বৃষ্টি ভেজা সকালেও লর্ডস লোকে লোকারণ্য

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা লর্ডস, লন্ডন থেকে
প্রকাশিত: ০৪:৫২ পিএম, ১৪ জুলাই ২০১৯

উৎসব করবো। আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠবো। খুশির ফলগুধারাও বইবে; কিন্তু হৈ-হুল্লোড় কম। চিৎকার-চেঁচামেচিও হবে যৎসামান্য। মোটকথা, উৎসব-পার্বণের মাঝেও বাড়তি আবেগ-উচ্ছ্বাস চেপে রেখে যতটা সম্ভব পরিমিত বোধ কাজ করে।

অতি সংক্ষেপে এটাই বৃটিশ-ইংলিশদের বৈশিষ্ট্য। এটাই তাদের সংস্কৃতি। আগেরদিনই (১৩ জুলাই, শনিবার) জাগো নিউজেরই একটা প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, বিশ্বকাপ ফাইনাল নিয়ে ইংলিশদের উৎসাহ-উদ্দীপনা কম।

কিন্তু ওই প্রতিবেদনে এক ইংলিশ, টনির মতামতও প্রকাশিত হয়েছিল। ক্রিকেট মক্কা লর্ডসের মিডিয়া কর্মী বিশেষ করে ফটো জার্নালিস্টদের আনুসাঙ্গিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং তাদের কাজকর্মের সমন্বয়কারী এ ইংলিশ আগের দিনই জানিয়েছিলেন, ‘আমাদের মানে ইংলিশদের উচ্ছাস-উল্লাস আর আবেগের বহিঃপ্রকাশ কম, তবে উৎসাহ-উদ্দীপনা ঠিকই আছে। দেখো! খেলা দেখতে ১৪ জুলাই ঠিকই মাঠে যাবে আমাদের ভক্ত ও সমর্থকরা।’

টনির কথাই ঠিক। আগে ভাগে হৈ চৈ ছিল না তেমন। সাড়া শব্দও ছিল কম। কিন্তু আজ বৃষ্টি ভেজা সকালেও ইংল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে উপস্থিত হাজার হাজার ইংলিশ।

সকালে অন্য দিন যে সময় সূর্য ওঠে, আজ সে সময়টায় লন্ডনের আকাশ ছিল মেঘে ঢাকা। টিপ টিপ বৃষ্টিও পড়লো প্রায় ঘণ্টা খানেক; কিন্তু তাতে কি, বিশ্বকাপ ফাইনালের কাছে কি আর ঝড় বৃষ্টি আছে? খেলা শুরুর আগেই পুরো লর্ডস দর্শকে ভরে গেছে।

অবশ্য ভাবার কোনোই কারণ নেই, যারা ফাইনাল দেখতে এসেছেন, তারা সবাই ইংলিশ এবং ইংল্যান্ডের সমর্থক। ক্রিকেটের মক্কা ‘লর্ডসে’ উপস্থিত ৩০ হাজার দর্শকের অর্ধেক ইংলিশ আর বাকি অর্ধেক ভারতীয়, বাংলাদেশি এবং পাকিস্তানি।

বলার অপেক্ষা রাখে না, যুক্তরাজ্যে অভিবাসীদের মধ্যে ভারতীয়রাই সংখ্যায় বেশি। তাদের ক্রিকেট প্রেমও প্রবল। আর নিজেদের দল অনেক সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী- তাই ভারতীয়দের অনেকেই ফাইনালের টিকিট আগেই কিনে রেখেছিলেন। তাই আজকের লর্ডসের ফাইনালে ইংলিশদের পাশাপাশি ভারতীয়রাও সংখ্যায় প্রচুর।

রোববার সাপ্তাহিক ছুটির দিনের সকাল। অফিস, স্কুল-কলেজ নেই। বাসা থেকে বের হবার তাড়া নেই। তাই পাতাল রেলগুলোয় ভিড় ছিল না একদমই। পূর্ব লন্ডনের স্টেফিনি গ্রিন, হোয়াইট চ্যাপেল থেকে ডিস্ট্রিক্ট লাইন আর জুবিলি লাইনের পাতাল রেলগুলোয় কোনই কোলাহল ছিল না।

অন্যদিন হলে সিট পাওয়া দায়। দাঁড়িয়েই থাকতে হয় বেশির ভাগ সময়। অজ সেখানে উঠেই সিট মিললো। একবার লাইন পাল্টে ডিস্ট্রিক্ট থেকে জুবিলি লাইনের ট্রেন ধরে লর্ডসের সবচেয়ে কাছের পাতাল রেল স্টেশন সেন্ট জোন্স উডসে নামতেই চোখ ‘চড়ক গাছ।’

শয়ে শয়ে মানুষ। লন্ডনের এ প্রান্ত, ও প্রান্ত থেকে আসছেন। সেন্ট জোন্স উডসে আজ রোববার সকাল ৯টার আগেই অন্যরকম প্রাণ চাঞ্চল্য। মানুষের ঢল। সবার গন্তব্য লর্ডস। এর মধ্যে চোখে পড়লো টিকিটের আকুতি। এক কিউই ভদ্রালোক ঠিক সেন্ট জোন্স উডের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন গলায় একটা ছোট্ট লিখা- ‘আমি একজন অন্তঃপ্রান নিউজিল্যান্ড সাপোর্টার।আমার একটা টিকিট চাই।’

ঠিক উল্টো দিকে এক পিতা দাঁড়িয়ে। তার কাঁধের ওপর ৭/৮ বছরের শিশু। তার হাতেও লিখা, ‘আমাকে একটা টিকিট দেবেন?’ সেন্ট জোন্স উড থেকে পায়ে হাঁটা পথ লর্ডস। সাড়ে ৭০০ গজের মত এলাকা । এর মধ্যে শুধু মানুষ আর মানুষ। সবারই গন্তব্য লর্ডস। কেউ ইংলিশ। কেউবা কিউই। আবার কিছু অস্ট্রেলিয়ানও চোখে পড়লো।

আর ভারতীয়, বাংলাদেশি-পাকিস্তানিরাও সংখ্যায় অনেক। তবে দক্ষিণ এশিয়ানদের কাউকে টিকিট কিনতে দেখা যায়নি। বোঝাই গেল, তারা আগে-ভাগেই টিকিট কিনে রেখেছিলেন। আসতেই কথা হলো ঢাকার মোজাফফরের সাথে। তেজগাঁওর ছেলে। বলেন, ‘আমাদের সাথে কষ্ট করে জেতা নিউজিল্যান্ড ফাইনালে। আমরা সেমিতেই আসতে পারিনি। একটু খারাপ লাগছে।’

ভারতের পুনের ২৫ বছরের মেয়ে হেমার কন্ঠে আফসোস, ‘ইস! আমার দল ভারত নেই। ভারত ফাইনাল খেলবে। কোহলির হাতে ট্রফি দেখবো আর ধোনির রাজসিক বিদায় দেখার আশায় ছিলাম। কোনটাই দেখা হলো না। তারপরও এসেছি। বিশ্বকাপ ফাইনাল বলে কথা।’

ইংলিশদের চোখে মুখে একটা অন্যরকম প্রাণ চাঞ্চল্য। বারকিং থেকে আসা মার্গারেট, স্বামী জর্জ আর ছেলে জেমসের আশা, ‘আগে পারিনি, এবার হয়তো প্রথম বিশ্বকাপ ক্রিকেটের শিরোপা জিতবো আমরা।’

এআরবি/আইএইচএস/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :