কেমন ক্রিকেটার ছিলেন এএসএম ফারুক?

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৬:৩২ পিএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

বুধবার মধ্যরাতে হঠাৎই ঢাকার ক্লাবপাড়া ও খেলাধুলার অঙ্গনে দুঃসংবাদ ‘এএসএম ফারুক আর নেই।’ বর্তমান প্রজন্মের ক্রিকেট অনুরাগীদের একটা বড় অংশের কাছে তিনি প্রায় অচেনা। কিংবা অল্প পরিচিত।

এখন যাদের বয়স ৫০ পেরিয়ে ৬০ ছুঁই ছুঁই, কিংবা তার বেশি- তাদের মধ্যে যারা খেলাধুলা ভালবাসেন, ক্রীড়াঙ্গনের খোঁজখবর রাখেন, তাদের কাছে এএসএম ফারুক কিন্তু মোটেই অপরিচিত নন। বরং খুবই চেনা জানা। রীতিমত কাছের। খুব স্বাভাবিকভাবেই তাদের মনটা বুধবার রাতে অনলাইন নিউজ পোর্টালের ওই শোক সংবাদ আর টিভি চ্যানেলের বিয়োগান্ত খবরে দুঃখ, যন্ত্রণা ও কষ্টে হৃদয় ভরে গেছে।

প্রজন্ম প্রজন্মকে ধারণ করবে। মনে রাখবে। সেটাই স্বাভাবিক। ৬০, ৭০ ও ৮০’র দশকের ক্রীড়াবীদ, ফুটবলার, ক্রিকেটাররা স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে আছেন পঞ্চাশ পার করে ৬০ ছুঁই ছুঁই কিংবা পার হওয়াদের মাঝে। তেমনি একজন বরেণ্য ক্রীড়াবীদ, তুখোড় ক্রিকেটার, দক্ষ অধিনায়ক, দুর্দান্ত সংগঠক, সফল ফুটবল ম্যানেজার আর ক্রিকেট আম্পায়ার- এএসএম ফারুক।

যার খেলোয়াড়ী জীবন শুরু হয়েছিল পাকিস্তান আমলে; ৬০ এর দশকের শুরুর দিকে; কিন্তু ক্রিকেটার এএসএম ফারুক স্বাধীন বাংলাদেশেও ছিলেন পরিচিত। যাকে সবাই এক নামে চিনতেন। একজন প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটার। নাম-ডাক ছিল বেশ। একজন চৌকশ ক্রিকেটারের প্রতিমূর্তি এএসএম ফররুক। মোটা দাগে সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার। কিন্তু সেটাই সব নয়।

যিনি ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলের হয়ে খেলেছেন। কোন বিদেশী দলের বিপক্ষে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম প্রতিনিধিত্ব করা হাতে গোনা কয়েকজন সৌভাগ্যবান ক্রিকেটারদের অন্যতম ছিলেন এএসএম ফারুক।

কেমন ছিল তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার? তিনি কোন ক্যাটাগরির ক্রিকেটার ছিলেন? জাগো নিউজের সাথে একান্ত আলাপে দেশ বরেণ্য ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব, সাবেক ক্রিকেটার, প্রশিক্ষক, ক্রিকেট বিশ্লেষক জালাল আহমেদ চৌধুরী তা জানিয়েছেন।

গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরলোকে পাড়ি জমানো এএসএম ফারুককে প্রায় ৫ যুগ ধরে চেনেন জালাল আহমেদ চৌধুরী। জানালেন, ১৯৬০-এর একদম প্রথম থেকেই তাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে তার।

তখন ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে জালাল আহমেদ চৌধুরীর দল ছিল উদিতি। আর ফারুক খেলতেন শান্তিনগরের হয়ে। জালাল জানালেন, ‘হয়ত ৬২-৬৩’ নাগাদ ঢাকাই ক্লাব ক্রিকেটে অভিষেক ফারুক ভাইয়ের (এ এস এম ফারুকের)। ঢাকাই ক্লাব ক্রিকেটে তার প্রথম দল শান্তিনগর। সেখান থেকে মোহামেডানে। আবার শান্তিনগর মাঝে ‘ভাল দলের’ তকমা গায়ে মাখলে আবার শান্তিনগরেও এসেছিলেন। পরে মোহামেডানই হয়ে ওঠে তার বাড়ি-ঘর।

কেমন ক্রিকেটার ছিলেন ফারুক? অধিনায়ক হিসেবেই বা কি বৈশিষ্ট্য ছিল তার? এ প্রশ্ন করার আগে জালাল আহমেদ চৌধুরী নিজে থেকেই বলে বসেন, ‘ফারুক ভাইয়ের মধ্যে কেমন এক সন্মোহনী ক্ষমতা ছিল! তার সঙ্গে সবার ছিল দারুণ সখ্য। শত্রুতা ছিল না কারোরই। সবচেয়ে বড় কথা, সবার মাঝে একটা অন্যরকম মান্য-গণ্যি ভাব ছিল তার। ভদ্র, বিনয়ী এ মানুষটিকে সবাই খুব সমীহই করতেন।’

jagonews24

কেমন ছিলেন ক্রিকেটার, অলরাউন্ডার এএসএম ফারুক? এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে দেশ বরেণ্য ক্রিকেট বোদ্ধা ও বিশ্লেষক জালাল আহমেদ চৌধুরীর ব্যাখ্যা, ‘দোর্দণ্ড প্রতাপের ব্যাটসম্যান তিনি ছিলেন না। আবার মিডিয়াম পেসার হিসেবেও যে তার বলে আগুন ঝরতো- তাও নয়। তবে গড়পড়তা অন্য আট দশটা ক্রিকেটারের চেয়ে ব্যাট ও বলে দক্ষতা বেশি ছিল। আর অলরাউন্ডার হিসেবে ভাল ছিলেন বলেই না পূর্ব পাকিস্তান দলের হয়ে পাকিস্তানের সেরা আসর কায়েদ-ই আজম ট্রফি খেলেছেন।’

‘এখনকার প্রেক্ষাপটে বোঝানো ও বোঝা কঠিন। তবে এটা বলি, ৬০ -এর দশকের মাঝামাঝি একজন বাংলাদেশি হয়েও পূর্ব পাকিস্তানের মূল দলে জায়গা পাওয়া সহজ ছিল না। কারণ অনেক অবাংলাদেশিও তখন পূর্ব পাকিস্তানের কোটায় পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলতেন। টেস্ট দলেও জায়গা পেয়েছেন পূর্ব পাকিন্তানের হয়ে খেলেই। সেই সময়ে ফারুক ভাই পূর্ব পাকিস্তান একাদশের নিয়মিত সদস্য ছিলেন কয়েক বছর। অবশ্যই কোয়ালিটি ও স্কিল ছিল।’

জালাল আহমেদ চৌধুরী একটি তাৎপর্য্যপূর্ণ কথা বলেছেন। তার মত, ৬০ দশকের শুরুর দিকে ক্যারিয়ার শুরু করা এএসএম ফারুক আসলে নিজের সেরাটা খেলে ফেলেছিলেন ৬০ দশকেই। ৭০ দশকের একদম প্রথম দিকেও ব্যাট ও বলে তেজ ছিল। তখন তার ব্যাট থেকে দল জেতানো শতক বেরিয়ে এসেছে। আবার ম্যাচ উইনিং স্পেলও উপহার দিয়েছেন কিছু।

তবে ৭০ দশকের শেষ ভাগে যখন তিনি ঢাকা মোহামেডানের অধিনায়ক হন, তখন তার ক্যারিয়ারের ‘ভাটি’ চলছিল। জালাল চৌধুরীর ভাষায় ‘পরতি ফর্ম’।

ক্রিকেটার এএসএম ফারুকের প্রোফাইল উপস্থাপন করতে গিয়ে জালাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘তার পেস বোলিং অ্যাকশনটা ছিল এক অন্যরকম ছান্দিক। খুবই মসৃণ বোলিং অ্যাকশন। রান আপ থেকে ডেলিভারি এবং ফলো থ্রু- সবটুকুতেই কেমন যেন একটা নৈস্বর্গিক ব্যাপার-স্যাপার ছিল। তুখোড় ফিল্ডার ছিলেন তিনি। রানিং বিটুইন দ্য উইকেটেও ছিলেন যারপরনাই ক্ষিপ্র।’

জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসান আর প্রসিদ্ধ ক্রিকেট লেখকও বিশ্লেষক জালাল আহমেদ চৌধুরীর কেউ সরাসরি বলেননি। তবে তাদের দু’জনার, বিশেষ করে জালাল আহমেদ চৌধুরীর বর্ণনা শুনে মনে হয়েছে, পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক আসিফ ইকবালের আদল ছিল এএসএম ফারুকের মাঝে।

জালাল আহমেদের বর্ণনায়, ‘দেহগত কাঠামো আর মাঠের ক্রিকেটীয় ভঙ্গিতে পাকিস্তানের প্রখ্যাত ক্রিকেটার আসিফ ইকবালের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য ছিল অনেকটাই।’

বলার অপেক্ষা রাখে না, পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ও সব সময়ের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার আসিফ ইকবালও ছিলেন লম্বা। ছিপছিপে গড়নের। এএসএম ফারুক অত দীর্ঘদেহী না হলেও গড়ণটা ছিল একদমই সে রকম। মিডিয়াম পেসার কাম মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান ছিলেন। চৌকশ ফিল্ডার আর রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে চিতাসম ক্ষিপ্রতার জন্য বিশ্ব জোড়া নাম ছিল ইংলিশ কাউন্টি দল কেন্ট তথা ৭০ দশকের বড় সময় পাকিস্তান অধিনায়ক আসিফ ইকবালের।

জালাল আহমেদ চৌধুরীর ভাষায়, ‘এএসএম ফারুকের মাঝেও ওই গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যগুলো বিদ্যমান ছিল।’

এআরবি/আইএইচএস/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]