‘আমরা যদি একবার খাদের কিনারায় পড়ে যাই, কে টেনে তুলবে?’

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৭:৪৪ পিএম, ০৯ এপ্রিল ২০২১ | আপডেট: ০৩:৫৯ পিএম, ১০ এপ্রিল ২০২১

তার নামের পাশে ৪০ টেস্ট। বাংলাদেশ জাতীয় দলের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন ১২ বছর। ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেছেন দুই যুগ।  জাভেদ ওমর বেলিম দেশের ক্রিকেটের দীর্ঘ পথযাত্রার সঙ্গী। দেশের ক্রিকেটের মাঠ ও মাঠের বাইরের অনেক কিছুই তার জানা।

আজ শুক্রবার জাগো নিউজের মুখোমুখি হয়ে নিজের দীর্ঘ খেলোয়াড়ি জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে অনেক কথাই বলেছেন জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার জাভেদ ওমর। বলেছেন টেস্ট দল হিসেবে পাওয়া না পাওয়া আর নানা আক্ষেপের গল্প।

জাগো নিউজ : বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন কোথায় দাঁড়িয়ে?

জাভেদ ওমর : আসলে আমরা খুব একটা ভালো জায়গায় কিন্তু দাঁড়িয়ে নেই। ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিং হিসেব কষলে আমরা ছয় থেকে সাত নম্বর দল। আর টেস্টে তলানিতে। টি-টোয়েন্টিতেও একদমই নিচের দিকে।

জাগো নিউজ : কেমন ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের গত দুই যুগের পথচলা?

জাভেদ ওমর : দেখেন, আমরা ২০০৬-২০০৭ থেকে ওয়ানডেতে ভালো খেলতে শুরু করেছিলাম। মানে বিশ্বকাপের আগে আগে। সেই দলে আমিও ছিলাম। যদিও ২০০৫ সালে  যুক্তরাজ্যের কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জিতেছিলাম, তবে তখনও আমরা ততটা কনফিডেন্ট ছিলাম না। মানে জিতবো, অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারি- সে বিশ্বাসটা ছিল না। আমরা ভালো খেলেছি, জিতে গেছি। কিন্তু কঠিন সত্য হলো, নিজেদের  শক্তি ও সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস-আস্থা কম ছিল। আমরা তখন বলেকয়ে জিততে পারতাম না। তবে ২০০৭ সালে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি যে, আমরা ভারতকে হারাব।

লক্ষ্য ছিল- আমরা সেকেন্ড রাউন্ডে যাব। সেই সময় থেকে আসলে বাংলাদেশ দলের মানসিক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। মোহাম্মদ রফিক, আমি ও হাবিবুল বাশার, মাশরাফি, আশরাফুলের সঙ্গে ট্যালেন্ট তামিম, সাকিব ও মুশফিক। সেখান থেকে আমরা সামনে আগাতে শুরু করলাম। পাঁচ-ছয়জন মোটামুটি পারফর্ম করায় ধীরে ধীরে দল হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে লাগলো বাংলাদেশ। সবাই মোটামুটি হিসেবের ভেতরে আনতে শুরু করলো।

এরপর মাশরাফির অধিনায়কত্ব, সাকিব-মাহমুদউল্লাহর কিছু অবিস্মরণীয় ইনিংস, আরও কিছুর সন্মিলনে আমরা কিছু মনে রাখার মতো জয় পেলাম। একটা ভালো দলে পরিণত হলাম। তারপরও এক, দুই বা তিন নম্বর দল না। বেটার দল। সব দল সমীহ করতে শুরু করলো। আমরা এখনো সেরা তিনে নেই। বড়জোর ৭ নম্বর। তারপরও বলব, আমরা এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, এর চেয়ে বেটার পজিশনে থাকা উচিত ছিল। কিন্তু আমরা সে জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি।

ওই সময় আমরা ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে ওয়ানডে সিরিজ জয় আর পাকিস্তানকে ‘হোয়াইটওয়াশ’ করে ফেললাম। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, তখন আমরা মেতে থাকলাম বাংলাদেশ দল নিয়ে। দেশের ক্রিকেট মানেই কিন্তু শুধু বাংলাদেশ জাতীয় দল নয়। আমার মনে হয় তখনই আমরা একটা লক্ষ্য পরিকল্পনা করে আগানোর চিন্তা ভাবনা করতে পারতাম।

