উত্তরসূরিদের সাহস জুগিয়ে ক্যারিবীয় কিংবদন্তির খোলা চিঠি

স্পোর্টস ডেস্ক
স্পোর্টস ডেস্ক স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:১৮ পিএম, ১৪ জানুয়ারি ২০২১

সতীর্থ খেলোয়াড় সেমুর নার্সের ইনজুরিতে ম্যাচ শুরুর ৪৫ মিনিট আগে প্রথমবারের মতো টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েড। ১৯৬৬ সালে ভারত সফরের সেই ম্যাচের সময় লয়েডের বয়স মাত্র ২২। বিরুদ্ধে কন্ডিশনে অভিষেক ম্যাচের দুই ইনিংসে ৮২ ও ৭৮ রানের ইনিংস খেলে দলকে জিততে সাহায্য করেন লয়েড।

পরে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন আরও ১৯ বছর। দীর্ঘ এ ক্যারিয়ারে নিজেকে নিয়ে গেছেন ক্রিকেট কিংবদন্তিদের স্থানে। টেস্টে সাড়ে ৭ হাজারের বেশি কিংবা ওয়ানডেতে ২ হাজারের কাছাকাছি রানই শুধু করেননি, অনভিজ্ঞ এক দলকে নিয়ে বানিয়েছিলেন সময়ের অন্যতম সেরা দল।

লয়েডের নেতৃত্বে ওয়ানডে বিশ্বকাপের প্রথম দুই আসরেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। টেস্ট ক্রিকেটে তখন টানা ২৯ ম্যাচে হারেনি ক্যারিবীয়রা। পেস বোলিং দিয়ে রীতিমতো ক্রিকেট বিশ্ব কাঁপিয়েছেন লয়েডের সতীর্থরা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হঠাৎ পাওয়া সুযোগটি কাজে লাগিয়ে নিজেকে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম মহীরুহে পরিণত করেছেন লয়েড।

এখন প্রায় একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলের এক ঝাঁক ক্রিকেটার। নিয়মিত ক্রিকেটারদের বড় একটা অংশ সরে দাঁড়ানোয় প্রায় অনভিজ্ঞ এক দল নিয়েই বাংলাদেশে এসেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল। সিরিজ শুরুর আগে তাই বাংলাদেশকেই এক কথায় ফেবারিট মানছেন সবাই।

তবে স্রোতে গা ভাসানোর পক্ষে নন লয়েড। তিনি বরং দাঁড়িয়েছেন নিজ দেশের খেলোয়াড়দের পাশে। তার মতে, এ সফরটি ক্যারিবীয়দের নতুন খেলোয়াড়দের জন্য বড় সুযোগ। বাংলাদেশ সফরে থাকা খেলোয়াড়দের অনুপ্রেরণা জুগিয়ে খোলা চিঠিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন লয়েড।

তার চিঠিটি নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রিয় ছেলেরা,

আমি বুঝতে পারছি, এমন একটা সফর তোমরা শুরু করতে যাচ্ছ, যার জন্য তোমরা হয়তো প্রস্তুত নও। সম্ভবত তোমাদের মনে হতে পারে, কোনোরকম প্রস্তুতি ছাড়াই হঠাৎ কঠিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার সবাই এটাও আশা করছে যে, তোমরা লড়াই করবে এবং ফল এনে দেবে।

তোমাদের বিষয়টা এমনভাবে নেওয়া উচিত যে, এটা ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে শূন্যস্থান পূরণের ব্যাপার নয়, বরং নিজেদের জায়গা পাকা করার সুযোগ। যোগ্যতার ভিত্তিতেই তোমরা সুযোগ পেয়েছ। এটাই নিয়তি, এটাই তোমাদের সুযোগ। বিশ্বকে নিজের প্রতিভা, দক্ষতা দেখানোর চমৎকার এক উপায়। সবাইকে দেখানোর সুযোগ যে, তোমরা দ্বিতীয় সারির ক্রিকেটার নও। তোমরাও শীর্ষ সারিতে উঠে আসতে পারো।

১৯৬৬ সালে আমি মূল টেস্ট দলে ছিলাম না। অপ্রত্যাশিতভাবে, সিমুর নার্স চোট পায় আর প্রথম টেস্ট শুরুর ৪৫ মিনিট আগে আমাকে জানানো হয় যে, আমি খেলছি। এরপর টানা ৩৫ টেস্ট খেলেছিলাম। কারণ, আমি ভালো করেছিলাম। আমরা সিরিজ জিতেছিলাম। আমি সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম যে নিজের প্রতিভা ও সামর্থ্য দেখানোর এটাই সুযোগ। আর সেটা আমি দুই হাতে কাজে লাগিয়েছিলাম। এর চেয়েও বড় কথা, আমাদের অঞ্চলের যে কারোর জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য খেলতে পারা সবচেয়ে বড় সম্মানের। আমি সেই সময়েও তা বিশ্বাস করতাম, এখনও করি।

