ক্রিকেটার-কোচ সালাউদ্দীনের স্মরণীয় ম্যাচের গল্প

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৯:৫১ পিএম, ০৪ এপ্রিল ২০২০

বাংলাদেশে এখন যারা ফ্রন্টলাইন কোচ, তাদের প্রায় সবাই প্রথমে ক্রিকেটার, পরে প্রশিক্ষক। কেউ বা ঘরোয়া ক্রিকেটের গন্ডি পেরিয়ে জাতীয় দলের হয়ে খেলে তারপর লেভেল ওয়ান-টু করে কোচ হয়েছেন। আবার কেউ বা খেলেয়াড়ী জীবন শেষ করেই কোন না কোনো ক্লাবের প্রশিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

এবারের প্রিমিয়ার লিগের ১২ দলের বেশ ক’জন আছেন যারা ক্লাব ক্রিকেট ও ঘরোয়া আসরে সুনামের সঙ্গে খেলে জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন। সেই তালিকায় আছে খালেদ মাহমুদ সুজন, মোহাম্মদ রফিক, মিজানুর রহমান বাবুল, তালহা জুবায়ের, আফতাব আহমেদ।
সহকারি হিসেবে থাকা রাজিন সালেহ আর ফয়সাল হোসেন ডিকেন্সও জাতীয় দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। রাজিন তো এক আসরে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করেছেন। তারপর প্রশিক্ষণের সাথে জড়িয়ে পড়েছেন। আবার কেউ কেউ আছেন যারা জাতীয় দলে খেলেননি। তবে ক্লাব ক্রিকেট আর প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ার শেষ করেই কোচিংয়ে জড়িয়ে গেছেন। সেই তালিকায় বয়োজ্যেষ্ঠ সারোয়ার ইমরান, মোহাম্মদ সালাউদ্দীন, সোহেল ইসলাম আর নাঈম, নাসিরউদ্দীন ফারুক, ডলার মাহমুদরা আছেন।

খুব স্বাভাবিকভাবেই তাদের খেলোয়াড়ী জীবনেরও কিছু স্মরণীয় ঘটনা থাকে। চাওয়া, পাওয়া আর না পাওয়ার গল্পও আছে। এ পর্বে আজ শনিবার থাকছে মোহাম্মদ সালাউদ্দীনের ক্রিকেটার হিসেবে স্মরণীয় ম্যাচ আর প্রশিক্ষক সালাউদ্দীনের সাফল্যের গল্প।

বাংলাদেশের ক্রিকেটোর বিশেষ করে ৭০, ৮০ আর ৯০ দশকে খেলাদের প্রায় সবার স্মরণীয় ঘটনা মানেই ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট আজ যার নাম প্রিমিয়ার লিগ। ক্রিকেটার মোহাম্মদ সালাউদ্দীনের স্মরণীয় ম্যাচটিও এই ঢাকার সিনিয়র ডিভিশন ক্রিকেট লিগে।

দিন তারিখ ঠিক মনে নেই। তবে সময়কাল যে ১৯৯৪-১৯৯৫ মৌসুম, তা বলতে এতটুকু দেরি হয়নি সালাউদ্দীনের। ঢাকা লিগে তার ছিল সেটা প্রথম বছর। খেলতেন তখনকার ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের মাঝারী শক্তির ওয়ারিতে। সালাউদ্দীন একা নন। আজকের প্রতিষ্ঠিত অনেক মুখ মাসুদুর রহমান মুকুল, হাসানুজামানও তখন ওই ওয়ারিতেই খেলতেন।

Salauddin

সদ্য বিকেএসপি থেকে বের হওয়া মোহাম্মদ সালাউদ্দীনের তখন কতই বা বয়স। ১৮ কিংবা ১৯ হবে; কিন্তু শুনলে অবাক হবেন, যে ম্যাচটি তার ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং নৈপুণ্যর জন্য স্মরনীয় হয়ে আছে, সেই ম্যাচের প্রতিপক্ষ কিন্তু তখন বেশ শক্তিশালী ছিল এবং ভারতের দুই সাবেক টেস্ট ক্রিকেটার অরুনলাল আর অশোক মালহোত্রা তখন ওই দলের নিয়মিত সদস্য।

