সাকিব তামিম মুশফিকদের টেস্ট ব্যাটিং কোচ হচ্ছেন ওয়াসিম জাফর?

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৯:৪৮ এএম, ২৬ মার্চ ২০১৯

৪১ বছর বয়সে ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের শীর্ষ আসর প্রিমিয়ার লিগ খেলতে এসে এখন পর্যন্ত এমন কিছু করেননি যে স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে থাকবেন। ব্রাদার্স ইউনিয়নের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ৮ রান। আর পরের ৩ ম্যাচে ৭৬, ৯৪ ও ৩৮।

ঢাকার ক্রিকেটে বিদেশী ব্যাটসম্যানদের এমন পারফরম্যান্স ও এর চেয়ে দ্যুতিময় ব্যাটিং নৈপুণ্য আছে ভুরিভুরি। কিন্তু ওয়াসিম জাফর তারপরেও অনেকের মন জয় করেছেন। কারণ, ইতিহাস জানাচ্ছে ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে ৪১ বছর বয়সে কোনো বিদেশী ক্রিকেটারের অংশগ্রহণের রেকর্ড নেই।

ওয়াসিম জাফরের আগে আগে দুই পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান কামাল মার্চেন্ট ও মনিরুল হকও চল্লিশ ছুঁইছুঁই বয়সে আবাহনীর হয়ে প্রিমিয়ার লিগ খেলেছেন। পাকিস্তান ঘরোয়া ক্রিকেটের ঐ দুই নামী ও পরিচিত মুখ নব্বই দশকের শুরুতে খেলে গেছেন ঢাকার ক্রিকেটে। কামাল মার্চেন্ট এসেছিলেন দামাল স্মৃতি টুর্নামেন্টের সেমিফাইনাল ও ফাইনাল খেলতে। আর মনিরুল পুরো লিগ খেলে এক আসরে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়েছিলেন।

৪১ বছর বয়সী ওয়াসিম জাফর যে তাদেরও বড়। সোজা ব্যাটে, স্বচ্ছন্দে, অনায়াসে বলের মেধাগুণ বিচার করে প্রতিপক্ষ বোলারদের মাথাব্যথার কারণও হচ্ছেন। সৌম্য, সাব্বির, মোসাদ্দেক, মিঠুন, জহুরুলদের মতো প্রতিষ্ঠিত ও নামী পারফর্মার থাকার পরেও ওয়াসিম জাফর এখন আবাহনীর সবচেয়ে বড় ব্যাটিং নির্ভরতা।

কোচ খালেদ মাহমুদ সুজনের সন্তুষ্টি এই চলিশোর্ধ ব্যাটসম্যানের ওপর পুরোপুরি। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহামেডানের বিপক্ষে সোমবার শেরে বাংলায় ম্যাচ জয়ের পর আবাহনী ড্রেসিংরুমের সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপে সুজন জানিয়ে দিলেন সে সন্তুষ্টির কথা।

সুজনের ভাষ্যে, ‘আমরা যে চিন্তায় ওয়াসিম জাফরকে এনেছিলাম তা অনেকটাই সফল। সে অতি দ্রুত আমাদের কন্ডিশন এবং প্রতিপক্ষ বোলিং বুঝে ফেলেছে। সে অনুযায়ী পারফর্মও করছে।’

বলার অপেক্ষা রাখে না খালেদ মাহমুদ সুজন শুধু আবাহনীরই কোচ নন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক এবং গেম ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যানও। সেই আলোকেই কথা প্রসঙ্গে একটা বড় তথ্য দিয়েছেন খালেদ মাহমুদ সুজন।

wasim

প্রশ্ন ছিলো, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়ান ও ইংলিশরা ফাস্ট-বাউন্সি ট্র্যাকে খেলার অভিজ্ঞতা দিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং টেকনিক ও টিপস দিতে আসেন। তাদের বেড়ে ওঠা ও ক্রিকেট চর্চা যে উইকেট ও কন্ডিশনে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের পিচের মিল নেই একদমই। তারা দ্রুতগতির ও হাই বাউন্সি পিচে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশের স্লো-লো ট্র্যাকে কতোটা কার্যকর কৌশল শেখাতে পারেন? তার চেয়ে ওয়াসিম জাফরের মতো উপমহাদেশের কোনো অভিজ্ঞ, বিশেষ করে দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে একজন সফল পারফরমারের হাতে কী দেশের তরুণদের ব্যাটিং কোচের ভার দেয়া যায় না?

সুজনের জবাব, ‘একাডেমি কিংবা হাইপারফরম্যান্স ইউনিট নয়, আমরা তো ওয়াসিম জাফরকে জাতীয় দলের টেস্ট ব্যাটিং কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়ার কথা ভাবছি।’ তাৎক্ষণিকভাবে আর কিছু বলতে রাজি হননি খালেদ মাহমুদ সুজন।

তবে হাবভাব ও আকারইঙ্গিতে যেহেতু এ মুহূর্তে জাতীয় দলে টেস্টের কোনো ব্যাটিং কোচ নেই, দক্ষিণ আফ্রিকার নেইল ম্যাকেঞ্জি সীমিত ওভারের ব্যাটিং কোচ, তাই ভারতীয় ওয়াসিম জাফরকে টেস্টে ব্যাটিং কোচ করার চিন্তাভাবনা চলছে এবং তাকে প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে। ওয়াসিম জাফর এ প্রস্তাবে রাজি হলে হয়তো বাংলাদেশের টেস্ট ব্যাটিং কোচ হিসেবে দেখা যেতে পারে তাকে।

ওয়াসিম জাফল হলেন ষষ্ঠ ভারতীয় ব্যাটসম্যান যার প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে রয়েছে ১৮ হাজারের বেশি রান। ভারতের দুই কিংবদন্তি কিংবন্তিতুল্য ব্যাটসম্যান দিলীপ ভেংসরকার (১৭৮৬৮) ও গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথও (১৭৯৭০) রান সংখ্যায় তার চেয়ে পিছিয়ে।

বাংলাদেশে খেলতে আসার কদিন আগেও ইরানি ট্রফিতে ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন ওয়াসিম জাফর। বলার অপেক্ষা রাখে না ইরানি ট্রফিতে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রান তার। তিনি পঞ্চম ভারতীয় যিনি চল্লিশ বছর বয়সেও ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন এবং প্রথম ভারতীয় এবং এশিয়ার প্রবীণতম ব্যাটসম্যান হিসেবে ২৫০ রান করার কৃতিত্বের অধিকারী।

প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে যার রেকর্ড বিস্ময়কর। ২৫৩ ম্যাচের ৪১২ ইনিংসে ৩৮বার অপরাজিত, ১৯১৪৭ রান, সর্বোচ্চ ৩১৪ নটআউট, ৫১.১৯ গড়, ৫৭টি শতক ও ৮৮টি অর্ধশতক। টেস্ট পরিসংখ্যানও একদম ফেলনা নয়। ৩১ টেস্টের ৫৮ ইনিংসে ৫ সেঞ্চুরি ও ১১ হাফসেঞ্চুরি তার নামের পাশে। ঐ পাঁচ সেঞ্চুরির আবার দুটি ডাবল সেঞ্চুরি।

ভারতের প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশী রানের তালিকায় পাঁচ নম্বরে রয়েছেন ওয়াসিম জাফর। কীর্তিমান ব্যাটসম্যান সুনিল মনোহর গাভাস্কারের (২৫৮৩৪), ক্রিকেটের বিস্ময়কর প্রতিভা শচিন টেন্ডুলকার (২৫৩৯৬ ), রাহুল দ্রাবিড় (২৩৭৯৪), ভিভিএস লক্ষণ (১৯৭৩০), ওয়াসিম জাফর (১৯১৪৭) ও বিজয় মার্চেন্ট হাজারে (১৮৭৪০)।

 

কাজেই বলার অপেক্ষা রাখে না দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে তিনি কতটা দক্ষ, পারদর্শী ও সফল। উপমহাদেশের কন্ডিশনে কীভাবে ভালো খেলা যায়, দীর্ঘসময় উইকেটে থাকার ধৈর্য্য-মনোযোগ-মনোসংযোগ কীভাবে বাড়াতে হয়, কোন লেন্থ ও ডিরেকশনে বল করলে না খেলে ছেড়ে দেয়া নিরাপদ- তা খুব ভালো জানা এ ওয়াসিম জাফরের।

এখনো খেলার মধ্যে থাকা এই অভিজ্ঞ ও কুশলী ব্যাটিং যোদ্ধা তামিম, মুশফিক, সাকিব, মাহমুদউল্লাহ, সৌম্য, লিটন, মুমিনুলদের ব্যাটিং কোচ হলে তো ভালোই হয়? কী বলেন?

এআরবি/এসএএস/জেআইএম