শ্রীহীন ব্যাটিংয়ে প্রথম সেশনেই ফ্যাকাশে ইডেনের বর্ণিল উৎসব

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৩:৪০ পিএম, ২২ নভেম্বর ২০১৯

এর চেয়ে বড় ক্রিকেট উৎসব আর কি হতে পারে? ভারত তথা এ অঞ্চলে প্রথম দিবারাত্রির টেস্ট ম্যাচ। চিরায়ত লাল বলের বদলে প্রথম গোলাপি বলে ফ্লাডলাইটের আলোয় টেস্ট ক্রিকেট। যা দেখতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং উপস্থিত।

তাও ভিভিআইপি গ্যালারির কাঁচের ঘরে বসে নয়, একদম মাঠের ভেতরে এসে ক্রিকেটারদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করলেন। ভারতের ক্রিকেটারদের সাথে পরিচিতির পর্বের ঠিক মুহূর্তকাল পর নিজ দেশের সন্তানতুল্য ক্রিকেটারদের মাতৃস্নেহে শুভাশিষ জানালেন, অনুপ্রেরণা জোগালেন। ভাল খেলার সাহসও দিলেন।

তারপর গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডে গিয়ে ভারত তথা বিশ্ব ক্রিকেটের জীবন্ত কিংবদন্তি শচিন রমেশ টেন্ডুলকারকে বাঁয়ে রেখে গিয়ে ভিআইপিতে বসে খেলা দেখতে বসলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান পাপনও তার ডানে বসা।

ক্রিকেটের ‘নন্দন কানন’ ইডেনে এক অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য। সর্বোচ্চ উৎসাহ-উদ্দীপনা। বাংলাদেশের হয়ে ১৯ বছর আগে যে ক্রিকেট যোদ্ধারা শুরু করেছিলেন টেস্ট যাত্রা, আমিনুল ইসলাম বুলবুল আর আল শাহরিয়ার রোকন ছাড়া অভিষেক টেস্টের ১৪ ক্রিকেটার মাঠে উপস্থিত।

বাংলাদেশের ক্রিকেট অগ্রযাত্রার সেনাপতি আকরাম খান, মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, নাইমুর রহমান দুর্জয়, খালেদ মাহমুদ সুজন, খালেদ মাসুদ পাইলট প্রমূখ মাঠে উপস্থিত। ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর শুরু হওয়া ঐ ঐতিহাসিক টেস্ট ম্যাচে ভারতীয় দলে যারা ছিলেন তারাও উপস্থিত। ভারতের সাবেক অধিনায়কদের মধ্যে যারা জীবিত তাদেরও বড় অংশ আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে ইডেনে। ভারতের এ ক্রিকেট তীর্থে এখন ক্রিকেটার, কোচ আর নামী ও বিশিষ্ঠ ব্যক্তিত্বদের অন্যরকম সম্মেলন। গ্যলাারিতে ক্রিকেট অন্তঃপ্রাণ হাজার হাজার সমর্থক। মোদ্দা কথা, একটা অন্যরকম উৎসবমুখর পরিবেশ।

এক অন্যরকম ক্রিকেট উৎসব আনন্দে মুখর এখন ইডেন। ভাল খেলার অনুকূল ক্ষেত্র। নিজেকে মেলে ধরার সর্বোত্তম মঞ্চ।এত বড় আর বর্ণাঢ্য আয়োজন কি শুধু ভাল খেলার অনুকূল ক্ষেত্র? এতে কি কোন বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে না? ভাল খেলতে গিয়ে একবারের জন্য বুক কাঁপবে না? গোলাপি বলে প্রথম টেস্ট খেলার চিন্তার পাশাপাশি আয়োজনের বিশালতা ও বর্ণিল উৎসব অবচেতন মনে হলেও একটু স্নায়ুর ওপর চাপ ফেলবে না?

ফেলবেই না, তা জোর দিয়ে বলাও যে কঠিন। কারণ হলো এমন রঙিন, বর্ণাঢ্য ও বিরাট মঞ্চ, বিশিষ্ট সব ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিও কিন্তু একটা মানসিক চাপ, বড় বাঁধা। দেশের প্রধানমন্ত্রী চলে এসেছেন খেলা দেখতে, পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের মাঠে। ভারতের সাবেক অধিনায়করা খেলা দেখছেন। আমাদের হয়ে যারা টেস্ট খেলা শুরু করেছেন, সেই অকরাম ভাই, দুর্জয় ভাই, সুমন ভাই, জাভেদ ভাই, শান্ত ভাই, অপি ভাই, বিদ্যুৎ ভাইরা খেলা দেখছেন। ইডেন লোকে লোকারণ্য, রীতিমত একটা ক্রিকেট উৎসব।

এমন উৎসবের সঙ্গে মানিয়ে নেবার জন্য চাই মানসিক প্রস্তুতি। পুরো আয়োজনের সঙ্গে মিশে যাবার মানসিকতা। ভেতর থেকে উৎসবটাকে উপভোগ করে নিজের করণীয় স্থির করা। মনের দৃঢ়তা, শক্ত মনোবল ও ভাল খেলার দৃঢ় সংকল্পটাও যে খুব জরুরী।

