দুঃসাহসী অভিযানের মুখোমুখি সাহসী নাবিক মুমিনুল

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৪:৪২ পিএম, ১৩ নভেম্বর ২০১৯

তিনি টেস্টে এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের শীর্ষ রান সংগ্রাহক নন। রান তোলায় তার অবস্থান সাত নম্বরে। তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহীম, সাকিব আল হাসান, হাবিবুল বাশার সুমন, মোহাম্মদ আশরাফুল ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের পরে; কিন্তু তারপরও টেস্টে মুমিনুল হক হচ্ছেন টিম বাংলাদেশের বড় এক পারফরমার। সফলতম টেস্ট উইলোবাজ। ম্যাচ হিসেব করলে, তার গড়পড়তা সেঞ্চুরিই বেশি।

সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি যার, সেই তামিম ইকবাল ৯টি সেঞ্চুরি করেছেন ৫৬ টেস্টে। সেখানে মুমিনুল হকের ৩৬ টেস্টেই ৮ সেঞ্চুরি। সেটাই শেষ নয়। আসল কথা হলো, বাংলাদেশের ব্যাসম্যানদের মধ্যে টেস্ট গড় (৪১.৪৭)সবচেয়ে সমৃদ্ধ, ভাল ও বেশি এ বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যানের।

এছাড়া ধারাবহিকতাও তার সবচেয়ে ভাল। সে কারণেই সেই ২০১৩ সালে অভিষেকের পর থেকে যত সময় গড়িয়েছে ততই নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে তার ব্যাট। এ ছোট-খাট গড়নের মানুষটিই ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের বড় আস্থার প্রতীক।

হাঁটা-চলা আর কথা-বার্তা তথা শরীরি ভাষা যতই নরম মনে হোক না কেন, ভিতরে ভিতরে মুমিনুল এক সাহসী যোদ্ধা। তাঁর অস্থি-মজ্জায় আস্থা ও আত্মবিশ্বাস। শিরা-উপশিরায় সামর্থ্যের প্রতি আস্থা। এবার সেই সাহসী নাবিক এক নতুন পথে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছেন। আগামীকাল ১৪ নভেম্বর শুরু হচ্ছে ‘অধিনায়ক’ মুমিনুলের নতুন ক্যারিয়ার।

বৃহস্পতিবার থেকে ভারতের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে মাঠে নামছে বাংলাদেশ। দুই পরিণত, অভিজ্ঞ যোদ্ধা থাকার পরও এ কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং মিশনে বাংলাদেশের অধিনায়ক সাগর পাড়ের জেলা কক্সবাজারের ২৮ বছরের মুমিনুল।

তার টেস্ট ক্যাপ্টেন্সির শুরু কেমন হবে? মুমিনুলের নেতৃত্বে কি করবে টাইগাররা? কৌতুহলি প্রশ্নের শেষ নেই। সন্দেহ নেই তার নতুন পথের যাত্রা সহজ হবে না। ভারত নিজ মাটিতে বরাবরই টেস্টে দারুণ শক্তিশালী। প্রবল এক প্রতিপক্ষ।

এখন সেটা বেড়েছে বহুগুনে। এক সময় কয়েকজন বিশ্বমানের ব্যাটসম্যান আর একঝাঁক মেধাবী ও উঁচু মার্গের স্পিনার দিয়েই ঘরের মাঠে যে কোন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতো ভারত; কিন্তু সময়ের প্রবহামানতায় সে চালচিত্র পাল্টেছে।

এখন ভারত মানেই বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, চেতেশ্বর পুজারা আর আজিঙ্কা রাহানের মত বিশ্বমানের ব্যাটসম্যানের দল। ভারত মানেই ঈশান্ত শর্মা, উমেষ যাদব আর মোহাম্মদ শামির মত সময় সেরা পেসারদের বারুদমাখানো পেস বোলিং আর রবিচন্দ্রন অশ্বিন ও রবীন্দ্র জাদেজা জাদুকরি স্পিন বোলিংয়ের এক দুর্ধর্ষ দল।

