এবার ভারতের বিপক্ষে কী করবেন ‘ব্যাটসম্যান’ মুশফিক?

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৩:৩০ পিএম, ১৩ নভেম্বর ২০১৯

টেস্ট, ওয়ানডে কিংবা টি-টোয়েন্টি- তিন ফরম্যাটেই বাংলাদেশের তারকা বিশেষ করে সফল পারফরমারের তালিকায় সাকিব আর তামিম ইকবালের নামটা একটু আগে চলে আসে। টাইগারদের ভারত সফর, টি-টোয়েন্টি সিরিজের পর টেস্ট সিরিজ শুরুর আগেও সাকিব আর তামিমকে নিয়েই অনেক কথা।

কিন্তু জানেন কি, সাকিব-তামিমের কেউই টেস্টে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের সেরা পারফরমার নন। তাদের পেছনে ফেলে টিম ইন্ডিয়ার বিপক্ষে টেস্টে বাংলাদেশের সফলতম পারফরমার হলেন মুশফিকুর রহীম।

পরিসংখ্যান তাই জানাচ্ছে, মুশফিক এখন পর্যন্ত ভারতের বিপক্ষে খেলা ৪ টেস্টের দুইবার সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন, রান করেছেন ৩৩৭, সর্বোচ্চ ১২৭। আর গড়ও ঈর্ষণীয়, সবার চেয়ে বেশি ৫৬.১৬! এই গড় টেস্টে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের যেকোনো ব্যাটসম্যানের সবচেয়ে সেরা ব্যাটিং গড়ই শুধু নয়, মুশফিকেরও টেস্টে যেকোনো নির্দিষ্ট দলের বিপক্ষে সেরা গড়।

Mushy-4.jpg

এমনিতে এ ছোট খাট গড়নের মিডল অর্ডারের টেস্ট গড় ৩৪.৭৩। ভারত ছাড়া দ্বিতীয় সেরা গড় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৪৫.৯২। আর প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৪২.৬১। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও প্রায় ৪০ গড় (৩৯.৫০)। কিন্তু ইংল্যান্ড (২৬.৩৫), দক্ষিণ আফ্রিকা (২৩.৬৪), নিউজিল্যান্ড (৩৫.৪১), পাকিস্তান (২৩.৭৫) আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের (৩১.৩৩) বিপক্ষে আহামরি নয়। তার মানে টেস্টে ভারতের বিপক্ষে মুশফিকই এক নম্বর উইলোবাজ বাংলাদেশের।

টেস্টে নিউজিল্যান্ডের মত দলের বিপক্ষে ডাবল সেঞ্চুরি থাকলেও ভারতের বিপক্ষে এখনও কোনো সেঞ্চুরি নেই সাকিবের। তামিম সবচেয়ে বেশি ১১ টেস্ট সেঞ্চুুরির মালিক হলেও ভারতের বিপক্ষে একটির বেশি শতরান করতে পারেননি। সেখানে মুশফিকুর রহীমের আছে একজোড়া শতক।

যার প্রথমটি দেশের মাটিতে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ১৪২ মিনিটে ১১৭ বলে ১৭ বাউন্ডারি ও ১ ছক্কায় ১০১ করেছিলেন মুশফিক। আর দ্বিতীয়টি ভারতের মাটিতে, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে হায়দ্রাবাদে ৩৮১ মিনিটে ২৬২ বলে ১৬ চার ও দুই ছক্কায় করেছিলেন ১২৭ রান।

অর্থাৎ ভারতের বিপক্ষে তার খেলা চার টেস্টের দুইটি সেঞ্চুরি দিয়ে সাজানো, অন্য দুটিতে তিন অংকে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। অবশ্য ঐ দুই টেস্টে একবার আবার ব্যাটিং পাননি। মানে মোট ৭ ইনিংসে দুবার ১০০+ রানের ইনিংস।

কাজেই আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) ইন্দোরে মুমিনুল হকের দল যখন বিরাট কোহলির শক্তিশালী ভারত বাহিনীর মুখোমুখি হবে, তখন অনিবার্যভাবে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের নির্ভরতার প্রতীক থাকবেন মুশফিকুর রহিম। সাকিব ও তামিমের অনুপস্থিতিতে তিনি যে দলের প্রধান ব্যাটিং স্তম্ভ এবং সবচেয়ে পরিণত পারফরমার, সেটা দিল্লীতে তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ম্যাচেরই ৪৩ বলে ৬০ রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংসেই প্রমাণ হয়েছে।

Mushy

ব্যাটিং টেকনিককে মানদণ্ড ধরলে মুশফিক টাইগারদের মধ্যে এক নম্বর। ধৈর্য্য, মনোযোগ আর মনোসংযোগেও অদ্বিতীয়। ইনিংস সাজানোর স্টাইলটা একদম সনাতন হলেও শতভাগ গাণিতিক ও ব্যাকরণ মেনে। শুরুতে উইকেটের গতিপ্রকৃতি বুঝে উঠতে খানিক সময় নেয়ার পাশাপাশি কন্ডিশনের সাথে থিতু হওয়া। ভাল বলকে সমীহ দেখানো আর সময়ের প্রবহাতায় ধীরে ধীরে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে উইকেটের সামনে, দুই পাশে ও পিছনে সব ধরনের শট খেলার পর্যাপ্ত ক্ষমতা আছে তার।

হঠাৎ কিছু উচ্চালিভাশী শট বিশেষ করে রিভার্স সুইপ, স্কুপ আর স্লগ সুইপ খেলার প্রবণাতা আছে। সেগুলো বাদ দিলে সব ফরম্যাটে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে লম্বা সময় উইকেটে টিকে থাকা ও দীর্ঘ ইনিংস সাজানোর ক্ষমতাও মুশফিকের বেশি। তাই তো টাইগারদের মধ্যে একমাত্র তারই আছে দু'দুটি ডাবল সেঞ্চুরি।