তোমরা যে দলে ডাক পাওয়ার উপযুক্ত, এটা প্রমাণের সুযোগ তোমাদের সামনে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের জার্সি ও ক্যাপ পরতে পারার জন্য তোমাদের গর্বিত হওয়া উচিত। তোমরা অন্যতম সেরা ক্রিকেট জাতির প্রতিনিধিত্ব করছ, যাদের রয়েছে ঈর্ষণীয় রেকর্ড আর তা নিয়ে আমরা গর্বিত। মনে রেখো, আমরা কেবল ৫০ লাখের একটু বেশি জনসংখ্যার এক জাতি।

আমাদের রেকর্ডের একটি, টানা ২৯ ম্যাচ ধরে অপরাজিত, টানা ১১ জয়, টানা ১৭ বছর ধরে হারিনি একটি টেস্টও।

এগুলো অতীতের কীর্তি ও অর্জনের স্রেফ ক্ষুদ্র একটি অংশ। যা অর্জনের পেছনে কঠোর পরিশ্রম ও নিবেদন লুকিয়ে আছে। সবার আগে, আমি তোমাদের নিজেদের ফিটনেসের দিকে গভীর মনোযোগ দিতে বলব। ব্যাটসম্যান বা বোলার যাই হও, সবসময় নিজের টেকনিক ও স্কিল গড়ার চেষ্টা করবে। আমার দল ঠিক এটাই করেছিল এবং আমার বিশ্বাস, তোমরাও তাই করবে।

তোমাদের সামনে আমাদের টেস্ট র‌্যাংকিংয়ে উন্নতি এবং আমাদের ক্রিকেটে গর্ব করার মতো আরও কিছু যোগ করার সুযোগ। এই প্রত্যাশা কেবল আমার নয়, পুরো ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের। তোমাদের জয় ওদেরও জয় হবে।

তোমাদের কাছে বাংলাদেশ সফর ভীতিকর মনে হতে পারে। তবে তা অসাধ্য নয়। এটা আদর্শ একটি সুযোগ। বিচক্ষণ (টেস্ট) অধিনায়ক ক্রেইগ ব্রাথওয়েটের অধীনে তোমরা নিজেদের নিবেদন, পেশাদারিত্ব, তারুণ্য ও জয়ের বাসনা দিয়ে নতুন একটি যুগের সূচনা করতে পারো। তোমাদের যা বলছি তা কোনো অমূলক জল্পনা নয়। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। যখন আমি ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের দায়িত্ব নিই, এর আগে আমরা বিশের বেশি টেস্ট হেরেছিলাম। নতুন করে লক্ষ্য স্থির করা ও দল পুনর্গঠনের প্রয়োজন ছিল। আমার দলেও অনেক নতুন ক্রিকেটার ছিল, সংখ্যাটা হয়তো এখন তোমরা যেমন আছো তেমনই হবে। কিন্তু আমার দল চ্যালেঞ্জ নিতে পিছপা হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত আমরা চূড়ায় উঠেছিলাম। আমার বিশ্বাস, তোমরাও ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের প্রয়োজনীয় পুনর্গঠনের কাজ শুরু করতে পারবে। আমরা করতে পেরেছিলাম কারণ, নিজেদের ওপর আমাদের বিশ্বাস ছিল। তোমরাও পারবে। আত্মবিশ্বাসই সাফল্যের প্রথম ধাপ।

তোমাদের একটা কথা মনে করিয়ে দিই, সাফল্যের চূড়ায় উঠতে হলে সেই মানসিকতা থাকতে হবে। ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে অনেক কঠিন পরিস্থিতি পেরিয়ে যেতে পারবে। আমি নিশ্চিত, এই সফরে তোমরা তেমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে।

শেষে বলি, সাফল্য কাজের আগে আসে কেবল অভিধানে। তোমাদের জন্য আমার শুভকামনা। মনে রেখো, বেশিরভাগ মানুষকে বিচার করা হয় তারা যে বাধা পেরিয়ে এসেছে তার ভিত্তিতে।

এসএএস/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]