দেশের ক্রিকেটের দুর্যোগ কেটে যেতে পারে আজই!

বিশেষ সংবাদদাতা
বিশেষ সংবাদদাতা বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৩:২৫ পিএম, ২৩ অক্টোবর ২০১৯

হঠাৎই অশান্ত ক্রিকেটাঙ্গন। ক্রিকেটাররা ধর্মঘটে। বিসিবি হার্ডলাইনে। বোর্ডপ্রধান নাজমুল হাসান পাপনের নাকে ষড়যন্ত্রের গন্ধ! ১১ দফা দাবির সবগুলো না হলেও বেশির ভাগই ন্যায্য, বৈধ। কারো দ্বিমতের কোনো সুযোগ নেই।

যাদের জন্য সব কিছু, সেই ক্রিকেটারদের নৈতিক অধিকার আছে জাতীয় লিগের ম্যাচ ফি, বিপিএলের পারিশ্রমিক বাড়ানোর দাবি তোলার পাশাপাশি প্লেয়ার্স বাই চয়েজের শৃঙ্খলমুক্ত খোলা প্রিমিয়ার লিগের দল বদলের প্রত্যাশা এবং ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটারদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবি মোটেই অযৌক্তিক নয়, যৌক্তিক। বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনও ক্রিকেটারদের আর্থিক দাবিগুলোর প্রতি অশ্রদ্ধা পোষণ করেননি। বরং বারবার বলেছেন এ দাবিগুলো সমাধানযোগ্য।

বোর্ডে এসে সে দাবিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করলেই হয়তো আজকের এ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির উদ্রেক ঘটতো না। এমন বিস্ফোরণমুখ অবস্থার সৃষ্টি হতো না। খেলোয়াড়দের ধর্মঘট আর বিসিবির কঠোর অবস্থানের চাপে দেশের ক্রিকেট ‘স্যান্ডউইচ’ হতো না।

এখন দুপক্ষের কাছেই বিষয়টি ‘ইগো’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বোর্ড ভাবছে- সাকিব, তামিম, মুশফিক, রিয়াদরা আমাদের কাছে না এসে মিডিয়ার কাছে গেল কেন? ক্রিকেটারদের চিন্তা, আমরা আগে আকার ইঙ্গিতে ও বিচ্ছিন্নভাবে বললেও তাতে কেউ কর্ণপাত করেনি, এবার মিডিয়ার সামনে এমন বিস্ফোরণ করলে হয়তো সাড়া পড়বে। নাড়াও পড়বে। তখন সমাধানের পথ তৈরি হবে।

কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টো। বোর্ডের কাছে নিজেদের দাবি দাওয়া পেশ না করে এবং একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে না দিয়ে সরাসরি ক্রিকেটীয় কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে এখন বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন ও বোর্ড কর্তাদের কাছে বিরাগভাজন হয়েছেন ক্রিকেটাররা।

এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তায় আসলে দেশের অগণিত ক্রিকেটভক্ত ও সমর্থকরা। তারা পড়েছেন উভয় সংকটে। ক্রিকেটারদের প্রতি রয়েছে তাদের আন্তরিক ভালোবাসা। এমন পরিস্থিতি দেখে তারাও অস্বস্তিতে, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়।

ওদিকে দীর্ঘদিন পর টি-টোয়েন্টি আর দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের ভারত সফর দরজায় কড়া নাড়ছে। পরশু ২৫ অক্টোবর থেকে ভারত সফরের প্রস্তুতি ক্যাম্প শুরুর কথা। এখন বিসিবি ও ক্রিকেটারদের বিবাদ না মিটলে এ প্রস্তুতি পর্ব শুরু হবে না। ধর্মঘট অব্যাহত থাকলে ভারত সফর নিয়েও নানা অনিশ্চয়তা দেখা দেবে।

ওদিকে বিসিসিআইয়ের নতুন প্রধান ‘প্রিন্স অব কলকাতা’ সৌরভ গাঙ্গুলি ইডেন গার্ডেনে বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যকার আসন্ন টেস্ট ম্যাচকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে অনেক কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সৌরভ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মহারাজ। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও।

এছাড়া ২০০০ সালের নভেম্বরে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ যে ম্যাচটি খেলে টেস্ট যাত্রা শুরু করেছিল, সেই অভিষেক টেস্ট স্কোয়াডকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এত বড় আয়োজন যে সিরিজকে ঘিরে, সেই সিরিজ যদি অনিশ্চয়তার দোলাচালে পড়ে যায়, তাহলে কেমন দেখায়?

এ কারণেই মুখের ভাষা ভিন্ন হলেও বিসিবিও ভেতরে ভেতরে চাচ্ছে, ক্রিকেটারদের আন্দোলন থামিয়ে তাদের মাঠে ফিরিয়ে আনতে। একদম ভেতরের খবর, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এমন নির্দেশই দিয়েছেন।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাকিব, তামিম, মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহদের মাঠে ফেরার তাগিদ দিয়েছেন। এবং বোর্ডের সাথে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন।

গত পরশু সোমবার রাতে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাত করেন বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান পাপন। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী ক্রিকেটারদের দাবি মেনে নেয়ার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি ক্রিকেটারদের মাঠে ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণেরও নির্দেশ দেন।

তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল মঙ্গলবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেন ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। বোর্ডের অন্যতম নীতি নির্ধারক ও পরিচালক মাহবুব আনামকে উদ্ধৃত করে একটি বাংলা দৈনিকে এমন সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্রিকেটার ও বোর্ডের দূরত্ব এবং উত্তেজনা কমিয়ে পরিস্থিতির ইতিবাচক সমাধানে মাশরাফি বিন মর্তুজাকে দায়িত্ব দিয়েছেন।

আজ বুধবার সকালে জাগো নিউজের সাথে আলাপে মাহবুব আনাম অবশ্য তা স্বীকার করেননি। মাহবুব আনাম জাগো নিউজকে জানান, ক্রিকেটারদের ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে বিসিবির সাথে সাকিব, তামিমদের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে এবং একটা অশান্ত পরিস্থিতির উদ্রেক ঘটেছে, তা নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করেন মাশরাফি। সে সাক্ষাতে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে মাশরাফি কথা বলেছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী যে মাশরাফিকে সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দিয়েছেন, এমন কথা বলিনি। প্রধানমন্ত্রী ক্রিকেটারদের মাঠে ফেরাতে মাশরাফিকেও ভূমিকা রাখার এবং মধ্যস্ততাকারী হবার কথা বলেন।

এদিকে আজ দুপুরে উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিরসনের কিছুটা একটা আভাস মিলেছে। বিসিবি সিইও নিজামউদ্দীন চৌধুরী সুজন জানিয়েছেন, তার সাথে আন্দোলনকারী ক্রিকেটারদের মধ্যে সিনিয়র সদস্য তামিম ইকবালের কথা হয়েছে। তামিম তাকে জানিয়েছেন, তারা নিজেরা কথা বলে আজ বুধবার বিকেল ৫ টার মধ্যে বোর্ডকে জানাবেন।

তামিমের কথায় পরিষ্কার ইঙ্গিত, ক্রিকেটাররা আজ দুপুর থেকে বিকেলের মধ্যে রাজধানীর কোথাও একত্রিত হবেন। নিজেরা কথাবার্তা বলে হয়তো বিসিবি কর্তাদের সাথে বসার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন। যদি সেটা হয়, তাহলে আজই ক্রিকেট আকাশে হঠাৎ জমা মেঘ কেটে যেতে পারে। ক্রিকেটাররা আবার মাঠে ফিরে আসার ঘোষণা দিতে পারেন। আশা করা যায় বোর্ড ও ক্রিকেটাররা বসলে সমাধান হবেই। কারণ সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন আর বোর্ড কর্তারা বারবার বলছেন, ক্রিকেটারদের অধিকাংশ দাবিই সমাধানযোগ্য। এবং অর্থনৈতিক দাবিগুলো শতভাগ না হলেও মেনে নেয়া হবে।

এআরবি/এমএমআর/পিআর