লন্ডনে বিশ্বকাপের চেয়ে বেশি উন্মাদনা ইউসিএল ফাইনাল ঘিরে

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা লন্ডন থেকে
প্রকাশিত: ০৮:৩০ এএম, ০১ জুন ২০১৯

আচ্ছা! একবার কল্পনা করুন তো, ভারত, পাকিস্তান কিংবা শ্রীলঙ্কার সাথে যৌথ আয়োজক নয়- বাংলাদেশই বিশ্বকাপের একমাত্র আয়োজক দেশ। বিশ্বকাপের আসর যুক্তরাজ্যে নয়, হচ্ছে বাংলাদেশে। রাজধানী ও ক্রীড়াকেন্দ্র ঢাকা, খুলনা ও সিলেটে হচ্ছে বিশ্বকাপ।

অবশ্যই গোটা বাংলাদেশ কাঁপবে বিশ্বকাপ জ্বরে। বাংলাদেশ মেতে থাকবে ক্রিকেটের বিশ্বযজ্ঞ নিয়ে। হৈচৈ, শোরগোল, প্রাণচাঞ্চল্য, আকর্ষণ আর উত্তেজনায় ভরে থাকবে গোটা বাংলাদেশ। আর রাজধানী ঢাকা হবে তখন ক্রিকেটের নগরী।

ঈদের মত সর্ববৃহৎ ধর্মীয় তথা সামাজিক উৎসবের মাঝেও বিশ্বকাপ ঢুকে যেত। ঘরমুখো মানুষ ছাড়া অন্তত ৫০ ভাগ ঢাকাবাসীর ধ্যানজ্ঞান হয়ে উঠতো বিশ্বকাপ ক্রিকেট। ব্যক্তি, সামাজিক ও নাগরিক জীবনে বড় পর্বন ঈদের মাঝেও বিশ্বকাপ ঠিক ঢুকে যেত। ঈদের বাজারেও ক্রিকেট নিয়ে কথা হতো, হৈচৈ-শোরগোলও হতো। একটা অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য কাজ করতো সবার মাঝেই।

কী ভাবছেন লন্ডনেও বুঝি তেমন? গোটা লন্ডন জুড়ে বুুঝি বিশ্বকাপ আমেজ। সবাই মেতে ক্রিকেটের বিশ্ব আসর নিয়ে। লন্ডনবাসীও বুঝি ক্রিকেট নিয়েই মাতোয়ারা। কি তাই না? আসলে কিন্তু বিষয়টি মোটেই তা নয়। বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে সবে। এখনই শেষ কথা বলার সময় আসেনি। তবে এখনকার খবর, সে অর্থে বিশ্বকাপ এখনো সেভাবে জেঁকে বসতে পারেনি ইংলিশদের ব্যক্তি ও নাগরিক জীবনে। রাষ্ট্রীয় জীবনেও না। লন্ডন শহরের অনেকটা পথ ঘুরে মনেই হয়নি এ শহরেই বসেছে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের মহাযজ্ঞ।

স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটায় (বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে নয়টা) হিথরো বিমানবন্দরে পা রেখে মনেই হয়নি যুক্তরাজ্যের অন্যসব প্রধান শহরের মত লন্ডনেও বিশ্বকাপের ম্যাচ হচ্ছে। অথচ ২০ বছর পর ক্রিকেট ফিরেছে আপন ঠিকানা তথা নিজ জন্মভূমিতে। সেই ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ যখন প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলেছিল, সেবারই শেষ বিশ্বকাপের স্বাগতিক ছিল যুক্তরাজ্য।

এবার আবার ক্রিকেটের জন্মভুমিতে ফিরেছে বিশ্বকাপ। খুব স্বাভাবিকভাবেই লন্ডনবাসীর উৎসাহ, আগ্রহ, উদ্দীপনা ও প্রানচাঞ্চল্যতা বেশী থাকার কথা। তার ওপর এবার তাদের দল মানে টিম ইংল্যান্ড আছে দারুণ ফর্মে। হয়ত নিজেদের বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে উজ্জ্বল ইংলিশরা। এবারের অন্যতম ফেবারিটও ধরা হচ্ছে ইংলিশদের।

কাজেই নিজ জাতীয় দলের সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেও হয়ত তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা একটু বেশি থাকার কথা। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরুর ৪৮ ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও লন্ডন শহরে পা রেখে তার কিছুই বোঝা গেল না। কোন উৎসাহ-উদ্দীপনা, হৈচৈ শোরগোল, কিছুই চোখে পড়েনি। কোন আগুন্তুক-পর্যটক লন্ডন শহরে এসে বুঝবেন না, এ শহরে বসেছে বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আসর। আগের দু'দিন খেলা হয়েছে এ শহরে।

স্থানীয় সময় বিকেলে হিথরো বিমান বন্দরে অবতরনের পরই ধাক্কা খেলাম, সে কি বিশ্বকাপ হচ্ছে যে শহরে, সেখানে আইসিসি বা স্বাগতিকদের সুসজ্জিত, বর্ণাঢ্য ব্যানার, ফেষ্টুন- কিছুই নেই। শুধু বিমানবন্দর কেন, হিথরো থেকে লন্ডন শহরের একটা বড় অংশ ঘুরেও বোঝার উপায় ছিল না, এখানে বিশ্বকাপের খেলা হচ্ছে।

বড় বড় আর আকর্ষণীয় তোড়ন নির্মাণ তো বহু দূরে, পুরো লন্ডন শহরের কোথাও আইসিসি বিশ্বকাপ সম্বলিত ব্যানার, ফেস্টুনও চোখে পড়েনি। তা নয়, নাই দেখা গেল, আজকাল ডিজিটাল যুগ। প্রতিটি বড় বড় শহরে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। তেমন একটি বিজ্ঞাপনও দৃশ্যমান হলো না।

তবে হ্যাঁ, একটি ডিজিটাল বিজ্ঞাপন আছে মোড়ে মোড়ে। হিথরো বিমানবন্দর থেকে ইষ্ট লন্ডনে আসতে প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকায় অন্তত ২০ টি ডিজিটাল ব্যানার কিছুক্ষণ পর পর চোখে পড়েছে। গাড়ী, বাসে আর মোটরবাইকে করে যাওয়া পথচারির চোখের সামনে লিখা ভেসে উঠছে মিনিট দুই তিনেক পর পরই।

UCL

সেটা ক্রিকেটের নয়, ফুটবলের। ইংল্যান্ড তথা ইংলিশ ফুটবলের দুই ঐতিহ্যবাহী দল টটেনহ্যাম আর লিভারপুল এবার উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল খেলছে। রাত পোহালেই স্পেনের মাদ্রিদ শহরে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারনী ফাইনাল- তা নিয়েই বরং উৎসাহ, আগ্রহ বেশি।

হিথরো থেকে ইষ্ট লন্ডন উবারে আসতে পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত চালক সিকান্দার আলির সঙ্গে কথা বলে মনে হলো লন্ডনবাসী আপাতত টটেনহ্যাম আর লিভারপুল ফাইনাল নিয়েই অধিক উৎসাহী। লন্ডনবাসীর উৎসাহ-আগ্রহটা বেশি বলেই সব প্রধান সড়কের মোড়ে ডিজিট্যাল ব্যানারে টটেনহ্যাম আর লিভারপুলের ফাইনাল দেখার আমন্ত্রণ।

বলার অপেক্ষা রাখে না, জাতীয় দল সেই ১৯৬৬ সালের পর আর বিশ্ব ফুটবলে বড় সড় সাফল্যের মুখ না দেখলেও সাম্প্রতিক সময় ইংলিশ ক্লাবগুলোর সাফল্যের বৃহস্পতি তুঙ্গে। তাদের জয় জয়কার। এই তো কিছু দিন আগে বাকুতে উয়েফা ইউরোপা লিগের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল দুই ঐতিহ্যবাহী ইংলিশ দল চেলসি আর আর্সেনাল। আর এবার ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের আরেক মর্যাদাপূর্ণ আসর ইউসিএলের ফাইনালিস্ট দুই নামী ইংলিশ ক্লাব টটেনহ্যাম আর লিভারপুল।

তাই ইংলিশরা এখনো সে ফাইনাল নিয়েই অধিক উৎসাহী। টটেনহ্যাম আর লিভারপুলের কালকের ফাইনাল নিয়ে লন্ডনবাসীর উৎসাহ-উদ্দীপনা ও প্রচার প্রসারের তোড়জোর দেখে একটি কথা মনে হয়ে গেল।

১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ যখন প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসেছিল, তখন বিশ্বকাপ চলাকালিন ইউরোপীয় ক্লাব চ্যাম্পিয়নশীপের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখ আর ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। ইংলিশদের সে কি উত্তেজনা! কি সাড়াটাই না পড়েছিল পুরো ইংল্যান্ড জুড়ে।

এবার ২০ বছর পরও এসে নিজ চোখে দেখলাম, ফুটবলই প্রথম পছন্দ ইংলিশদের। তাদের উৎসাহ-আগ্রহ, আবেগ-উচ্ছ্বাস আর হৈচৈ-শোরগোলের কেন্দ্রবিন্দুও ফুটবল। কে জানে এবার বিশ্বকাপ ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে হয়ত সে ধারা পাল্টেও যেতে পারে।

এআরবি/এসএএস/জেআইএম