বাদ পড়েও নাটকীয়ভাবে দলে ফেরার খবর যেভাবে পেয়েছিলেন বাশার

বিশেষ সংবাদদাতা
বিশেষ সংবাদদাতা বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০১:১২ পিএম, ২২ মে ২০২০

স্বচ্ছন্দে খেলা আর ধারাবাহিকভাবে রান করাকে মানদণ্ড ধরলে অনিবার্যভাবেই বাংলাদেশের সবসময়ের অন্যতম সফল ব্যাটসম্যান হাবিবুল বাশার সুমন। আমিনুল ইসলাম বুলবুল টেস্ট অভিষেকেই শতরান করে নিজের নামকে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখেছেন।

সর্বকণিষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্ট সেঞ্চুরি মোহাম্মদ আশরাফুলকেও এনে দিয়েছে অমরত্ব। কিন্তু হাবিবুল বাশার হলেন বাংলাদেশের প্রথম উইলোবাজ, যিনি প্রথম দিককার সময়ে টেস্টে বাংলাদেশের কান্ডারি। টেস্ট দল হিসেবে তখনও গুছিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। অনিশ্চিত ছিল যাত্রা।

প্রায় ম্যাচেই করুণ পরিণতি ছিল সঙ্গী। সেখানে হাবিবুল বাশারের চওড়া ব্যাটই হয়ে উঠেছিল একমাত্র আশার আলো। ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার মাঝে একমাত্র হাবিবুল বাশার সুমন একপ্রান্তে ঠিক নিয়মিত রান করতেন। তার ব্যাটই কথা বলত। নিয়মিত রান করা এবং অন্তত পঞ্চাশের ঘরে ধারাবাহিকভাবে পা রাখার কারণে তার নামই হয়ে গিয়েছিল ‘মিস্টার ফিফটি।’

সবচেয়ে বড় তথ্য হলো টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম হাফ সেঞ্চুরিয়ানও হাবিবুল বাশার সুমন। আমিনুল ইসলাম বুলবুল ২০০০ সালের নভেম্বরে ভারতের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টে অনবদ্য সেঞ্চুরি হাঁকালেও তার অগে, একই ম্যাচে প্রথম অর্ধশতক উপহার দিয়েছিলেন হাবিবুল বাশার সুমন।

কিন্তু জানেন কি, সেই প্রথম টেস্ট হাফ সেঞ্চুুরিয়ান ও পরে ‘মিস্টার ফিফটি’ তকমা গায়ে লাগানো হাবিবুল বাশার সুমন বাদ পড়ে গেছিলেন প্রথম টেস্ট দল থেকে। বিকেএসপিতে আবাসিক অনুশীলন ক্যাম্পের পর দল ঘোষণায় নাম ছিল না তার। তবে পরে আবার অন্তর্ভুক্ত হন বাশার।

বৃহস্পতিবার রাতে ক্রীড়া সাংবাদিক নোমান মোহাম্মদের ইউটিউব লাইভে সেই বাদ পড়া ও ডাক পাওয়ার গল্পটা শুনিয়েছেন সুমন। তার কথা, ‘আমি ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি দলে জায়গা পাইনি। ৯৯’র বিশ্বকাপে ৩০ জনের প্রাথমিক স্কোয়াডেও ছিলাম না। এমনকি অভিষেক টেস্টের অনুশীলন ক্যাম্প করেও মূল দলে প্রথমে সুযোগ পাইনি।’

সেটা কি অবিচারের শিকার? হাবিবুল বাশারের জবাব, ‘কিছুটা অবিচারের শিকার হয়েছি, বিস্ময়কর লেগেছে। ৯৯ বিশ্বকাপের পর পাকিস্তানে ‘এ’ টিমের অধিনায়ক করে পাকিস্তান পাঠানো হলো। আর ঐসময় জাতীয় লিগেও বেশ ভালই খেলছিলাম। পাকিস্তান সফরে মনে হয়েছে, আমি হয়তো ৯৭’র আইসিসি ট্রফি, ৯৯’র বিশ্বকাপ খেলতে পারিনি। তবে আমারও মনে হয় বড় মঞ্চে পারফরম করার সামর্থ আছে।’

