মায়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে খেলার আকুতি শাহাদাত রাজীবের

ইমাম হোসাইন সোহেল
ইমাম হোসাইন সোহেল ইমাম হোসাইন সোহেল
প্রকাশিত: ০৫:৪২ পিএম, ০১ মার্চ ২০২১

ক্যারিয়ারটা যেভাবে এগোনোর কথা ছিল, সেভাবে এগোয়নি শাহাদ হোসেন রাজীবের। একে তো অফ-ফর্ম, ইনজুরি এসব ছিলই, সঙ্গে আরেকটা বিষয় ছিল নিত্যসঙ্গী। বিতর্ক। অনেকগুলো বিতর্কে জড়িয়ে বার বার সংবাদের শিরোনাম হয়েছিলেন জাতীয় দলের সাবেক এই পেসার।

তার সর্বশেষ বিতর্ক ছিল সতীর্থের গায়ে হাত তোলা। গত জাতীয় লিগে সতীর্থের গায়ে হাত তোলার কারণে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হন রাজীব। যদিও বিসিবি দুই বছর কমিয়ে দিয়েছিল নিষেধাজ্ঞার শাস্তি। তবে তিন বছরের শাস্তির ১৬ মাস পার হতে না হতেই মানবিক বিবেচনায় বিসিবির কাছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আবেদন করেন তিনি।

মা’কে বাঁচাতে চান শাহাদাত হোসেন রাজীব। তার ক্যান্সার আক্রান্ত মায়ের এখন চলছে একেবারে সর্বশেষ অবস্থা। যে কোনো সময় চলে আসতে পারে ওপারের ডাক। বাঁচানোও হয়তো আর সম্ভব নয়। কিন্তু যতদিন বেঁচে আছেন, ততদিন যেন চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেন, সে জন্য রাজীব আবার ফিরতে চান ক্রিকেট মাঠে।

সে কারণেই বিসিবির কাছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চিঠি দিয়েছেন শাহাদাত রাজীব। বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজনের সাথে দেখা করে চিঠি দেন তিনি। জাগো নিউজকে রাজীব বলেন,‘বিসিবি সিইও’র কাছে চিঠি নিয়ে দেখা করেছি। পজিটিভ মনে হয়েছে। আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন। বলেছেন বিবেচনা করবেন। অনুশীলন চালিয়ে যেতে বললেন।’

নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকার পরও কয়েক দিন মিরপুরের একাডেমি মাঠে অনুশীলন করতে দেখা যায় শাহাদাত রাজীবকে। জিমনেশিয়ামেও দেখা গেছে তাকে। রাজীব কীভাবে মিরপুরের প্র্যাকটিস ভেন্যু ব্যবহার করছেন, সে খবর নিতে গিয়েই জানা গেল, তার ক্যান্সার আক্রান্ত মায়ের কথা।

জাগো নিউজকে রাজীব জানান, তার মায়ের বয়স খুব বেশি হয়নি, মাত্র ৫৫। তবে দীর্ঘদিন ধরে জরায়ুর ক্যান্সারে ভুগছেন তিনি। ক্যান্সারের চিকিৎসা চলছে ৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে।

jagonews24

রাজীব বলেন, ‘তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসা করাচ্ছি। অনেক টাকা খরচ করেছি। ৪০টি রেডিওথেরাপি দিয়েছি, কেমোথেরাপি দিয়েছি ২৫টি। যে কারণে একটু ভালো ছিল তখন। কিন্তু সমস্যা বাধিয়েছে করোনাভাইরাস। করোনার কারণে তো ৭-৮ মাস ঘর থেকেই মা’কে বের করতে পারিনি। চিকিৎসাও ঠিকমত হয়নি। যে কারণে ক্যান্সার দ্রুত ছড়িয়ে যায়। এখন অবস্থা খুবই খারাপ। প্যারালাইসড রোগির মতো পুরোপুরি বিছানায়। একেবারে লাস্ট স্টেজে রয়েছেন।’

