মুমিনুল-মুশফিককে নিয়ে আক্ষেপ আর যত কথা ব্যাটিং অ্যাপ্রোচ নিয়ে

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৭:১০ পিএম, ১৪ নভেম্বর ২০১৯

কি হলে কি হতো? টস জিতে ব্যাটিং কেন? ফিল্ডিং নিলে কি ভালো হতো? সেটা কি আরও যুক্তিযুক্ত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হতো না? টি-টোয়েন্টি সিরিজে আনকোরা নাইম শেখকে খেলানোর জুয়া সফল হয়েছে। টেস্ট সিরিজে ইমরুলকে না খেলিয়ে সাইফ হাসানকে সুযোগ দিলে কি হতো?

ইমরুল ৩৭ টেস্টের অভিজ্ঞতা নিয়ে যা খেলেছেন, সাইফ তার টেস্ট জীবন শুরু করে কি এর চেয়ে খারাপ খেলতেন? কে জানে হয়তো একটা বড়সড় মানে অন্তত একটি হাফসেঞ্চুরি করে ফেলতে পারতেন। যেখানে একদমই কিছু হয়নি, সেখানে ওপরের দিকে একজন রান পেলে হয়তো প্রথম ইনিংসের চেহারা এত জীর্ণ-শীর্ণ নাও হতে পারতো।

দিনশেষে এসব কথা ও প্রশ্ন উঠছে। তা উঠবেই। ক্রিকেট খেলাটাই এমন। একটা ২০ ওভারের ম্যাচ নিয়ে খেলা শেষে অনেক কথা হয়। কি করলে কি হতো, আর কেনইবা হলো-এসব নিয়ে বিস্তর কথাবার্তা হয়। সেখানে একটা টেস্ট ম্যাচের পুরো তিন সেশন মানে ৬ ঘন্টার বেশি সময়ের খেলায় কত ঘটনাই না ঘটে, তা নিয়ে রাজ্যের কথাবার্তা হওয়ারই তো!

আজ বৃহস্পতিবার ইন্দোরে ভারতের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের প্রথম দিনের খেলা শেষেও নানা আলোচনা পর্যালোচনা। টাইগারদের ব্যাটিংয়ের সমালোচনা। অবশ্য সে কথোপকথন শুরু হয়েছিল, দিনের প্রথম দুই সেশন না যেতেই।

প্রথম চার ঘন্টায় বাংলাদেশ একদম খাদের কিনারায় পড়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে আর উঠে আসা সম্ভব হয়নি। অথচ ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ও সুযোগ ছিল। বলতে দ্বিধা নেই, সে সম্ভাবনা যতটা না নিজেদের চেষ্টায় তার চেয়ে অনেকখানি ভারতীয় ফিল্ডারদের বদান্যতায়।

সারা দিনে ভারতীয় ফিল্ডাররা অন্তত চার থেকে পাঁচটি ক্যাচ ফেলেছেন। এক মুশফিকুর রহীমই তিন তিনবার (যথাক্রমে ৩ ৪ ও ৩৬ রানে) জীবন পেয়েও ইনিংসকে টেনে লম্বা করতে পারেননি। ফিরে এসেছেন ৪৩ রানে।

এমনকি অধিনায়ক মুমিনুল হকও একদম শুরুতে অফস্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিনের বলে স্লিপে রাহানের হাতে বেঁচে যান। তারপর সেই অশ্বিনের বলেই ছেড়ে দিয়ে বোল্ড হয়েছেন। ক্রিকেট খেলাটাই এমন। সবাই সব দিন রান করবেন না। ভাল খেলবেন না। সবার ব্যাট প্রতিদিন কথা বলবেন না। যেদিন যিনি উইকেটে থিতু হতে পারবেন, বেশি সময় উইকেটে কাটাবেন, ধরে নিতে হবে সেদিন তারই পালা ভাল খেলার। রান করে দলকে এগিয়ে নেয়ার।

যারা একদমই পারেননি, তাদের ব্যর্থতা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। তাদের ব্যাটিং অ্যাপ্রোচ নিয়ে রাজ্যের সমালোচনা। নতুন বলে শরীর না নিয়ে জায়গায় দাঁড়িয়ে খেলা ইমরুলের ব্যাটিং নিয়ে সমালোচনার ঝড়। আরেক বাঁহাতি সাদমান ইসলামও ‘তথৈবচ।’

তিন স্লিপ এক গালি নিয়ে ভারতীয় পেসার ইশান্ত শর্মা আর উমেশ যাদব রাউন্ড দ্য উইকেট বল করেছেন, তার মানে তারা বাংলাদেশের বাঁহাতি ওপেনারদের অফস্ট্যাম্পের আশপাশে বল ফেলে ড্রাইভ খেলতে বা বলের ওপর চড়াও হতে প্রলুব্ধ করেছেন- এ চরম সত্য না বুঝলে আর টেস্ট খেলতে নামা কেন?

