ওপারে ভাল থাকবেন ফারুক ভাই : রকিবুল

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৫:৩০ পিএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

রকিবুল হাসান নির্বাক। কথা বলতে গিয়েও গলা কেঁপে কেঁপে উঠেছে বারবার। বাকপটু, স্মার্ট জাতীয় দলের সাবেক এই অধিনায়কের মুখে সব সময়ই কথার খই ফোটে; কিন্তু অতি প্রিয় ফারুক ভাইয়ের (এ এস এম ফারুক) প্রয়ানে সেই তুখোড় বক্তা, বাগ্মি রকিবুল হাসানও কেমন যেন আড়ষ্ট।

কি বলবেন? ফারুক ভাইয়ের স্মৃতি কিভাবে চারণ করবেন? প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগতাড়িৎ দেশের ক্রিকেটের অন্যতম সেনাপতি সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসান।

আজ দুপুরে জাগো নিউজের সাথে একান্ত আলাপে সদ্য প্রয়াত জাতীয় ক্রিকেটার এএসএম ফারুকের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দিয়েছিলেন রকিবুল, ‘আমার কাছে তার অনেক পরিচয়। প্রথম পরিচয় একজন নিপাট ভদ্রলোক। ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ ছিল প্রবল। মানবতাবোধও ছির দারুণ জাগ্রত।’

‘পাশাপাশি নামী ও ভাল ক্রিকেটার। সাজানো গোছানো মানুষ। অন্তঃপ্রাণ মোহামেডান। খেলোয়াড়ী জীবন থেকেই মোহামেডান ছিল তার প্রথম ও শেষ ভালবাসা। খেলোয়াড়ের পাশাপাশি আম্পায়ারিং করেছেন। ভাল আম্পায়ার ছিলেন। ছিলেন সংগঠক। দক্ষ অধিনায়ক হিসেবে পরিগণিত হতেন। আবার ক্রিকেটার থাকা অবস্থায় তিনি ঢাকা মোহামেডানের মত দেশ সেরা ফুটবল ক্লাবের ম্যানেজারও হয়েছিলেন। সেটা সম্ভব হয়েছিল তার অস্বাভাবিক মোহামেডান প্রীতি আর সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে।’

‘ক্রিকেটার ফারুক ভাইকে আমি চিনি সেই ৬০ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। তখন তিনি শান্তিনগরে খেলতেন। আমি খেলতাম আজাদ বয়েজে। আর পূর্ব পাকিস্তানের হয়ে পাকিস্তানের ফার্স্ট ক্লাব ক্রিকেটের সেরা আসর কায়েদ-ই আজম ট্রফিও খেলেছেন। মূলতঃ ছিলেন অলরাউন্ডার। পেস বোলার কাম মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান।’

‘ভাল ক্রিকেটার ছিলেন অবশ্যই। মেধা, প্রজ্ঞা আর মননের মিশেলে একজন দক্ষ অলরাউন্ডারের প্রতিমূর্তি ছিলেন বলেই না সেই ৬০ দশকের মাঝামাঝি থেকে ৭০ দশকের একদম শেষ ভাগ অবধি একজন ভাল ও মানসম্পন্ন অলরাউন্ডার হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন। পূর্ব পাকিস্তানের হয়ে পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে নিয়মিত খেলেছেন। প্রয়াত শামিম ভাইয়ের (শামিম কবির) নেতেৃত্বে ১৯৭৬ সালে সফরকারী এমসিসির বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় দলের সদস্যও ছিলেন তিনি।’

‘ঢাকা মোহামেডানের অধিনায়ক ছিলেন। আমি যখন ১৯৭৬ সালে প্রথম মোহামেডানে যোগ দেই তখন ফারুক ভাই’ই মোহামেডানের ক্যাপ্টেন। ক্রিকেটারই ফারুক ভাইয়ের একমাত্র পরিচয় নয়। তিনি কিন্তু খেলোয়াড়ী জীবনেও ছিলেন দক্ষ আম্পায়ার। কায়েদ-ই আজম ট্রফিতেও খেলা পরিচালনা করেছেন।’

‘পাশাপাশি ফারুক ভাইয়ের আরও দুটি বড় পরিচয় ছিল। খেলোয়াড়ী জীবন, তথা মধ্য ষাট থেকেই তিনি ছিলেন মোহামেডান অন্তঃপ্রাণ। ক্লাবকে ভালবেসে সাদা কালো টেন্টকেই ঢাকায় নিজের বাসা বানিয়ে ফেলেছিলেন। বিয়ের আগে থাকতেন মোহামেডান ক্লাবেই।’

‘ফুটবলারদের সাথেও তার ছিল প্রগাড় ভালবাসা। তার আন্তরিকতা এবং মোহামেডানপ্রিয়তা দেখে ক্লাবের তখনকার সভাপতি মঈনুল ইসলাম সাহেব তাকে ফুটবল দলের ম্যানেজারের পদেও বসিয়েছিলেন। ক্রিকেটার ফারুক ভাই ছিলেন ফুটবলেরও সফল ম্যানেজার। সবচেয়ে বড় কথা, ঢাকাই ফুটবলে তখন পশ্চিম পাকিস্তানের ‘মাকরানি’ ফুটবলারদের ছিল প্রচন্ড দাপট ও জয় জয়কার।’

‘ফারুক ভাইয়ের আন্তরিকতা ও বড় মন দেখে অনেক নামী ও দামি মাকরানি খেলোয়াড় আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং তোরাব আলী, মুসা, আবিদ আলী ও কালো গফুরসহ অনেক মেধাবি ও বড় মাকরানি ফুটবলার ফারুক ভাইয়ের মাধ্যমেই ভিক্টোরিয়া, ওয়ান্ডরার্স আর ইপিআইডিসি থেকে মোহামেডানের সাথে চুক্তিভুক্ত হয়েছিলেন। শ্রুতি আছে দক্ষিণ এশীয় ফুটবলের পেলে খ্যাত ‘কালো গফুরও’ মোহামেডানের এসেছিলেন ফারুক ভাইয়ের হাত ধরে।’

‘মানুষ ফারুক ভাই সব সময়ই আমার পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন খুব সাজানো গোছানো মানুষ। হি ইয়ুজ টু মেইনটেইন স্ট্যান্ডার্ড অফ লাইফ। তার চেলাফেরা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন মোহামেডানের ৬০ দশকের শীর্ষ কর্তা মইনুল ইসলাম সাহেব।’

‘ক্রিকেটার ফারুক ভাইও আমার দারুণ পছন্দের। আমি মোহামেডানে খেলেছি তার অধিনায়কত্বেই। এছাড়া এমসিসি যখন প্রথম বাংলাদেশে খেলতে এসেছিল, তখন উত্তরাঞ্চলের সাথে একটি দুই দিনের ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়েছিল সফর। বলার অপেক্ষা রাখে না, কোন ভিনদেশী ক্রিকেট দলের সেটাই ছিল বাংলাদেশে প্রথম সফর। আর ওই ম্যাচটি দিয়েই শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ দলের কোন বিদেশী দলের সাথে খেলা। আমি ছিলাম সেই উত্তরাঞ্চলের অধিনায়ক। ফারুক ভাইও ছিলেন ওই দলে। আমরা একসঙ্গে খেলেছি।’

‘এখনো মনে আছে, আমি ওই ম্যাচে ৭০ প্লাস রানের একটি ইনিংস খেলেছিলাম। আর ফারুক ভাইয়ের ব্যাট থেকেও ৪০ প্লাস রানের একটি ভাল ইনিংস বেরিয়ে এসেছিল। ওই ম্যাচের স্মৃতি এখনো জাগরুক আছে। এক পর্যায়ে আমাদের জেতার মত অবস্থার উদ্রেকও ঘটেছিল।’

‘এ ছাড়া ফারুক ভাইয়ের আরও একটি ঘটনা আমার মনে দারুন দাগ কেটে আছে। তাহলো, সম্ভবত সেটা ১৯৮৮-১৯৮৯ মৌসুমের কথা। এশীয় যুব ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলের কোচ ছিলাম আমি। আর ফারুক ভাই ছিলেন ম্যানেজার। আমরা বিমানে করে ম্যাচ খেলে রাজধানীতে ফিরছিলাম। সম্ভবত সিলেট থেকে। সেদিন ছিল আমার জন্মদিন। ফারুক ভাই বিমান বালাদের সাথে কথা-বার্তা বলে আমার জন্মদিন স্মরণীয় করে রাখতে কেকের অর্ডার দিয়ে ফেললেন। তারপর বিমানের মধ্যে আকাশে হৈ-হুল্লোড় করে আমার জন্মদিন পালন করা হলো। কেক কাটা ও খাওয়া-দাওয়া হলো।’

‘আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছিলাম, ফারুক ভাই এক ঘণ্টার কম সময়ের বিমান ভ্রমণে কিভাবে এমন সাজানো-গোছানো অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও আয়োজন করেছিলেন। আসলে তিনি ছিলেন একদম সাজানো গোছানো মানুষ। এইতো গত মাসেও ফোন করে আমার খোঁজ নিয়েছেন। করোনার মধ্যে কেমন আছি? কোন সমস্যা আছে কিনা- এসব।’

‘ফারুক ভাই সত্যি একজন ভাল মনের মানুষ। আমার বড় ভাই। অগ্রজপ্রতিম। ক্লাব ক্রিকেটে মোহামেডানে আমার ফার্স্ট ক্যাপ্টেন। জাতীয় ও আঞ্চলিক দলেও একসঙ্গে খেলেছি। কখনো তিনি আবার কোন সময় আমিও অধিনায়ক ছিলাম। ফারুক ভাইয়ের বিনয়ী আচরণ ও মাঠ পরিচালনা এবং ম্যান ম্যানেজমেন্ট সত্যি খুব ভাল লাগতো। খুব দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে বাধ্য হচ্ছি, আমার সেই চিরচেনা প্রিয় মানুষ, সহযোদ্ধা, ক্যাপ্টেন ফারুক ভাই আর নেই। চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে। খুব মিস করবো তাকে। ওপারে ভাল থাকবেন ফারুক ভাই।’

এআরবি/আইএইচএস/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]