এমন এক দলের বিপক্ষে তাদের মাটিতে টেস্টে হালে পানি পাচ্ছে না অনেক দলই। এইতো গত মাসেই ভারতের মাটিতে খেলতে এসে তুলোধুনো হয়ে গেলো দক্ষিণ আফ্রিকা। তারও আগে ভারতে এসে টেস্টে খাবি খেয়েছে অস্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজও। অজিরা ২-১’এ সিরিজ হেরেছে। আর ক্যারিবীয়রা হেরেছে ২-০’তে।

সেই দলটির বিপক্ষে প্রথমবার অধিনায়ক হয়ে দুই ম্যাচের সিরিজ খেলতে যাওয়া। ভয়ে-ডরে কুঁকড়ে যাওয়ার কথা; কিন্তু মুমিনুলের কোনই বিকার নেই।

দেশ ছাড়ার আগে এ প্রতিবেদককে দেয়া একান্ত সাক্ষাতকারে বলে গিয়েছেন, ‘কোনোরকম নেতিবাচক চিন্তা মাথায় নেই আমার। পজিটিভ ভাবতে চাই। মাঠে ড্র’র জন্য যেতে চাই না। তিনদিন না চারদিন টিকে থাকাও লক্ষ্য নয়। আমি যখন মাঠে নামবো, জেতার জন্যই মাঠে নামবো। ভারত কত ভালো ও বড় দল, সেটা আর সবার মত আমিও জানি। ভারতের মাটিতে তাদেরই সাথে খেলা কঠিন। আর হারানো আরও শক্ত ও চ্যালেঞ্জিং- তাও খুব ভালোই জানি। কিন্তু মনের দিক থেকে রক্ষণাত্মক থাকতে চাই না। ডিফেন্সিভ ওয়েতেও ভাবতে চাই না। জেতার জন্যই নামতে চাই।’

কিন্তু জিততে চাইলে তো আর হবে না! এ কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং মিশনে তিনি পাচ্ছেন না, দুই প্রধান চালিকাশক্তি সাকিব আল হাসান এবং তামিম ইকবালকে। তামিম না থাকার অর্থ, টপ অর্ডার ব্যাটিং দুর্বল হয়ে পড়া। আর সাকিব ছাড়া পুরো দলের শক্তি তিন ভাগের এক ভাগ কমে যাওয়া।

সেখানে তাদের মত দুই প্রধান চালিকাশক্তি ও নির্ভরযোগ্য পারফরমার ছাড়া টেস্ট জেতা যে, হঠাৎ এভারেস্টের চুড়ায় ওঠার মত কঠিন। আর তারচেয়েও বড় কথা, টেস্ট জিততে ভাল ব্যাটিং, বড় স্কোরের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি দরকার ধারালো বোলিং। যে ডিপার্টমেন্টের মূল পারফরমার সাকিব।

এতগুলো নেতিবাচক দিক, বাঁধা-বিপত্তি অতিক্রম করা কি চাট্টিখানি কথা? মুমিনুল কি তা পারবেন? তার বোলারদের কি ভারতের ২০ উইকেট শিকারের ক্ষমতা আছে? নেই।

মুমিনুল অবশ্য তা মানতে নারাজ। তার কথা, সত্যিই আমাদের ভারতকে দুইবার অলআউট করার ক্ষমতা আছে কি নেই? ‘আমি ওভাবে দেখতে চাই না। তা নিয়ে পড়েও থাকতে রাজি নই। আমার দলের বোলারদের ভারতের ২০ উইকেট পতনের ক্ষমতা নেই, এমনটা মাথায় থাকলে আমাদের টেস্ট খেলাই উচিত না। আমার যা আছে, তা নিয়েই খেলতে হবে। সেটা নিয়েই মাঠে নামতে হবে। এবং ইতিবাচক মানসিকতা নিয়েই খেলতে হবে। আমি তো আর আগে থেকে ছেড়ে দিতে পারি না। আমি মাঠে নামার আগে হারতে চাই না। আমার যে শক্তি, তা যেমনই হোক তা নিয়েই খেলতে নামবো।’

দেখা যাক শেষ পর্যন্ত সাহসী মুমিনুলের নতুন যাত্রা কেমন হয়?

এআরবি/আইএইচএস/পিআর