গাভাস্কারের একমাত্র ওয়ানডে সেঞ্চুরির মাঠে কি করবে টাইগাররা?

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৪:১৬ পিএম, ০৯ নভেম্বর ২০১৯

১২৫ টেস্টে যার দশ হাজারের ওপর (১০১২২) রান। নামের পাশে ৩৪ টেস্ট সেঞ্চুরি আর ৪৫ হাফসেঞ্চুরি, ভারত তথা বিশ্বক্রিকেটের সেই সর্বকালের অন্যতম সেরা উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানের ওয়ানডে শতক মোটে একটি! মেলানো কঠিন, তাই না? অস্বাভাবিক ঠেকছে তো?

আজকাল বললে ভুল বলা হবে, সুনীল গাভাস্কার সম্ভবত একমাত্র ক্রিকেটার বা ব্যাটসম্যান যার টেস্টে ১০ হাজারের ওপরে রান আর ওয়ানডেতে রান মাত্র ৩০৯২। যার মধ্যে ২৭টি হাফসেঞ্চুরি থাকলেও শতরান মোটে একটি। এবং সে একমাত্র শতকটি এই কানপুরের বিদর্ভ স্টেডিয়ামে।

দিনটি ছিল ১৯৮৭ সালের ৩১ অক্টোবর। উপমহাদেশে বসা প্রথম বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘটনাবহুল সে ম্যাচে গাভাস্কারের ব্যাট থেকে অবশেষে একমাত্র ওয়ানডে সেঞ্চুরি বেরিয়ে আসে। একই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে হৈ চৈ ফেলে দেন ভারতের তখনকার মিডিয়াম পেসার চেতন শর্মা।

সেই ঘটনাবহুল ম্যাচের ভেন্যুতে আগামীকাল রোববার বাংলাদেশ-ভারতের টি-টোয়েন্টি সিরিজের ভাগ্য নির্ধারণী ম্যাচ। এখন পর্যন্ত সিরিজে ১-১ ‘এ সমতা। দিল্লিতে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের দল ৭ উইকেটে জিতে এগিয়ে গিয়েছিল। রাজকোটে ৮ উইকেটে টাইগারদের হারিয়ে সমতা ফিরিয়ে এনেছে রোহিত শর্মার দল।

কাল ১০ নভেম্বর রোববার কী হবে? তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। শক্তি, সামর্থ্য আর অভিজ্ঞতায় ভারত বেশ এগিয়ে। আর ম্যাচ জেতানো পারফরমারের হিসেব কষলেও ভারতীয়দের সুস্পষ্ট প্রাধান্য। রোহিত শর্মা, শিখর ধাওয়ান, ইয়ুজবেন্দ্র চাহালের মত ম্যাচ ভাগ্য নির্ধারণী ভূমিকা নেবার মত কার্যকর ক্রিকেটারও ভারতীয় দলে বেশি। কাজেই সব সমীকরণে ফেবারিট রোহিত শর্মার দল।

অপরদিকে দিল্লিতে প্রথম ম্যাচ জিতলেও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ বাহিনী সত্যিই আন্ডারডগ। কঠিন সত্য হলো, বাংলাদেশ দলের এখনো ভারতকে বলে কয়ে হারানো কঠিন।

বাংলাদেশের শক্তি, সম্ভাবনা ও সাফল্য ঠিক দলটির পারফরমারদের পারফরমেন্সের ওপর নির্ভর করে না। অনেকখানি উইকেটের ওপর নির্ভরশীল। একটু স্লথগতির পিচ, বল খানিক থেমে ব্যাটে আসা, একটু আধটু টার্ন- এমন উইকেটই আসলে বাংলাদেশের সাফল্যের স্বর্গ। সারা বছর এমন ধরনের উইকেটে খেলে অভ্যস্ত বাংলাদেশের ব্যাটসম্যান, পেসার ও স্পিনাররা।

এমন ধরনের উইকেটে তারা সত্যিই ভালো দল হয়ে ওঠেন। আর তাই তো দিল্লির অরুন জেটলি স্টেডিয়ামের স্লথ গতির, খানিক টার্নিং উইকেটে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের যতটা চনমনে মনে হয়েছে, তাদের বোলিং আর ব্যাটিং যতটা ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়েছে, রাজকোটের শতভাগ ব্যাটিং উইকেটে ততটা ছড়ায়নি।

আর সেই ব্যাটিং ‘ফ্রেন্ডলি’ পিচেই রোহিত শর্মা আর শিখর ধাওয়ানদের ভিন্ন রূপ। দিল্লির উইকেটে যাদের ইচ্ছেমত শট খেলা আর চার ও ছক্কা হাঁকাতে কষ্ট হয়েছে, তারাই রাজকোটে মুড়ি মুড়কির মত আক্রমণাত্মক শটস খেলেছেন। চার ও ছক্কার ফুলঝুরিও ছুটিয়েছেন।

সেটা ছিল ভারতীয়দের স্বর্গ। ঐ ধরনের পিচে কোন লাইন ও লেন্থে বল করলে ব্যাটসম্যানের ফ্রি স্ট্রোক প্লে বন্ধ রাখা যায়, তাও খুব ভালো জানা চাহাল ও ওয়াশিংটন সুন্দরদের। তাই সেরা লেগস্পিনার চাহাল আর অফস্পিনার ওয়াশিংটন রাজকোটে টাইগারদের কাছ থেকে কুড়িয়ে নিয়েছেন সমীহ। রান গতিও নিয়ন্ত্রনে রেখেছেন।

অনদিকে দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামের স্লো ট্র্যাকে শফিউল-আল আমিন বাড়তি সহায়তা পেয়ে বেশ ভালো বল করেছেন। ঠিক তাদেরকেই রাজকোটের সৌরাষ্ট্র স্টেডিয়ামের শতভাগ ব্যাটিং ফ্রেন্ডলি পিচে খানিক নিষ্প্রভ অকার্যকর মনে হয়েছে। কারণ ঐ পিচে বল পিচ করে ভালো গতি ও বাউন্সে ব্যাটে গেছে। তেমন কোন ম্যুভমেন্টও হয়নি। তাই শফিউল, আল আমিন আর মোস্তাফিজরা কিছু করতে পারেননি।

শুধু বোলারদের কথা বলা কেন? বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরাও খুব ভালো ব্যাটিং উইকেটের বাড়তি ফায়দা নিতে পারেননি। কারণ প্রথমত-রোহিত শর্মা, শিখর ধাওয়ান আর রিশাভ পান্তদের মতো খুনে উইলোবাজের অভাব।

যারা আছেন তারাও ক্রিকেটীয় শটের পাশাপাশি ইম্প্রোভাইজ করে কখনো রিভার্স সুইপ, কোন সময় স্কুপ আবার কখনো স্লগ সুইপ খেলে রান করতে পারেননি। চোখের পলকে সীমানার ওপারে বল পাঠানোর মতো পাওয়ার হিটারও নেই।

আর তাই স্লো আর ব্যাটিং উইকেটে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের গড়পড়তা ব্যাটিং শৈলিী, শটস খেলার সামর্থ্য এবং রান করার ক্ষমতা মোটামুটি এক। দিল্লিতে স্লো পিচে ১৪৭ রান টপকে জেতা দলটি রাজকোটের শতভাগ ব্যাটিং পিচেও ১৫৩‘তে গিয়ে থেমে গেছে।

অবশ্য বাংলাদেশ তাদের দুই সেরা ও ফ্রি-স্ট্রোক মেকার তামিম-সাকিবকে মিস করছে। ঐ দুজন ব্যাটিং সহায় উইকেটে আরও বেশি ভালো সামর্থ্য রাখেন। রেকর্ডও সমৃদ্ধ।। বল ঠিকমতো ব্যাটে আসলে তামিম আর সাকিবের ব্যাট যেন বিদ্যুৎ খেলে। বাহারি শটস বেরিয়ে আসে। চার ও ছক্কার ফুলঝুরিও ছোটে। তামিম না পারলেও সাকিব বিশ্বকাপে দেখিয়ে দিয়েছেন ব্যাটিং স্বর্গে তিনি কতটা সাবলীল। স্বপ্রতিভ ও উজ্জ্বল।

কিন্তু এ সিরিজে সাকিব-তামিম নেই। তরুন নাইম শেখ তেড়ে ফুড়ে চেষ্টা করছেন। কিছু সাহসী ও আক্রমনাত্মক চটকদার শটস খেলেছেনও। কিন্তু শতভাগ ব্যাটিং উইকেটের ফায়দা নিয়ে ঝড় বইয়ে দেয়ার ক্ষমতটা এখনো হয়ে ওঠেনি। হয়তো তার জন্য সময় লাগবে।

বাংলাদেশের যে দলটি খেলছে, তাতে উইকেটের সামনে ও দুদিকে স্বচ্ছন্দে বড় ও বাহারি শটস খেলার ক্ষমতা আছে সৌম্য সরকার, সঙ্গী লিটন দাস, মুশফিকুর রহীম আর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের।

লিটনের ব্যাট এখনো কথা বলেনি। জ্বলে ওঠার আগেই নিভে যাচ্ছে। আর সৌম্য নিজের স্বভাবসুলভ আক্রমনাত্মক ব্যাটিং বাদ দিয়ে নিজেকে দলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় ব্যস্ত। তাই রয়ে সয়ে খেলায়ই বেশি মনোযোগী এ বাঁহাতি টপ অর্ডার।

অন্যদিকে দুই চালিকাশক্তি মুশফিক-রিয়াদেরও বেশ ভালো শটস খেলার ক্ষমতা আছে। নিজেদের দিনে তারাও ১৩০/১৪০ স্ট্রাইক রেটে বড়সড় ইনিংস খেলে ফেলতে পারেন।

কিন্তু তাদেরও একটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মুশফিকের যেদিন স্কুপ, রিভার্স সুইপ আর স্লগ সুইপ পারফেক্ট হয়, দিনটিও তার হয়ে ওঠে। কিন্তু যেদিন হয় না, সেদিন রাজকোটের মত প্রথম আক্রমণাত্মক স্লগ সুইপই ফিল্ডারের নাগালের বাইরে না গিয়ে ডিপ স্কয়ার লেগে ক্যাচ হয়ে যায়।

কাজেই বাংলাদেশের জয়ের জন্য চাই অনুকূল প্রেক্ষাপট। তথা সহায়ক উইকেট। শতভাগ ব্যাটিং উইকেট এমনকি স্পোর্টিং পিচেও ভারতকে হারাতে চাই ওপরের সীমাবদ্ধতাগুলো অতিক্রম করে সেরাটা উপহার দেয়া।

তবে আশার কথা, ভাবা হচ্ছে নাগপুরের পিচও নাকি একটু স্লো, ঠিক দিল্লির মতো নয় হয়তো। তবে রাজকোটের চেয়ে নাকি একটু থেমে আসে বল। তাই যদি হয়, তাহলে টাইগারদের জ্বলে ওঠার সম্ভাবনা থাকবে অবশ্যই।

এআরবি/এমএমআর/এমকেএইচ