‘মনে আছে, বিকেএসপিতে ট্রেনিং করছিলাম। তার আগে কেনিয়াতে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলে এসেছি। তখন আমি রেগুলার প্লেয়ার। ক্যাম্প চলছিল। আমি যে টেস্ট দলে চান্স পাব না, তা স্বপ্নেও ভাবিনি। এখনকার মত অবস্থা ছিল না। তখন আমরা পত্রিকা পড়ে দল জানতাম। আমি তখন দলে প্রায় নিয়মিতই খেলছিলাম। মনে হচ্ছিল টেস্ট ম্যাচটা আমি খেলছি। অন্তত বাদ পড়ব না।’

‘যথারীতি বিকেএসপিতে খবর আসলো প্রথম টেস্টের দলে আমি নেই। আমার তখন একদম ভেঙে পড়ার অবস্থা। এর আগেও দুটি বড় মিশনে বাদ পড়েছিলাম, তখনও অনেক খারাপ লেগেছে। কিন্তু টেস্টে জায়গা না পাওয়াটা ছিল অবিশ্বাস্য। আমি একেবারেই ভেঙে পড়েছিলাম।’

jagonews24

‘তখন আমার পারফরমেন্স কিন্তু ভালই ছিল। ঢাকা লিগ ও জাতীয় লিগে ভাল খেলছিলাম, রানও করছিলাম। তারপরও দলে চান্স না পেয়ে একদমই মুষড়ে পড়ি। সন্ধ্যার পর বিকেএসপির সুইমিংপুলের পাশে গিয়ে একা বসে কেঁদেছি। তখনকার বিকেএসপি এখনকার মত ছিল না। সন্ধ্যার পরে বিকেএসপি ছিল রীতিমত ভুতুড়ে পরিবেশ। সেখানে একা যেতাম না। সেদিন একাই গিয়েছিলাম মনের দুঃখে। সারারাত ঘুমাইনি।’

‘পরদিন সকালে আমার স্ত্রী এসে নিয়ে যায়। কারও সঙ্গে কথাও বলিনি। আমার পরিবার তখন কুষ্টিায়ায়। আমি আর আমার স্ত্রী ঢাকায়। আমরা ঢাকার বাসায় চলে গেলাম। সে এটা-সেটা বলে আমার দুঃখ ভোলানোর চেষ্টা করছিল। আমার ল্যান্ড ফোন ছিল না। লেখালেখি হলো বিস্তর।

‘দুদিন পর আবার দলে পরিবর্তন আনা হলো। আমাকে আর এনামুল হক মণি ভাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হলো। ১৬ জনের দল করা হলো। কিন্তু আমি তো সে খবর জানিনা। মন খারাপ করে বাসায় বসে আছি। তখন আমার এক ক্রিকেটার বন্ধু মীর জিয়াউদ্দীন শোভন খবর দিল যে আমাকে আবার দলে নেয়া হয়েছে। যেহেতু ল্যান্ড ফোন ছিল না, তাই আমার দলভুক্তির খবরটা পেতেও সমস্যা হলো। কোন যোগাযোগ নেই কারও সঙ্গে একদিনের মত।’

‘সম্ভবত বুলবুল ভাই শোভন ভাইকে বলেছিলেন যে, সুমনকে খবর দাও, সে দলে সুযোগ পেয়েছে। পরে শোভন ভাই তার ড্রাইভার পাঠিয়ে দেন আমার বাসায়। সেই ড্রাইভার সুখবরটা দেন। আমাকে ডাকা হয়েছে। সত্যি বলতে, আমি একদম বিশ্বাস করিনি। আমি ভাবছিলাম, প্র্যাকটিক্যাল জোক করছে কি না? আমি তখনও বিশ্বাস করিনি। একরকম অবিশ্বাসী মন নিয়েই বিকেএসপি গেলাম আবার। পরে গিয়ে জানলাম আমি দলে আছি। বৌকে বলছিলাম যা কি যাব না। গিয়ে জানলাম আমি আমি সত্যিই দলে আছি। অধিনায়ক দুর্জয় খুব খুশি হয়েছিল। সে আমাকে খুব করে চেয়েছিল।’

এআরবি/এসএএস/এমকেএইচ