সেই গুলশান ইয়ুথের বিপক্ষেই নিজের খেলোয়াড়ী জীবনের সবচেয়ে সেরা নৈপুণ্য দেখিয়েছিলেন তখনকার উঠতি যুবা সালাউদ্দীন। মাঝারী গতির পেস বোলার ছিলেন। নিয়ন্ত্রন ছিল বেশ। খুব না হলেও একটু-আধটু সুইংও করাতে পারতেন। বুদ্ধি খাটিয়ে ব্যাটসম্যানের গতি-প্রকৃতি বুঝে একটু বৈচিত্র্য আনার চেষ্টাও ছিল।

সেটা কাজে লাগিয়েই আজ থেকে ২৫ বছর আগে ধানমন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ৮ রানে ৪ উইকেট দখল করে ম্যাচ উইনিং বোলিংয়ে ওয়ারীকে এনে দিয়েছিলেন স্মরণীয় জয়।

আজ শনিবার জাগো নিউজের সাথে তার খেলোয়াড়ী ও কোচিং ক্যারিয়ারের সেরা সাফল্য আর স্মরণীয় ঘটনা বলতে বলা হলে সালাউদ্দীন এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললেন সে ম্যাচের স্মৃতি-বিনয়ী সালাউদ্দীনের প্রথম সংলাপ, আমি কিন্তু খুব উঁচু দরের বড় বোলার ছিলাম না। আর আমার ক্যারিয়ারও খুব দীর্ঘ নয়। শুরু করেছি ওয়ারীতে। প্রথম দুই বছর ওয়ারীতে খেলার পর ব্রাদার্সে খেলেছি তিন বছর। তারপর ভিক্টোরিয়া গিয়ে প্লেয়ার কাম অ্যাক্টিং কোচ হয়ে গেছি।

তবে আমার খেলোয়াড়ী জীবনের স্মরণীয় ম্যাচের কথা বলতে গেলে একটি খেলার কথাই মনে হয়। তা ছিল ১৯৯৪-১৯৯৫ লিগে। ধানমন্ডি আবাহনী মাঠে (ধানমন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে) ওয়ারীর হয়ে গুলশান ইয়ুথের বিপক্ষে ৮ ওভারে ৪ মেডেনসহ মাত্র ৮ রান দিয়ে ৪ উইকেটের পতন ঘটিয়ে দল জিতিয়েছিলাম। সেই ম্যাচের বোলিংটাই আমার এখনো মনে দাগ কেটে আছে।

২৫ বছর আগের কথা। ঠিক কার কার উইকেট নিয়েছিলাম, কাকে কাকে আউট করেছি, তা পুরোপুরি মনে নেই। শুধু এটুকু পরিষ্কার মনে আছে গুলশান ইয়ুথে তখন ভারতের সাবেক টেস্ট ব্যাটসম্যান অরুনলাল আর অশোক মালহোত্রা খেলতেন। তাদের বিপক্ষে এমন নিয়ন্ত্রিত বোলিং, ওভার পিছু এক রান দিয়ে ৮ ওভারে ৪ উইকেট শিকারের ঘটনাই আমার খেলোয়াড়ী জীবনের সেরা বোলিং নৈপুণ্য। আমার সবচেয়ে স্মরণীয় সাফল্যও।

এবার আসা যাক কোচ সালাউদ্দীনের স্মরণীয় ম্যাচ প্রসঙ্গে। বিপিএলে কোচিং করাচ্ছেন প্রথম আসর থেকেই। সাথে সেই ২০০৩-২০০৪ থেকে প্রিমিয়ার ক্রিকেটেও নিয়মিত কোচিংও করাচ্ছেন। তবে এবার আর প্রিমিয়ার লিগের কথা নয়। কোচ সালাউদ্দীনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনাটি ফ্র্যাঞ্চাইজি আসর বিপিএলের। সেটা ২০১৫ সালের ঘটনা। বিপিএলের তৃতীয় আসর।

সালাউদ্দীন তখন কুমিল্লার কোচ। সেবার অনেক দেশি ও বিদেশি তারকার ভীড়ে কোচ সালাউদ্দীন চেয়েছিলেন অলক কাপালিকে খেলাতে। কিন্তু কুমিল্লার ফ্র্যাঞ্চাইজি তথা স্বত্ত্বাধিকারিরা ঠিক অলক কাপালিকে ১১ জনে রাখার পক্ষে ছিলেন না; কিন্তু সালাউদ্দীন বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন অলক কাপালি এই ছোট ফরম্যাটের ক্রিকেটে কার্যকর হতে পারে। অলকের ব্যাটিংটা মিডল অর্ডারকে করতে পারে সমৃদ্ধ। পাশাপাশি লেগস্পিন বোলিংটাও কাজে দিতে পারে।

তবে মালিক পক্ষ কিছুতেই তা মানতে চাচ্ছিলেন না। কিন্তু সালাউদ্দীনও ‘নাছোড়বান্দা’- জোর করে হলেও সালাউদ্দীন চেয়েছিলেন অলক যাতে খেলে।

এ সম্পর্কে সালাউদ্দীন বলে ওঠেন, ‘বিশ্বাস করবেন না পুরো বিপিএল জুড়েই অলককে নিয়ে আমার মালিক পক্ষের সঙ্গে কি যে লড়াইটাই না করতে হয়েছিল! মালিকরা কিছুতেই অলককে খেলাতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু আমি প্রায় জোর করেই অলককে খেলিয়েছি এবং আমার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো শেষ পর্যন্ত অলকই আমাদের চ্যাম্পিয়ন করেছে।

ফাইনালে বরিশাল বুলসের বিপক্ষে অলক কাপালির দুর্দান্ত ব্যাটিংয়েই আমরা খেলার শেষ বলে পাই ৩ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয়। আমি যে কি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম, বলে বোঝাতে পারবো না। এখনো মনে হলে অন্যরকম এক অনুভুতি জাগে মনে। আমার কোচিং ক্যারিয়ারের সেটাই সবচেয়ে স্মরণীয় অর্জন ও সেরা সাফল্য।’

Alok Kapali

আসুন জেনে নেই কেমন ছিল অলক কাপালির বরিশাল বুলসের বিপক্ষে ব্যাটিংটা! বরিশাল বুলসের বোলার ছিলেন পাকিস্তানি পেসার মোহাম্মদ সামি। ওই জমজমাট ফাইনালে কুমিল্লার ওপেনার লিটন দাস হাফ সেঞ্চুরি (৩৭ বলে বলে ৫৩) করলেও ২৮ বলে ৩৯ রানের হার না মানা ইনিংস উপহার দেয়া অলক কাপালি শেষ পর্যন্ত হন ফাইনাল সেরা।

ড্যারেন সামির করা ম্যাচের শেষ ওভারে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের জিততে দরকার ছিল ১৩ রানের। ওই ওভারে অলক প্রথম দুই বলে ছিলেন নন স্ট্রাইক এন্ডে। প্রথম বলে ডাবলস নিতে গিয়ে রান আউট হয়ে যান শুভাগত হোম। উইকেটে এসে প্রথম বলে ব্যাটে বলে করতে পারেননি লঙ্কান পেসার কুলাসেকেরা।

তবে নিজে স্ট্রাইক নিতে ঝুঁকি নিয়ে বল কিপারের গ্লাভসে পৌঁছানোর আগেই ব্যাটিং প্রান্তে চলে আসেন অলক। ৪ বলে ১১ রান দরকার থাকা অবস্থায় তৃতীয় ও চতুর্থ বলে বাউন্ডারি, পঞ্চম বলে ডাবলস আর শেষ বলে শর্ট লেগে ঘুরিয়ে সিঙ্গেলস নিয়ে দলকে অসামান্য জয় উপহার দেন অলক কাপালি।

এআরবি/আইএইচএস/

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]