ানদের কাছ থেকে। সেই সুবাদে ১১ জনে সুযোগ পাওয়া। না হয় জ্বর ও টনসিল থেকে সেরে ওঠা রুবেলের বদলে থার্ড সিমার হিসেবে খেলতেন আবু হায়দার রনি। মূলতঃ বোলার হিসেবে সুযোগ পেয়ে এ ম্যাচে ক্যারিয়ার সেরা ব্যাটিং করেছেন সাইফউদ্দিন।

সপ্তম উইকেটে ইমরুল আর তার ১২৭ রানের বড় জুটিতেই পাল্টে যায় বাংলাদেশের ইনিংসের চালচিত্র। বেশির ভাগ সময় ইমরুলকে সাপোর্ট দেয়ার চেষ্টায় থাকা সাইফউদ্দিন এক সময় ক্যারিয়ারের প্রথম ওয়ানডে ফিফটিও হাঁকিয়ে বসলেন। শেষ পর্যন্ত তার ব্যাট থেকে আসলো ৬৯ বলে ৫০ রানের এক অতি কার্যকর ইনিংস।

ভাবা যায়, ইনিংসের মাঝামাঝি (২৫ ওভার) টাইগারদের স্কোর ছিল ৩ উইকেটে ১১৯, ৪০ ওভার শেষেও রান ৬ উইকেটে ১৮৬। সেই দল ৫০ওভার শেষে করলো ২৭১। শেষ ১০ ওভারে যোগ হলো ৮৫ রান। ইমরুলের ঝড়ের গতির ব্যাটিংয়েই শেষ দিকে রান গতি বাড়লো।

এআরবি/আইএইচএস/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :