যেভাবে একটি ক্রিকেট জাতি হয়ে উঠল বাংলাদেশ

রফিকুল ইসলাম
রফিকুল ইসলাম রফিকুল ইসলাম , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১২:৪৫ পিএম, ২৩ মে ২০১৯

কথায় আছে বাঙালির প্রাণের খেলা ফুটবল। এই বঙ্গের ভূমিতে এক সময় ফুটবলের ছিল একচেটিয়া রাজত্ব। শহর, গ্রাম, পাড়া-মহল্লা বিকেল হলেই মেতে উঠতো ফুটবল নিয়ে। বাংলাদেশের খেলাধূলার সেই দৃশ্যপট বদলে গেছে ব্যাপকভাবে।

প্রাণের খেলা ফুটবলই আছে; কিন্তু লাল-সবুজের দেশ এখন ক্রিকেটেরও। ফুটবল বাঙালির মনে লুকিয়ে থাকলেও ক্রিকেট বেরিয়ে এসেছে আপন মহিমায়। দৃশ্যটাও বদলেছে। এখন এখানে-সেখানে ফুটবল নয়, ক্রিকেট নিয়েই মেতে থাকছে কিশোর-যুবারা। ক্রিকেটের মাঝেই যুবশ্রেণী খুঁজে পায় ক্রীড়াবিদ হয়ে জীবন গড়ার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। তরুণ বয়সে এখন ছেলেমেয়েদের বেশি টানে ক্রিকেট। নাম-যশ আর অর্থ- দুটির নিশ্চয়তাই যে বেশি এখানে!

অতীত ঘাঁটলে দেখা যায় এক সময় ফুটবল-ক্রিকেট ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতো দেশের প্রধান ক্রীড়া ভেন্যু বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। সকাল থেকে ক্রিকেট ম্যাচ। বিকেলে ক্রিকেটের খেলা শেষ হলেই গোলপোস্ট স্থাপন করে তারপর ফুটবল। এমনও সময় গেছে অর্থসংকট কাটাতে ক্রিকেটের সহায়তায় এগিয়ে আসতো ফুটবল। এখন সেই ক্রিকেট নিজেরাতো সাবলম্বীই, অনেক ছোট ছোট ফেডারেশনকে আর্থিকভাবে সহায়তাও করে আসছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।

বাংলাদেশের ক্রিকেট বদলে যেতে শুরু করে ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকেই। ফুটবলের জাতি হিসেবে পরিচিত বাঙালিরা আপন করে নেয় ক্রিকেটকেও। মাঠের সাফল্যই লাল-সবুজের দেশের মানুষকে আস্তে আস্তে আসক্ত করে ক্রিকেটে। সেই যে ইতিবাচক যাত্রা শুরু। এখন সেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে আপন মহিমায়। গৌরবের দ্বীপ্ততায়।

একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশের ক্রিকেটের সব আলো থাকতো ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলোতে। ঢাকা লিগ, দামাল সামার ক্রিকেট- সে কি জমজমাট আয়োজন! বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের দর্শক উপচে পড়া গ্যালারি তখন ক্রিকেটের নেশায় বুদ। স্থানীয় ক্রিকেটারদের সঙ্গে তখন ঝাঁকেঝাঁকে বিশ্ব তারকারা ঢাকার ক্রিকেটে। ওয়াসিম আকরাম, অর্জুনা রানাতুঙ্গা, ইলিংওয়ার্থ, নেইল ফেয়ার ব্রাদার, শোয়েব আখতার, অজয় সাজেদা, গাস লগি, জয়সুরিয়া, রমন লাম্বাসহ বিশ্ব তারকারা তখন রাঙিয়েছেন ঢাকার ক্রিকেট।

১৯৯৭ সালে আইসি চ্যাম্পিয়ন হওয়া, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নিয়ে যায় অন্য উচ্চতায়। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো কুলীন আসরে অভিষেকেই পাকিস্তানের মতো পরাশক্তিতে হারিয়ে বাংলাদেশ জানান দেয় তাদের আগমনী বার্তা। ইংল্যান্ডের মাটিতে পাকিস্তানকে হারানোর ২০ বছর পর সেই ইংল্যান্ডে আবার বিশ্বকাপ খেলতে গেলেন টাইগাররা।

পাকিস্তানের পাশপাশি বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম অংশ গ্রহণের বছর বাংলাদেশ হারিয়েছিল স্কটল্যান্ডকেও। তখনো বাংলাদেশ আইসিসির সহযোগী সদস্য। এরপরের বছরই আইসিসি বাংলাদেশকে দেয় পূর্ণাঙ্গ সদস্য পদ। ওই বছরের ২৬ জুন দিনটি বাংলাদেশের নাম লেখা হয়ে যায় ক্রিকেটর ঐতিহাসিক পাতায়।

বিশ্বকাপ খেলাই যেখানে ছিল স্বপ্নের মতো ব্যাপার। ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়াটা ছিল কল্পনা, সেখানে বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাসও নিয়ে নেয় দ্রুত। ২০০০ সালে ওয়ান ডে স্ট্যাটাস, একই বছরে টেস্ট স্ট্যাটাস লাভ এবং ভারতের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। দিনটি ছিল ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর। নাঈমুর রহমান দূর্জয় বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক। ভারতের সৌরভ গাঙ্গুলির সঙ্গে যখন টস করতে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের পিচে দাঁড়িয়েছিলেন দূর্জয়, তখনকার দৃশ্যটা এখনো লেগে আছে চোখের পাতায়। সেই ঐতিহাসিক সময়ের স্বাক্ষী হতে পারাটাওতো কম সৌভাগ্যের ছিল না।

akram

প্রথম টেস্ট। ভারতের কাছে ৯ উইকেটের হার। সেটাই স্বাভাবিক; কিন্তু ওই টেস্টে বাংলাদেশের প্রাপ্তিও যে কম ছিল না! প্রথম ইনিংসে ৪০০ রান। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ১৪৫ রান। মনে রাখার মতো উপাদান তো কম ছিল না বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে।

ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়ার পর বাংলাদেশের ক্রিকেটের পথচলাটা অবশ্য মসৃন ছিল না। ছিল না মাঠে পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা। এক ম্যাচ জিতেছে তো আবার টানা কয়েকটিতে হার। এভাবে পোড় খেয়ে খেয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশ্বে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে।

দলীয় কী ব্যক্তিগত- বাংলাদেশের ক্রিকেট মাঝেমধ্যেই বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। সাকিব আল হাসান বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার হয়েছেন, তিনি দেশের অন্যতম সেরা তারকা। এক সাকিবের কারণে হাজার হাজার তরুণ নিজেদের নিয়ে এসেছে ক্রিকেটের আলোয়। সাকিবকে দেখে ক্রিকেটের ব্যাট-বল হাতে নিয়েছে হাজার কিশোর-যুবারা। সব কিছুই বাংলাদেশের হয়েছে ধারাবাহিকভাবে।

আসন্ন বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অংশ নিচ্ছে ইতিহাসের প্রথম একটি ফাইনাল জেতার সুখস্মৃতি নিয়ে। আয়ারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ ফাইনালে হারিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। এই শিরোপা জয়ে একদিকে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মনোবল বেড়েছে। অন্যদিকে দর্শক-সমর্থকদের আশার পারদ তরতর করে উঠেছে উপরের দিকে। ইংলিশ কন্ডিশনে বাংলাদেশেন পক্ষে ভালো কিছু করতে নিজেদের সেরাটাই দিতে হবে; কিন্তু ১৯৯৯ সালের স্মৃতি হাতড়ে অনেকেই আরো ভালো কিছুর প্রত্যাশায়। এবারের ফরম্যাট বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি ম্যাচ জয়ের হাতছানিও যে আছে।

বাংলাদেশ এখন ক্রিকেটের জয়োগানে মশগুল। বিশ্বকাপ নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়েছে আগেই। দর্শকরা চুলচেরা বিশ্লেষণে নেমেছেন বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে। কী করবে বাংলাদেশ? সাকিব-তামিমরা কী পারবেন দেশের কোটি সমর্থকদের প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভালো ফলাফল করে ফিরতে? প্রশ্নের জবাটা সময়ই দেবে। তবে বিশ্বকাপ নিয়ে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। আকাশচুম্বি প্রত্যাশাতো আছেই।

বাংলাদেশে ফুটবল না ক্রিকেট এক নম্বর খেলা। কয়েক বছর আগে এমন বিতর্কের কোনো ভিত্তিই ছিল না। ফুটবলের জনপ্রিয়তার কাছে নস্যি ছিল ক্রিকেট; কিন্তু এখন তুলনা করতে গেলে অনেকে মাথা চুলকাবেন। কারণ, ফুটবল তার জনপ্রিয়তা ধরে রাখলেও ক্রিকেট জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে নিয়েছে অনেক।

বাংলাদেশের ক্রিকেট এখানে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে শতশত ক্রিকেটারের শ্রম, ঘাম আর নৈপূণ্য। হালের তামিম, মুশফিক, সাকিব, রিয়াদ, সৌম্য, সাব্বির, মুস্তাফিজ, তাসকিন, লিটন এবং অতীতের গাজী আশরাফ হোসেন লিপু, মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, আকরাম খান, নাঈমুর রহমান দুর্জয়, খালেদ মাসুদ পাইলট, খালেদ মাহমুদ সুজন, হাবিবুল বাশার সুমন আর মোহাম্মদ আশরাফুলদের ২২ গজের নৈপূণ্য মিলেই বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব দরবারে।

আরআই/আইএইচএস/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :