অনেক প্রতিকূলতা অতিক্রম করা এক জয়

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা সাউদাম্পটন থেকে
প্রকাশিত: ০১:২৩ এএম, ২৫ জুন ২০১৯

মেঘে ঢাকা আকাশ, খেলার আগে প্রায় ঘন্টাখানেক টিপ টিপ বৃষ্টির পর স্লো-টার্নিং পিচে ২৬২ রান দেখে যারা হতাশ হয়েছিলেন, ৩২০ কেন হলো না? এই রান নিয়ে কি আর জেতা সম্ভব- এসব সাতপাঁচ ভেবে ভেবে অস্থির ছিলেন, তারা সবাই এখন স্বস্তিতে।

কারণ ঐ স্কোরটাকেই জয়ের জন্য পর্যাপ্ত বলে প্রমাণ করেছেন বাংলাদেশের বোলাররা বিশেষ করে বাঁহাতি স্পিনার সাকিব আল হাসান।

দিন শেষে হ্যাম্পশায়ার বোলের কনফারেন্স হলে জনাকীর্ন সংবাদ সম্মেলনে সাকিব সোজা বলে দিলেন, ‘এই পিচে ২৬২ অনেক রান। আমরা তো ২৪০+ করার টার্গেটে ব্যাট করেছি। টস হেরে প্রথম ব্যাটিংয়ে নামার পর আমাদের টার্গেট ছিল দুটি। প্রথমত ৫০ ওভার পুরো ব্যাট করা। অন্তত ২৪০’র ঘরে পা রাখা। সেখানে আমরা ২৬০ রানের বেশি করে ফেলেছি। আমার মনে হয় আমাদের টার্গেটের চেয়ে ঐ ২০ রানই ছিল বোনাস। সেটাই ছিল খানিক স্বস্তির ও অনুপ্রেরণার। আমরা জয়ের ব্যাপারে বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলাম।’

সাকিব খেলা শেষে অমন কথা বললেও বাস্তব চিত্র একটু হলেও ভিন্ন ছিল। বাংলাদেশের ইনিংসের পর আফগানরা যখন ব্যাটিং শুরু করলো, তখন আকাশের গুমোট ভাব কাটল অনেকটাই। একদম সোনা ঝড়া বিকেলের দেখা না মিললেও প্রথম সেশনে যেমন মেঘে ঢেকে ছিল সাউদাম্পটনের আকাশ, বিকেলে তাও কেটে গেল।

এতে করে উইকেটের চরিত্রও পাল্টালো খানিকটা। সকালের সেশনে হ্যাম্পশায়ার বোলের যে উইকেট ছিল রীতিমত দুর্বোধ্য, সেটাই পরের সেশনে আকাশ ও আবহাওয়া বদলের কারণে অনেকটাই সহজ হয়ে গেল। বল প্রথম সেশনের চেয়ে ভাল গতি ও উচ্চতায় ব্যাটে আসলো। মুজিব উর রহমান, মোহাম্মদ নবী আর রশিদ খানের বল যেমন সাপের মত এদিক ওদিক ঘুরছিল- সেটাও বন্ধ হলো।

খেলা শেষে আফগান অধিনায়ক গুলবাদিন নাইবও তা স্বীকার করলেন। বললেন, ‘উইকেট একটু স্লো ছিল। তবে এর বাইরে বোলারদের জন্য বিশেষ করে বাংলাদেশের স্পিনারদের জন্য তেমন সহায়ক কিছু ছিল না। দ্বিতীয় সেশনে বল ঘোরেনি একটুও।’

অথচ বাংলাদেশ কি প্রতিকূল পরিবেশ আর পরিস্থিতিতেই না ব্যাট করেছে। আবহাওয়ার কারণে আফগান স্পিনারদের বল বেশি টার্ন করেছে। বল থেমেও আসছিল। স্বচ্ছন্দে শটস খেলা বহুদূরে, নিজেদের স্বাভাবিক-সাবলীল ব্যাটিংও করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

বিশেষ করে অফস্পিনার মুজিব উর রহমান আর মোহাম্মদ নবী দুই বাঁহাতি তামিম ও সাকিবের স্বাভাবিক ব্যাট চালনায় বাঁধা হয়ে দাড়ালেন। শেষ পর্যন্ত তামিম আর সাকিব ঐ দুই অফ স্পিনারের শিকার হয়েই ফিরলেন সাজঘরে।

তার ওপর মাঠ অনেক বড়। কাজেই বাউন্ডারি হাঁকানোই ছিল আরও কঠিন কাজ। আবার বলও ব্যাটে এসেছে ঠেলাগাড়ির গতিতে। বলকে সীমানার ধারে কিংবা ওপারে পাঠাতে বাড়তি জোর খাটাতে হয়েছে। সে কারণেই এবারের বিশ্বকাপে এক ম্যাচে বাংলাদেশের ইনিংসে আজই সবচেয়ে কম ১৭টি বাউন্ডারি হয়েছে।

এমনকি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওভালে ২৪৪ রান করার ম্যাচেও বাংলাদেশের ইনিংসে ছিল ২১টি বাউন্ডারি আর এক ছক্কা। আজ তার চেয়ে চারের সংখ্যা কম, এটা শুধুই মাঠ বড় সে কারণে। কাজেই এটাও একটা প্রতিকূলতা।

সেই প্রতিকূলতার মাঝেও মুশফিকুর রহীম, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মোসাদ্দেক সৈকত প্রাণপন চেষ্টা করেছেন দলকে একটা লড়িয়ে পুঁজি গড়ে দিতে। আর পরের সেশনে সেটাই গেল পাল্টে। মাঝেমধ্যে সূর্যের দেখা মিললো। বল প্রথম সেশনের চেয়ে একটু ভাল গতিতে ব্যাটে আসলো।

যদিও সিদ্ধান্ত দেখে মনে হলো বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফির ধারণা ছিল যেহেতু প্রথম সেশনে বল থেমে একটু আস্তে ব্যাটে এসেছে, তাই দ্বিতীয় সেশনে পেসারদের বল একটু গ্রিপ করতে পারে। বোঝাই গেল সে ভাবনা থেকেই আফগান ইনিংসের শুরুতে দুই ওপেনার ডান হাতি থাকার পরও বাঁহাতি স্পিনার সাকিবকে দিয়ে বোলিংয়ের সূচনা না করে তিনি আর মোস্তাফিজ শুরু করলেন বোলিং।

সেটা সফল হয়নি। কারণ বল মোটেও গ্রিপ করেনি। অর্থাৎ আসল অংশে বোলাররা উইকেটে থেকে যেমন সাহায্য পাবেন বলে মনে করা হয়েছিল, তা পাননি। আর সেই না পারা রীতিমত বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দেখা দিতে পারতো।

সাকিব ছাড়া তিন ফ্রন্টলাইন পেসার মাশরাফি (৭ ওভারে ০/৩৭), মোস্তাফিজ (৮ ওভারে ২/৩২) আর সাইফউদ্দিন (৮ ওভারে ১/৩৩) তেমন কিছুই করতে পারেননি। সাকিব একা ‘অন্ধের যষ্ঠি’ হয়ে দেখা না দিলে কি হতো বলা কঠিন।

অধিনায়ক মাশরাফি উইকেট পাননি। আর দিন শেষে মোস্তাফিজ ও সাইফউদ্দিনের নামের পাশে ২+১= ৩ উইকেট জমা পড়েছে। দেখা যাচ্ছে তারা ওভার পিছু রানও দিয়েছেন গড়পড়তা চার করে। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়।

ঐ পরিসংখ্যানটাই তাদের আজকের বোলিংয়ের সত্যিকার চিত্র ফুটে ওঠেনি। বরং শুরুতে তাদের ধার ও লক্ষ্যহীন বোলিং দলকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। তারা না পারছিলেন উইকেট নিতে, না পারছিলেন রানের গতি কমাতে।

সাকিব বল হাতে নিয়ে ব্রেকথ্রু দিয়েই দলকে ম্যাচে ফেরালেন। তারপর সময় গড়ানোর সাথে এক দিক থেকে আফগানদের ওপর পূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতের মুঠোয় নিয়ে আসেন সাকিব।

তিনি একদিকে রান গতি কমিয়ে রাখার পাশাপাশি তিন স্পেলে ২৯ রানে একাই আফগান ইনিংসের অর্ধেকটার পতন ঘটালেন। আর তাতেই পুড়ে ছাড়খার আফগান ব্যাটিং। বাংলাদেশ অনেক প্রতিকূলতা আর বাধা-বিপত্তি পার করে পেল দারুণ এক জয়।

এআরবি/এসএএস

আপনার মতামত লিখুন :