তাই সংশয় ছিল, বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা এত অনুকূল পরিবেশ-পরিস্থিতি আর বিশাল আনন্দ যজ্ঞে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবেন তো? প্রশ্নটাকে নেতিবাচক ভাবার দরকার নেই। শুনতে যতই কানে লাগুক এটাই নির্মম সত্য। বার বার মনে হচ্ছিল এত বিপুল আয়োজন, এমন উৎসব আনন্দ আর বর্ণাঢ্য উৎসবে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে গিয়ে না আবার ‘লেজেগোবড়ে’ করে বসেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা? এত বড় আয়োজন-উৎসবের সাথে কি ব্যাটিংটার মিল থাকবে? মুমিনুল হক টস জিতে ব্যাটিং বেছে নেবার থেকেই বারবার প্রশ্ন জাগছিল। রাজ্যের সংশয়, সন্দেহ আর শঙ্কা এসে হানা দিচ্ছিলো?

বারবার মনে হচ্ছিলো, মুমিনুলের দল কি এত বড় আয়োজন আর উৎসব মুখর পরিবেশে অনেক নামী ক্রিকেট ব্যক্তিত্বের সামনে নিজেদের নার্ভ ঠিক রাখতে পারবে? নাকি প্রথমবার গোলাপি বলে টেস্ট খেলার চিন্তার পাশাপাশি বাড়তি টেনশন এসে ভড় করবেনা তো? তাতে করে না আবার নিজেদের সেরা খেলাটা কঠিন হয়ে যায়?

এসব সাত পাঁচ ভাবতেই শুরু হলো টেস্ট। শুরুতে সাদমানকে দেখে ভিতরে সাহস জাগছিল। মনে হচ্ছিলো, ইন্দোরের চেয়ে শুরুটা ভাল হতে পারে। কিন্তু ক্রিকেট তো আর একজনার খেলা না। বিশেষ করে উদেদ্বাধনী জুটিটা বেশী গুরুত্বপূর্ণ। ইমরুল কায়েসকে দেখে মনে হলো পুরো আয়োজন ও উৎসবে বেমানান। কোথায় চোখে মুখে থাকবে চনমনে ভাব।

তার বদলে চোখ মুখ দেখেই মনে হলো যেন জোর করে নেমেছেন। ফুটওয়ার্কের বালাই ছিল না। বলের পিছনে যেতেও পারছিলেন না। যাবার চেষ্টাও ছিলনা তেমন। পরিণতি যা হবার তাই হলো। শুরুতে একবার কট বিহাইন্ডের আবেদন থেকে রিভিউ নিয়ে বেঁচে গিয়েও পরের মুহুর্তে জায়গায় দাড়িয়ে খেলে লেগবিফোর উইকেটের ফাঁদে জড়িয়ে পড়লেন ইমরুল।

বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা শরীর ও মনে এমন বর্ণিল উৎসবের সাথে মিল রেখে ব্যাটিং করতে না পারলেও ভারতীয়রা খেললেন পুরো উদ্যমে। উৎসাহ-উদ্দীপনা আর ভাল করার তাড়না, বাসনা আর সংকল্পটা অনেক বেশিই মনে হলো বিরাট কোহলির দলকে।

তিন ভারতীয় ফাস্ট বোলার ইশান্ত শর্মা, উমেশ যাদব আর মোহাম্মদ শামির শুরু দেখে মনে হলো এমন উৎসব নিজেদের করতেই মাঠে নেমেছে তারা। প্রত্যেকের বোলিং যেন ‘আগুনের গোলা’। উমেশ যাদবের বলে প্রথম স্লিপে তার প্রায় একগজের বেশি বাইরে দিয়ে চলে যেতে থাকা ক্যাচ ঈগলের মত শরীর শূন্যে ছুড়ে যে অসামান্য দক্ষতা ও ক্ষিপ্রতায় বাংলাদেশ অধিনায়ক মুমিনুল হকের যে ক্যাচটি ধরলেন, তাতেই মনে হলো এমন উৎসবের রঙ্গে নিজেদের রঙিন করতে কতটা উদ্যমী আর উৎসাহী ভারতীয়রা।

ভারতীয়দের আগ্রাসী ও উজ্জীবিত বোলিংয়ের মুখে নেহায়েত সাদামাটা ও দূর্বল প্রতিরোধ বাংলাদেশের। ভাঙাচোরা মনোবল ও দুর্বল মানসিকতায় বোল্ড হলেন মিঠুন আর মুশফিকুর রহিম। ব্যাট ও প্যাডের ফাঁক থাকার কারণেই আউট হন মুশফিক। একদিক আগলে রাখার খানিক চেষ্টায় থাকা ওপেনার সাদমানও উমেশ যাদবের বলে অফস্টাম্পের বাইরে পরাস্ত হয়ে ক্যাচ দিলেন উইকেটের পিছনে। অনেক বর্ণাঢ্য, বর্ণিল উৎসব আর মহা আয়োজন ফ্যাকাসে হলো টেস্ট শুরুর প্রথম সেশনেই।

এআরবি/এসএএস/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]