রাজীব এখনও কেমোথেরাপি দিয়ে যাচ্ছেন তার মা’কে। জাগো নিউজকে তিনি বলেন,‘এখনও মাসে তিনটা কেমো দিতে হয়। ৫০ হাজারের বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। করোনার আগে ইউনাইটেড হাসপাতালে কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি দিয়েছি। প্রায় ৩৫ লাখ টাকার মত খরচ হয়েছে। করোনার পর ল্যাবএইডে কেমো দিই এখন। সেখানে খরচ একটু কম। তবুও যে অবস্থা, মাকে তো বাাঁচাতেই পারবো না হয়তো।’

মায়ের চিকিৎসার জন্য এখন অনেক টাকা প্রয়োজন রাজীবের। সে কারণেই তিনি মাঠে ফিরতে চান। খেলতে চান আবার। তিনি বলেন, ‘আমি তো একজন ক্রিকেটার। কারো কাছে হাত পাততে চাই না। খেলেই মায়ের চিকিৎসা করাতে চাই। আম্মুরও স্বপ্ন, আমি আবার খেলায় ফিরে আসি। আমাকে খেলায় ফিরতে দেখলে তারও ভালো লাগবে। মায়ের এই স্বপ্ন পূরণ করার জন্যই খেলায় ফিরতে চাই।’

মিরপুরে দুইদিন অনুশীলন করার পর কিউরেটর গামিনি সিলভা এসে তাকে নিষেধ করেছেন আর অনুশীলন না করার জন্য। যে কারণে এখন ঘরেই বসে আছেন। কোথাও অনুশীলন করতে পারছেন না আর রাজীব। অপেক্ষায় আছেন বিসিবি থেকে কোনো গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার জন্য।

জাগোনিউজকে তিনি বলেন, ‘আমার ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। এ কারণে যে মিরপুরে মাঠ, জিমনেশিয়াম, নেট- কিছুই ব্যবহার করতে পারবো না, তা জানা ছিল না। থাকলে হয়তো যেতাম না। কিন্তু দুইদিন অনুশীলন করার পর এভাবে নিষেধ করার কারণে খারাপ লাগছে। খুব কষ্ট পেয়েছি। কারণ, এই মিরপুরেই তো ক্রিকেট খেলে খেলে বড় হয়েছি। গত ১২টি বছর ধরে সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছি। আর ৫-৬ বছর খেলার ইচ্ছা আছে। এখন সেখানেই যদি প্রবেশ করতে দেয়া না হয়, অনুশীলন করতে দেয়া না হয়, তাহলে তো খারাপ লাগবেই। মিরপুরে অনুশীলন করতে পারবো না দেখে আমি খুব ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলাম, চোখে পর্যন্ত পানি চলে এসেছিল।’

jagonews24

মায়ের জন্য হলেও মাঠে ফিরতে চান এবং যত ধরনের নেতিবাচকতা তার নিজের মধ্যে ছিল, ভবিষ্যতে এর ছিঁটেফোটাও থাকবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাজীব। তিনি বলেন, ‘এর আগে যা কিছু করেছি, সবকিছুর জন্য আমি এখন অনুতপ্ত। অনেক ভুল করে ফেলেছি। খেলায় ফিরতে পারলে চেষ্টা করব যেন এসব ভুল আর না হয়। আশা করি, যত দিনই খেলি, কোনো সমস্যা হবে না। আমার মা ক্যানসারে আক্রান্ত। এখন খেলায় ফিরে মায়ের চিকিৎসা করাতে চাই।’

বাংলাদেশের হয়ে ৩৮টি টেস্ট, ৫১টি ওয়ানডে ও ৬টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন শাহাদাত। উইকেট নিয়েছেন যথাক্রমে ৭২, ৪৭ এবং ৪টি। তবে ২০১৫ সালের মে মাসের পর জাতীয় দলের হয়ে আর খেলার সুযোগ পাননি।

ওয়ানডেতে বাংলাদেশ দলের প্রথম হ্যাটট্রিকটি এই পেসারেরই। ২০০৬ সালের আগস্টে হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে শাহাদাত করেছিলেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেই হ্যাটট্রিক।

আইএইচএস/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]