পাকিস্তানকে হারানোর আগের রাতের যে ঘটনা অনেকেরই অজানা

বিশেষ সংবাদদাতা
বিশেষ সংবাদদাতা বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৫:১১ পিএম, ৩১ মে ২০২০

পৃথিবীর ইতিহাস বলে সাফল্যে অনেক কিছুই ঢাকা পড়ে যায়। যেমন ঢাকা পড়ে গেছে গর্ডন গ্রিনিজের বিদায়ের ঘটনা। সবার জানা, ১৯৯৯ সালের ৩১ মে ইংল্যান্ডের নর্দাম্পটনে বিশ্ব ক্রিকেটের প্রতিষ্ঠিত শক্তি পাকিস্তানকে ৬২ রানে হারিয়ে রীতিমত হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিল আমিনুল ইসলাম বুলবুলের দল।

শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ, আকরাম খান, খালেদ মাহমুদ সুজনদের নৈপুণ্যের দ্যুতির কাছে ম্লান হয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানিরা। কিন্তু জানেন কি, ওমন এক সোনালি সাফল্যে মোড়ানো ম্যাচে বাংলাদেশ যে কোচ ছাড়া মাঠে নেমেছিল? সে খবর কতজনের জানা?

১৯৯৯ সালের ঠিক আজকের দিনে নর্দাম্পটনে বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানকে হারিয়ে দিল, তখন টাইগারদের ড্রেসিংরুমে ছিলেন না কোচ গর্ডন গ্রিনিজ। কি করে থাকবেন? তিনি তো তার আগের রাতেই পদচ্যুত হয়েছেন। ৩০ মে’ই তাকে জানিয়ে দেয়া হয়- মিস্টার গর্ডন, আপনি আর বাংলাদেশের কোচ নন। আপনাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

কারণ যাই থাকুক, পরিবেশ-পরিস্থিতি ও সময়টা কিন্তু মোটেই কোচকে বরখাস্তর উপযোগি ছিল না। গর্ডন তার খেলেয়াড়ি জীবনে ওয়াকার আর ওয়াসিম আকরামকে খেলেছেন। তার পরামর্শ হতে পারতো অব্যর্থ দাওয়াই। কিন্তু পাকিস্তানের সাথে ম্যাচের আগের রাতে সেই গর্ডনকে কোচ পদ থেকে অব্যহতি দেয়া হয়।

ভাবুন একবার, নর্দাম্পটনে বাংলাদেশ যদি ওই ম্যাচটা না জিততো, তাহলে কি হতো? তখনকার বোর্ডের গোষ্ঠী উদ্ধার করে ছাড়তেন ভক্ত ও সমর্থকরা। সমালোচকরা মুচকি হেসে বলতেন-উচিত শিক্ষা হয়েছে, যেমন কর্ম তেমন ফল।

২১ বছর আগে আজকের দিনে বাংলাদেশ দলে এক অন্যরকম সংকট। কোচ গর্ডন গ্রিনিজের আচরণ ও কথাবার্তাকে কেন্দ্র করে ঐ সময়ে বোর্ড কর্তারা ক্যারিবীয় এই কোচের ওপর যারপরণাই অসন্তুষ্ট ছিলেন।

বলে রাখা ভালো, ঐ বিশ্বকাপের আগেই বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার আবেদন করেছিল এবং আইসিসির কাছে তা বিশেষ বিবেচনায়ও ছিল। আর ঐ সময় কোচ গর্ডন গ্রিনিজ বিদেশি মিডিয়ার কাছে বলে বসেন, ‘বাংলাদেশ এখনো টেস্ট খেলার জন্য তৈরি নয়। টেস্ট খেলতে এবং টেস্টের জন্য প্রস্তুত হতে আরও সময় দরকার।’

গর্ডন দলের হেড কোচ, যিনি নিজেই কিংবদন্তি। তিনিই যখন এমন মন্তব্য করেন, তখন সেটা বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাবার বিপক্ষে এক বড়সড় দলিল হিসেবেই কাজ করবে। ফলে বোর্ড কর্তারা কোচের ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিলেন।

খেলার আগের দিনই বোর্ড কর্তারা সাংবাদিকদের জানিয়ে দিয়েছিলেন- কালই শেষ হয়ে যাচ্ছে কোচ গর্ডন গ্রিনিজ উপাখ্যান। জাগো নিউজের সাথে আলাপে সে স্মৃতির ঝাঁপি খুললেন খালেদ মাহমুদ সুজন। ৩৪ বলে ২৭ রানের ছোট্ট অথচ কার্যকর ইনিংস খেলার পর ৩১ রানে ৩ উইকেট দখল করে পাকিস্তান বধের নায়ক ছিলেন তিনিই।

সুজন বলেন, ‘আমার মনে হয় ১৯৯৯ সালে ৩১ মে পাকিস্তানকে হারানোর কৃতিত্ব ও সাফল্যের গল্পে আগের রাতের কথাও বলা উচিত। কারণ আমি মনে করি সে সময় কোচ গর্ডন গ্রিনিজের সাথে যেটা হয়েছিল, সেটা ছিল মহা অন্যায়।

বাংলাদেশ দলের সাবেক এই অলরাউন্ডার যোগ করেন, ‘হ্যাঁ মানছি, গর্ডন বলে ফেলেছিলেন বাংলাদেশ তখন টেস্ট খেলার জন্য তৈরি ছিল না। সেটা তার মত। তৈরি ছিল কি ছিল না, সেটা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হতেই পারে। তবে আমার মনে হয় বিশ্বকাপ শেষে গর্ডনকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় দেয়া যেত। সেটা অনেক বেশি শোভন হতো। এবং তাতে কোনরকম তিক্ততাও সৃষ্টি হতো না। অতি বড় সমালোচকও কিছু বলতে পারতো না।’

নর্দাম্পটনে টিম বাংলাদেশ যে হোটেলে ছিল, সেখানে কোচ গর্ডন গ্রিনিজের রুম ছিল ঠিক খালেদ মাহমুদ সুজনের পাশেই। ৩০ মে রাতে সুজনকে নিজ রুমে ডেকে নিয়ে যান গর্ডন। নিয়ে একটি চিঠি হাতে দিয়ে বলেন-এটা পড়ে দেখো।

সুজন চিঠি পড়ে তো হতবাক! এ যে গর্ডন গ্রিনিজকে অব্যাহতি পত্র। এবং তাকে পর দিন পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে মাঠে যেতেও নিষেধ করে দেয়া হয়েছে! সুজন জানান, ‘গর্ডন আমাকে বলে দেন, সুজন তুমি দেখো আমি ঠিক টিম বাসে করে কাল মাঠে যাব। দেখি কে আমাকে না করে।’

‘সত্যিই টিম বাসে সবার আগেই উঠে বসেছিলেন গর্ডন। মাঠে আমাদের ওয়ার্মআপের সময়ও ছিলেন। এরপর আমরা যখন গলা ধরে গেম প্ল্যান নিয়ে আলোচনা করছিলাম, তখন গর্ডন সবাইকে জানিয়ে দেন, এটাই এবারের বিশ্বকাপে তোমাদের শেষ ম্যাচ। আর আমারও তোমাদের সাথে শেষ ম্যাচ। এরপর পথ আলাদা হয়ে যাবে। তোমরা নিজেদের সেরা ক্রিকেট খেলো। সবাই একশত ভাগ দিয়ে খেলবা। জয়-পরাজয় পরের কথা। মাঠে সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দিও। তারপর খেলা শুরুর পর কখন যে গর্ডন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, কেউ তা টের পায়নি।’

ম্যাচ শেষে প্রিয় কোচকে ফোনও দিয়েছিলেন সুজন। কিন্তু তার ফেরার উপায় ছিল না। সুজন সেই সময়টা নিয়ে বলেন, ‘খেলা শেষে আমি তাকে ফোন দিয়েছিলাম। আমি তাকে ফোন দিয়ে বলেছিলাম, গর্ডন আপনি কোথায়? আমরা জিতে গেছি। আপনি আসুন। গর্ডন জবাবে বললেন- হ্যাঁ, জানি তোমরা জিতেছো, আমি খুব খুশি। অনেক ভারো লাগছে। তবে এখন আর তোমাদের মাঝে ফিরে যেতে পারবো না। কারণ, আমি এখন অনেকটা পথ দূরে চলে গেছি। সেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব না।’

এআরবি/এমএমআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]