অথচ ঐ দুই বাঁহাতি ওপেনারের দুজনই অফস্ট্যাম্পের বাইরের বলে ব্যাট পেতে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন। মোহাম্মদ মিঠুন আর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ হেঁটেছেন আরেক ভুল পথে। মোহাম্মদ শামির বল ভিতরে আসে, তা দেখে জেনেও উইকেট সোজা বলকে সোজা না খেলে খানিক আড়াআড়ি ব্যাটে খেলতে গিয়ে লেগবিফোর উইকেটের ফাঁদে জড়িয়েছেন মিঠুন।

আর অভিজ্ঞ রিয়াদ অফস্পিনার অশ্বিনকে সুইপ করতে গেলেন লেগস্ট্যাম্প উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। ফল যা হবার তাই হয়েছে। বোল্ড হয়ে ফিরেছেন সাজঘরে।

মুমিনুল আর মুশফিক চেষ্টা করেছেন কিছু করার। ভারতীয় ফিল্ডাররা এক গন্ডা ক্যাচ ফেলে তাদের সুযোগ দিয়েছিলেন আরও বড়সড় কিছু করার। কিন্তু কেউ তা কাজে লাগিয়ে ইনিংস বড় করতে পারেননি। যেখানে বাকি সবাই ব্যর্থতার মিছিলে, সেখানে কয়েকবার ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যাওয়া মুমিনুল -মুশফিক দীর্ঘ সময় উইকেটে কাটিয়ে বড় ইনিংস খেলতে না পারার চরম মাশুলও গুনতে হয়েছে।

মুমিনুল আর মুশফিক জুটি এক সেশন খেলে ফেলতে পারলে হয়তো আজকের দিনটি পার করে দেয়া সম্ভব হতো। তাতে করে শুধু যে প্রথম দিন পার হতো তাই নয়, স্কোর বোর্ডেও অন্তত শ‘ খানেক বাড়তি রান যুক্ত হতো।

তা আর হয়নি। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস শেষ হয়েছে ১৫০ রানে। ইনিংসের দৈর্ঘ্য পুরো ৫৯ ওভারও হয়নি। ৫৮.৩ ওভারেই কম্ম কাবার। যেখানে একবার জীবন পেয়ে সেঞ্চুুরি হচ্ছে অহরহ, সেখানে এক ইনিংসে তিন তিনবার আউটের হাত থেকে বেঁচে গিয়েও কেন সেঞ্চুুরি হবেনা? যত কথা তা নিয়েই।

তাই আজকের খেলা নিয়ে যত কথা হচ্ছে, তার প্রায় পুরোটাই ঐ আক্ষেপ-অনুশোচনা। ইশ, মুমিনুল আর মুশফিক যদি লাইফ পেয়ে আরও বড় জুটি গড়তে পারতন, তাহলে হয়তো প্রথম দিন শেষেই একদম তলানিতে যেতে হতো না।

এর বাইরে টাইগারদের ব্যাটিং অ্যাপ্রোচ আরও শরীরী ভাষা নিয়েও সমর্থক মহলে রাজ্যের হতাশা। সবার প্রশ্ন, টেস্ট খেলার ১৯ বছর পার করেও এ কেমন অ্যাপ্রোচ? এটা কি টেস্ট ব্যাটিং? ভারতীয় বোলাররা কি দূর্বোধ্য ছিলেন?

হ্যাঁ, তিন পেসার ইশান্ত শর্মা, উমেশ যাদব আর মোহাম্মদ শামি জোরের ওপর বল করেছেন। মাঝে মধ্যে কিছু ডেলিভারি ম্যুভও করিয়েছেন। আর অফস্পিনার অশ্বিন নিজের কারিশমায় বল ঘোরানোর পাশাপাশি অনবরত ভাল জায়গায় বল ফেলেছেন। কিন্তু তাই বলে এক দিনও টিকে থাকা যাবে না? উইকেটে তো কোনো সমস্যা ছিল না। কেউ বলবেনা উইকেট বোলিং ফ্রেন্ডলি ছিল। আসলে ঘাটতি ছিল যথাযথ অ্যাপ্রোচ ও অ্যাপ্লিকেশনের।

এটা ঠিক ভারতের একজন বোলারও আলগা বোলিং করেননি। সবাই একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও পরিকল্পনায় সাজানো ফিল্ডিং নিয়ে যতটা সম্ভব ড্রাইভিং জোনের নিচে অফস্ট্যাম্প ও আশপাশে কখনো বা উইকেট সোজা বল ফেলে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের পরীক্ষা নিতে চেয়েছেন। সেটা তো তারা নেবেনই।

কিন্তু অমন সাঁড়াশি আক্রমণের বিপক্ষে খেলার জন্য যে মানসিক দৃঢ়তা, ধৈর্য্য, মনোযোগ আর মনোসংযোগ প্রয়োজন, তার কি ছিল মুমিনুল বাহিনীর। প্রথম ইনিংসের ব্যাটিং দেখলে সেটা মনে হবে না। আর তাই প্রথম দিন শেষেই খাদের কিনারায় পড়ে হাবুডুবু খাওয়া। সেখান থেকে ওঠা সম্ভব হবে কি? প্রশ্নটা ওঠে যাচ্ছে টেস্টের একদিন গড়াতেই।

এআরবি/এমএমআর/পিআর