শুরুতেই ক্যারিবীয়দের গেম প্ল্যান নষ্ট করা চমক টাইগারদের!

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা টনটন, ইংল্যান্ড থেকে
প্রকাশিত: ০৫:৩৯ পিএম, ১৭ জুন ২০১৯

অফ স্পিন নয়, পেস দিয়েই বোলিং শুরু। তাও দু’প্রান্তে দুই পেসার মাশরাফি আর সাইফউদ্দীন। কি বলবেন? ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের চিন্তা-ভাবনা, লক্ষ্য-পরিকল্পনা তথা গেম প্ল্যানকে খানিক এলোমেলো করে দিতেই কি দুই বাঁ-হাতি ক্রিস গেইল আর এভিন লুইসের বিপক্ষে মেহেদি হাসান মিরাজকে রেখে দুই পেসার মাশরাফি আর সাইফউদ্দীনকে দিয়ে বোলিং সূচনা টাইগারদের?

এটাকে কি বলবেন? ক্রিকেট গেম্বল? নাকি প্রতিপক্ষর সাথে মাইন্ড গেম খেলা? রোববার প্রেস কনফারেন্সে মাশরাফির কথা শুনে মনে হয়েছিল অফ স্পিনার মিরাজই শুরু করবেন বোলিং। দুই বাঁ-হাতি গেইল-লুইসদের উত্তাল উইলোবাজি ঠেকাতে অফ স্পিন থেরাপিই কার্যকর- তা প্রমাণিত।

২০১২ সালে ঘরের মাঠে টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজে গেইলের ব্যাটিং তান্ডব থামিয়ে দিয়ে রীতিমত হিরো বনে গিয়েছিলেন সোহাগ গাজী। টেস্ট আর ওয়ানডে মিলে পুরো সফরে সোহাগ গাজীর বলে কয়েকবারই আউট হয়েছিলেন বিশ্বর ভয়ঙ্করতম এই ওপেনার।

এমনকি গেইলের উত্তাল উইলোবাজি থামাতে বিপিএলেও প্রায় নিয়মিতই অফ স্পিনার ব্যবহার করা হয় শুরুতে। এমন নয়, বাঁ-হাতি ওপেনার হলেই অফ স্পিন ব্যবহার করতে হবে।

তা কোন ক্রিকেট অভিধানে লেখাও নেই। আসলে সাধারণতঃ বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যানদের অফ স্পিন খেলতে একটু সমস্যা হয়। অফ স্পিনাররা বাঁ-হাতিদের বিপক্ষে বল করেন রাউন্ড দ্য উইকেট। তাতে একটা কোণ তৈরি হয়। অফ স্ট্যাম্পের আশপাশের ডেলিভারিগুলো বাঁ-হাতিদের অফ স্ট্যাম্পের আশপাশে পড়ে আরও বাইরে বেরিয়ে যায়। তাতে বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যানের স্বাচ্ছন্দে খেলা কঠিন হয়। খুব খাট লেন্থে বল না করলে ব্যাটসম্যানের হাত খুলে খেলা একটু কঠিনই হয়ে যায়।

এ কারণে বাঁ-হাতি গেইল, লুইসদের বিপক্ষে অনেক সময়ই অফ স্পিন দিয়ে বোলিং শুরু করতে হয়েছে। তাতে সাফল্যও এসেছে।

এবার গেইল-লুইসদের বিপক্ষে কাকে দিয়ে শুরু হবে বাংলাদেশের বোলিং? টনটনের ম্যাচ শুরুর আগে তা নিয়েই ছিল জল্পনা কল্পনা। প্রথমে শোনা গেল মাঠ ছোট। স্পিনার খেলানোয় আছে রাজ্যের ঝুঁকি। আর ক্যারিবীয়রা তো এমনিতেই পাওয়ার হিটিংয়ের মাস্টার। স্পিনারদের পেলে বিশেষ করে অফ স্পিনার মিরাজকে মেরে একদম শেষ করে দেবে।

ভাবটা এমন ছিল, মাঠ খুবই ছোট। মিরাজ বল করলেই তা ছক্কা হবে। তাকে তুলে মারলেও বল বাতাসে ভেসে গিয়ে সীমানার ওপারে আছড়ে পড়বে। কিন্তু রোববার দুপুরে প্রেস কনফারেন্সে অধিনায়ক মাশরাফির কথা শুনে মনে হচ্ছিলো, আগে যত নেতিবাচক কথাই হোক না কেন, মিরাজ খেলবেন এবং হয়ত বোলিংয়ের সূচনাও করবেন।

জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফি বলেও দিলেন, আমরা আগে যেভাবে নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে নিজেদের মত করে খেলে জিতেছি। এ ম্যাচেও সেই লক্ষ্য-পরিকল্পনা ও কৌশল থাকবে বিশেষ বিবেচনায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বেশিরভাগ ম্যাচে গেইল ও বাঁ-হাতিদের আটকে রাখতে অফ স্পিনার ব্যবহারে আচে বড়-সড় সাফল্য।

তাই মনে হচ্ছিল, আজও অফস্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজই হবেন অধিনায়ক মাশরাফির তুরুপের তাস। দুই বাঁ-হাতি গেইল আর লুইসের বিপক্ষে নির্ঘাত বোলিংয়ের শুরু করবেন অফ স্পিনার মিরাজ।

কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে দুই ক্যারিবীয় ওপেনারের বিপক্ষে আজ বোলিং শুরু করলেন অধিনায়ক মাশরাফি। অপর প্রান্তেও দেখা মিলেনি কোন অফ স্পিনারের। তার বদলে নতুন বল শেয়ার করলেন সাইফউদ্দীন।

মাশরাফির প্রথম বলেই পরাস্ত হলেন গেইল। থ্রি কোয়ার্টার লেন্থে পিচ পড়া মাশরাফির ইনকাটার অফ স্ট্যাম্পের ঠিক বাইরে পেতে দেয়া গেইলের ব্যাট ফাঁকি দিয়ে চলে গেল কিপার মুশফিকের গ্লাভসে।

এরপরও মাশরাফির বলে আরও বার দুয়েক অফ-স্ট্যাম্পের ঠিক বাইরে খেলতে গিয়ে পরাস্ত হলেন ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক গেইল। শেষ পর্যন্ত তাকে সাজ ঘরে ফেরালেন আরেক প্রান্তে বোলিং শুরু করা পেসার সাইফউদ্দীন।

ঠিক মাশরাফি যে লাইন ও লেন্থে বল ফেলে গেইলকে পরাস্ত করেছিলেন, ঠিক সেই জায়গায় বল ফেললেন সাইফউদ্দীন। তাতে ব্যাট পেতে দিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনলেন গেইল। তার ধারনা ছিল না, বল এত ভিতরে এসে তার ব্যাটে ছুঁয়ে পিছনে চলে যাবে।
আসলে বলের ম্যুভমেন্ট বুঝতেই সমস্যা হয়েছে গেইলের। বল ভিতরে আসবে, না বাইরে বেরিয়ে যাবে- তা বুঝতে না পেরে ব্যাট পেতে দিয়েই ধরা খেলেন। বল ব্যাটের কোনা ছুয়ে চলে গেল পিছনে।

নিজের বাঁ-দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বেশ ক্ষিপ্রতা ও দক্ষতায় তা গ্লাভসে নিলেন মুশফিক। একদম সহজ ছিল না ক্যাচটি। বল ছিল বেশ নিচু। তবে মুশফিক তা দুই হাতে নেয়ার চেষ্টা করেই সফল। এক হাত বাড়ালে, বাড়াতে হতো বা হাত। যেটা ডানহাতি মুশফিকের মূল হাত নয়। বল গ্লাভসে নাও থাকতে পারতো। তাই দুই হাত বাড়িয়ে দেয়ায় বল তাতেই জমে যায়। ১৩ বলেও রানের খাতা খুলতে না পারা গেইল সাজঘরে ফিরে গেলেন।

আর এভাবেই স্পিন দিয়ে শুরুর ইঙ্গিত দিয়ে পেসার ব্যবহার করেই গেইলকে ফিরিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের উদ্বোধনী জুটি ভাঙার কাজটি সারেন অধিনায়ক মাশরাফি। বোঝাই গেল একটা ভাল ক্রিকেট ‘গেম্বল’ করেই প্রাথমিক সাফল্য তুলে নিলেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মাশরাফি।

এআরবি/আইএইচএস/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :