হতাশ প্রবাসী বাঙালিদের ভালোবাসার অন্যরকম প্রতিদান দিলেন মাশরাফি

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা ব্রিস্টল থেকে
প্রকাশিত: ০২:৫৮ পিএম, ১২ জুন ২০১৯

ব্রিস্টলে আনুমানিক ১৫ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশির বসবাস। এর মধ্যে প্রায় ৮ হাজার মানুষ গতকাল বাংলাদেশ বনাম শ্রীলঙ্কার ম্যাচ দেখার কথা ছিল। মূলত জাতীয় দলের খেলা মাঠে গিয়ে দেখতে এবং মাশরাফি বাহিনীকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানাতে ব্যাকুল হয়েছিলেন ব্রিস্টলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

ম্যাচের আগে সময় টিভির সংবাদদাতা এবং ব্রিস্টল বাংলা প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কামরুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, ১১ জুন ব্রিস্টলের গ্লুস্টারশায়ার কাউন্টি ক্লাব মাঠে মিলনমেলা বসবে প্রবাসী বাঙালিদের। আমরা দল বেঁধে যাব মাঠে। বেশির ভাগই চেষ্টা করবো জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চড়াতে। কারো হাতে থাকবে প্রিয় জাতীয় পতাকা। কেউ বা বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীক ‘ঢোল’ নিয়ে যাবেন। রঙ-বেরঙের ব্যানার-ফেস্টুনতো থাকবেই। মোদ্দা কথা, বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচ নিয়ে ব্রিস্টল প্রবাসীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা আর প্রাণচাঞ্চল্য।

কিন্তু প্রকৃতির বৈরী আচরণে ভেস্তে গেছে সব আয়োজন। খেলা মাঠে না গড়ানোয় সবাই হতাশ। সবার একটাই কথা, বিশ্বকাপে প্রিয় জাতীয় দলের খেলা মাঠে গিয়ে দেখার ইচ্ছা ছিল। মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ, মিরাজ, মোস্তাফিজদের খেলা মাঠে বসে দেখতে উন্মুখ হয়েছিলাম। তাদের উদ্ভাসিত নৈপুণ্যে  মাঠ মাতবে। দল জিতবে। আমরাও প্রাণ খুলে হইচই করবো। বাংলাদেশ-বাংলাদেশ ধ্বনিতে কাঁপবে ব্রিস্টলের আকাশ-বাতাস। বাংলাদেশের জয়ে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হবে এমন আশায় উন্মুখ হয়ে ছিলাম আমরা। কিন্তু বৃষ্টির বৈরী আচরণে তা আর হলো না। পুরো উৎসবটাই মাটি হয়ে গেল। সবাই হতাশ।

উল্লেখ্য, ১০ জুন (সোমবার) বিকেলের আগে যে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল, তা সারা রাত হয়ে চলেছে গতকাল মঙ্গলবার প্রায় সারা দিন। ঘন মেঘে ঢাকা আকাশ, হাড় কাঁপানো শীত, সঙ্গে বাতাস এবং ঝিরঝিরে বৃষ্টি; ঘর থেকে বের হওয়ার মতো অবস্থাও ছিল না।

mush

কিন্তু এমন আবহাওয়ার মধ্যেও গতকাল সকাল ১০টা থেকেই ব্রিস্টলের কাউন্টি ক্লাব মাঠে সমবেত হয়েছিলেন প্রবাসী বাঙালিরা। খেলা কখন শুরু হবে? আমরা টাইগারদের বিজয় দেখবো, উৎসব-আনন্দে মাতবো। বৃষ্টিতে ভিজে আর প্রচণ্ড ঠান্ডা বাতাসের মধ্যেও অন্তত পাঁচ থেকে সাতশ বাংলাদেশি দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষায় ছিলেন। পরে দুপুর ২টা নাগাদ (১টা ৫৭ মিনিটে) ম্যাচ পরিত্যক্তের ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গে সমর্থক ও ভক্তদের মধ্যে নেমে আসে গভীর হতাশা।

প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার পরিবার, আমার পরিচিত প্রায় সবার পরিবার নিয়ে মাঠে যাওয়ার প্রোগ্রাম ছিল। কিন্তু বৃষ্টি সব আয়োজনে বাধা হয়ে দাঁড়ালো। তারপরও অনেকের পরিবার, স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধবসহ মাঠে উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু খেলা না হওয়ায় ফিরে এসেছেন রাজ্যের হতাশা নিয়ে।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে নিজ রেস্টুরেন্ট ‘চায়ে পানি‘তে বসে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সাথে আলাপে কামরুল ইসলাম আবেগতাড়িত হয়ে জানান, খেলা না হওয়ার হতাশা যে কত প্রবল, তা বলে বোঝাতে পারব না। তবে আমরা যারা বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে গিয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছি, তাদের হতাশা কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে। আর তা করেছেন আমাদের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা।

কামরুল বলেন, 'খেলা পরিত্যক্ত ঘোষণার পর স্বভাবতই আমাদের মন খারাপ হয়েছিল। আমাদের সব উৎসব-আনন্দ আর উল্লাসের পরিকল্পনা যায় ভেস্তে। রাজ্যের হতাশা যখন পেয়ে বসেছিল সবাইকে, ঠিক তখন আমাদের প্রিয় অধিনায়ক মাশরাফি ভাই ড্রেসিং রুমের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ান। নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভিতরে তার পক্ষে গ্যালারি বা কোনো বক্সে, এনক্লোজারে ঢুকে আমাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ ছিল না। তারপরও মাশরাফি ভাই তার সহযোগী ক্রিকেটারদের নিয়ে আমাদের উদ্দেশ্যে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে হাত নাড়েন। তাতেই আমাদের মন জুড়িয়ে গেছে। তিনি যে আমাদের মানসিক অবস্থা বুঝে স্থানীয় প্রবাসীদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে তার মনের ভালোবাসা নিবেদন করেছেন তাতেই আমরা উদ্বেলিত, পুলকিত হয়ে পড়ি। একটা আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় সেখানে।’

rubel

তিনি আরও বলেন, 'আমরা প্রিয় জাতীয় দলের অধিনায়কের ওই ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি। মনটা অন্যরকম ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়েছে। সবাই বলাবলি করি, মাশরাফি ভাই যে কষ্ট আর হতাশা কাটাতে নিজে ব্যালকনিতে এসে আমাদের উদ্দেশ্যে শুভেচ্ছা নিবেদন করলেন, নিজের মনের ভালোবাসা নিংড়ে দিলেন। সেটাই অন্যরকম পাওয়া ও ভালোবাসার মূল্যায়ন। তাতেই অনেকে ভুলে যান সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে অপেক্ষায় থেকে শেষ অবধি হতাশায় ডোবার দুঃখ-বেদনা।'

‘সবার মনের কালো মেঘ সরে যায়। মাশরাফি ভাই যখন সাজঘরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আমাদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছিলেন, ভালোবাসায় সিক্ত করছিলেন, তখন আমরা সবাই আবেগতাড়িত হয়ে গিয়েছিলাম। ক্ষণিকের জন্য হলেও সারাদিনের কষ্ট, অপেক্ষা আর আক্ষেপ-অনুশোচনার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। অনেকেই ওই মুহুর্তটি ক্যামেরা ও মোবাইলবন্দি করে রাখেন। সত্যি সে এক অভুতপূর্ব দৃশ্য'- বলেন কামরুল।

এআরবি/এসএস/এমকেএইচ

আপনার মতামত লিখুন :