যেহেতু তখন আমরা মাত্র পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মত দলের সাথে ওয়ানডে সিরিজ জিতেছি, কাজেই সেটাই ছিল টার্গেট সেট করার শ্রেষ্ঠ সময়। সবার একটা উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছিল। মনে হচ্ছিল, আমরাও বুঝি বড় দল হয়ে উঠতে যাচ্ছি। আর সেই উৎসাহ-উদ্দীপনা কাজে লাগিয়ে পরবর্তী ৫ বছরে আমরা কি করতে চাই, কোথায় যেতে চাই- সেটা নির্ধারণ করা যেত। কিন্তু তা হয়নি।

সেই লক্ষ্য ও পরিকল্পনা প্রণয়নের সর্বোত্তম সময়টা আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। তখনই আমাদের অবকাঠামো, ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নতি এবং জাতীয় পর্যায়ের দলগুলোর জন্য অত্যাধুনিক প্র্যাকটিস ও ট্রেনিং ফ্যাসিলিটিজের ব্যবস্থা করার উচিত ছিল। আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটের দিকে আরও মনোযোগী হয়ে তার মান উন্নয়ন, মাঠ-পিচের উন্নতি এবং সর্বোপরি ঘরোয়া ক্রিকেট আসরকে আরও আকর্ষণীয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তোলার ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। কিন্তু আমরা সে পথে হাঁটিনি। অনুকূল প্রেক্ষাপট, পরিবেশ আর সামনে এগোনোর সুযোগ কাজে লাগাতে সক্ষম হইনি। আর সে কারণেই কাঙ্খিত উন্নতি হয়নি। আমরা উন্নতি করেছি, তবে যেখানে যাওয়া উচিত ছিল সেখানে যেতে পারিনি।

একটা দেশের ক্রিকেট উন্নতি শুধু তার জাতীয় দলের পারফরমেন্স দিয়ে হয় না। জাতীয় দল ভালো খেলছে মানেই দেশের ক্রিকেট খুব উন্নত হয়েছে, সব ঠিক আছে, তাও ভাবার সুযোগ নেই। ওই যে বললাম, ২০১৫-২০১৬'তে আমরা বেশ ভালো খেলেছি। এমনকি ২০১৭ পর্যন্ত সেই ভালোর ধারাটা বজায় ছিল। কিন্তু দেশের ক্রিকেটের উন্নয়নের পূর্বশর্ত বলতে যা বোঝায়, তা কিন্তু পূর্ণ হয়নি। ঘরোয়া ক্রিকেটের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পেশাদার ব্যবস্থাপনা তৈরি হয়নি। উইকেটের চরিত্র পাল্টায়নি। অন্যান্য লিগগুলোর দিকে যতটা দৃষ্টি দেয়া দরকার ছিল, তাও হয়নি। কাজেই উন্নতির সেই মিটারটি আবার নিচের দিকে ধাবিত হয়েছে।

‘আমরা যদি একবার খাদের কিনারায় পড়ে যাই, কে টেনে তুলবে?’

জাগো নিউজ : টেস্টে আমাদের যেখানে পৌঁছানোর কথা ছিল, সেখানে কি যাওয়া সম্ভব হয়েছে? 

জভেদ ওমর : নাহ, পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। কারণ একটাই, টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর যে একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও পরিকল্পনা করে সামনে আগানো দরকার ছিল, তার কিছুই হয়নি। আমরা নিজেদের অবস্থান সম্পর্কেও সচেতনতার পরিচয় দিতে পারিনি। অথচ সুন্দর সাজানো-গোছানো পরিকল্পনায় এগোতে পারতাম।