সেই মুশফিকই এবার ভারতের বিপক্ষে দুই টেস্টে আশা ভরসার কেন্দ্রবিন্দু। বলার অপেক্ষা রাখে না, টি-টোয়েন্টির চেয়েও টেস্টে আরও বেশি শক্তিশালী ভারত। বিরাট কোহলির নেতৃত্বে ভারতীয়রা টেস্টে অনেক সমৃদ্ধ। ব্যাটিং ও বোলিং দুই'ই অনেক ধারালো। প্রতিপক্ষ হিসেবেও অনেক কঠিন।

বিশেষ করে ইশান্ত শর্মা, উমেশ যাদব আর মোহাম্মদ শামির গড়া পেস আক্রমণ এবং রবিচন্দ্রন অশ্বিন ও রবীন্দ্র জাদেজার সাজানো স্পিন বোলিং এ মুহুর্তে বিশ্ব সেরা না হলেও ভারতের মাটিতে প্রচন্ড শক্তিশালী। বিশ্বের যেকোনো ব্যাটিং শক্তির পক্ষেই ভারতীয় কন্ডিশনে ঐ বোলিং সামলানো কঠিন। দক্ষিণ আফ্রিকার মত দলও এই সেদিন খাবি খেয়েছে।

কাজেই বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য টেস্টে ভারতের বোলিং সামলানো হবে অনেক কঠিন। টি-টোয়েন্টির চেয়ে বহুলাংশে চ্যালেঞ্জিং। এখন সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুশফিকের জ্বলে ওঠা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

Mushy

ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা। সব সম্ভবেরও খেলা। অভিষেক টেস্টে আবুল হোসেন রাজুরও টেস্ট সেঞ্চুরি আছে। জেসন গিলেস্পি বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন। মোহাম্মদ রফিকের মত পুরোদস্তুর বাঁহাতি স্পিনার ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে টেস্ট সেঞ্চুরি করে সবাইকে চমকে দিয়েছেন।

কাজেই মুশফিক না পারলে বাংলাদেশ ধরাশায়ী হবে, আর কেউ কিছুই করতে পারবে না- বিষয়টা অবশ্য অমনও নয়। তবে ভারতের সাড়াশি বোলিং আক্রমণ সামলাতে যে মনের জোর, মানসিক শক্তি, সাহস, উদ্যম, ভাল খেলার দুর্নিবার আকাঙ্খা, টেকনিক, টেম্পারমেন্ট, ধৈর্য্য, মনোসংযোগ দরকার- তা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে মুশফিকেরই আছে বেশি। সেটা একবার নয়, বহুবার প্রমাণ হয়েছে।

মুশফিক আগে পেরেছেন। ভারতের বিপক্ষে তার দুটি টেস্ট সেঞ্চুরি দুই রকমের। প্রথমটি একদম আক্রমণাত্মক। প্রায় ওয়ানডে মেজাজে (১১৭ বলে ১০১)। আর অন্যটি আড়াই বছর আগে হায়দরাবাদে ভারতের বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্টে। একদম সনাতন ও প্রথাগত টেস্ট ব্যাটিং। ধৈর্য্য আর মনোযোগের মিশেলে ৬ ঘন্টা ২১ মিনিট উইকেটে কাটিয়ে ২৬২ বলে ১২৭ রানের ইনিংসটি ছিল সময়োপযোগী। তাই তার দিকেই তাকিয়ে পুরো দল।

এবার ভারতের সাথে ভাল খেলতে মুখিয়ে মুশফিকও। ব্যাট হাতে সামর্থ্যের সবটুকু উজার করে দিতে নিজের অতি প্রিয় উইকেট কিপিংও ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জানা গেছে, ইন্দোরে লিটন দাস কিপিং করবেন। মুশফিক খেলবেন ব্যাটসম্যান হিসেবে।

মুশফিক কিপিং করতে খুব ভালবাসেন। কিপিং তার পছন্দের। তাই বলে তিনি কখনো কিপিং ছাড়া শুধু ব্যাটসম্যানের তকমা এঁটে কখনো টেস্ট খেলেননি এমন নয়।

পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, এর আগে মুশফিক ৫৫ টেস্টে উইকেটকিপার কাম ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলেছেন। আর মাত্র ১২ টেস্টে শুধুই উইলোবাজের তকমায় মাঠে নেমেছেন। তবে তার সাফল্য, সেঞ্চুরি, ডাবল সেঞ্চুরি আর বেশিরভাগ হাফ সেঞ্চুরি ঐ কিপার কাম মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে।

মোট ৬ সেঞ্চুরির (দুটি ডাবল সেঞ্চুরিসহ) সবকটাই কিপার ও মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলতে নেমে। শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে এখনও কোন টেস্ট সেঞ্চুরি নেই। তার মোট টেস্ট রানের (৬৭ টেস্টে ৪০২৯) প্রায় ৯০ ভাগই (৩৫১৫) কিপার কাম ব্যাটসম্যান হিসেবে। আর ১২ টেস্টে শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে সংগ্রহ মোটে ৫১৪।

এবার ভারতের সাথে শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে কী করেন মুশফিক?- সেটাই দেখার। ইতিহাসের ধারা পাল্টে শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলতে নেমে প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পাবেন? নাকি আগের মতই খানিক ফিঁকে আর অনুজ্জলতায় ভুগবেন? আগামীকাল থেকে সামনের চার-পাঁচ দিনেই তা জানা হয়ে যাবে।

এআরবি/এসএএস/এমএস