আমরা ওয়ানডে ভালো খেলি, কারণ আমাদের দেশের জাতীয় ক্রিকেটারদের বড় অংশ এসেছে ক্লাব ক্রিকেটে ৫০ ওভারের ম্যাচ খেলে খেলে। খুব স্বাভাবিকভাবেই ৫০ ওভারের ম্যাচ খেলতে খেলতে তারা ওই ফরম্যাটের সাথে মিশে গেছে। একদিনের খেলায় ভালো করার সম্ভাব্য কৌশল, অভিজ্ঞতা, টেকনিক, ট্যাকটিস সবই তাদের জানা হয়ে গেছে। নান্নু, আকরাম, বুলবুল, সুমন, আমি, সুজন, পাইলট, রফিক, শান্তরা সবাই ওয়ানডেতে ভালো খেলে হাত পাকিয়েই জাতীয় দলে এসেছিলেন। ঘরোয়া ওয়ানডে আসরে তাদের সাথে ওয়াসিম আকরাম, অর্জুনা রানাতুঙ্গা আর সনাথ জয়সুরিয়ার মত বিশ্বমানের ক্রিকেটাররাও খেলেছেন। আমার মনে হয় টেস্টেও ওভাবে এগোনোর পরিকল্পনা করা উচিত ছিল। ঘরোয়া ক্রিকেটের অবকাঠামোটা দীর্ঘ পরিসরের খেলার ওপর ছেড়ে দিলে ওই সব ক্রিকেটাররা টেস্টেও আরও ভালো খেলতে পারতেন। তাদের পরবর্তী প্রজন্মও দীর্ঘ পরিসরের ফরম্যাটে দক্ষ হয়ে উঠতো।

কিন্তু তা আর হয়েছে কই? আমরা কি স্কুল ক্রিকেটে কখনো ন্যাচারাল টার্ফে ৮০ ওভারের ম্যাচের আয়োজন করি? আমরা কি অনূর্ধ্ব  ১২-১৩, ১৪-১৫ ‘র কিশোরদের কখনো দুইদিনের ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দিয়েছি? তাদের ব্যাসিক যাতে ভালো হয়, তারা যাতে ক্রিকেটের ব্যাকরণ মেনে ব্যাট করতে পারে, সে কাজটিও করিনি। তাহলে আমাদের পরের প্রজন্ম দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে পাকা হবে কী করে?

আমরা ২০১১ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক হয়েও একটি মাঠ তৈরি করতে পারিনি। পৃথিবীর সব দেশেই বিশ্বকাপ হওয়া মানেই নতুন মাঠ ও উইকেটের সংস্কার, আমরা তাও করতে পারিনি। আমরা ফতুল্লায় স্টেডিয়াম তৈরি করেছি, অস্ট্রেলিয়ার মত দলের সাথে টেস্ট খেলে তারপর সেটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি। কারণ, সে মাঠের ড্রেনেজ সিস্টেম খারাপ। সেটা কেন হবে?

জাগো নিউজ : যাই হোক। যা হয়নি, তা নিয়ে হাপিত্যেশ না করে সামনে এগোনোর সম্ভাব্য পথ কী?

জাভেদ ওমর : এখন তো শর্টকাট পথ নেই। তারপরও জন পঁচিশেক ক্রিকেটারকে নিয়ে আলাদাভাবে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের জন্য একটা সতর্কবার্তা আছে। আমরা কেউ খেয়াল করি না যে, ভিভিয়ান রিচার্ডস, গর্ডন গ্রিনিজের ওয়েস্ট ইন্ডিজকেও এখনকার দিনে বিশ্বকাপ কোয়ালিফাই পর্ব খেলতে হয়।

আমরা যে কাঙ্খিত উন্নতি করতে পারিনি, আমাদেরও কিন্তু ওই অবস্থায় পড়তে হতে পারে। আমরা যদি একবার খাদের কিনারায় পড়ে যাই, আমাদের কে টেনে তুলবে? তাই যা হয়নি, তা নিয়ে আর না ভেবে সামনের দিনগুলোয় ভেবেচিন্তে এগোতে হবে।

সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে ঘরোয়া ক্রিকেটকে। যে করেই হোক, একদম কিশোর বয়স থেকে নতুন প্রজন্ম যাতে ন্যাচারাল টার্ফে ২ দিনের ম্যাচ খেলে বড় হতে পারে, সেই ব্যবস্থা করে দিতে হবে। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটকে যতটা সম্ভব সমৃদ্ধ ও উন্নত করতে হবে। সম্ভাব্য যা যা প্রয়োজন, তার জোগানও নিশ্চিত করতে হবে। তবেই সামনে আগানো সম্ভব। না হয় যে তিমিরে পড়ে আছি, সেখানেই থাকতে হবে। বরং দিনকে দিন অবস্থা হতে পারে আরও খারাপ।

এআরবি/এমএমআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]