হারিয়ে যাওয়া তামিমের দেখা মিলবে কি এবার?

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০২:২৪ পিএম, ২০ এপ্রিল ২০২১

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলের শেষ জয়টি গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে সেই ম্যাচে মুমিনুল হকের দল জিতেছিল ইনিংস ও ১০৬ রানের বড় ব্যবধানে। জয়ের নায়ক দুজন- মুশফিকুর রহীম আর মুমিনুল হক।

মুশফিক ডাবল সেঞ্চুরি (২০৩) আর অধিনায়ক মুমিনুল হকের (১৩২) শতকের সঙ্গে নাজমুল হোসেন শান্ত (৭১), লিটন দাসের (৫২) জোড়া ফিফটি) এবং ওপেনার তামিম ইকবালের চল্লিশোর্ধ্ব (৪১) রানের ইনিংসে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৫৬০। পরে দুই স্পিনার নাইম হাসান (৯টি) ও তাইজুল ইসলাম (৬) বল হাতে জিম্বাবুয়ানদের ইনিংস পরাজয়ে বাধ্য করেন। বাংলাদেশ পায় ইনিংস ও ১০৬ রানের জয়।

ওপরের পরিসংখ্যান দেখে মনেই হতে পারে, তামিম ইকবালের ব্যাট কথা না বললেও বাংলাদেশ জেতে। তবে কঠিন সত্য হলো, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তামিম ইকবালই বড় অবলম্বন। বেশি দূর যেতে হবে না। কয়েকটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ঠ।

ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে, টেস্টে ঘরের মাঠ এবং দেশের বাইরে এখন পর্যন্ত বড় দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের সোনালি সাফল্যে মোড়ানো টেস্ট হাতে গোনা ৩-৪ টি। তার মধ্যে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট জয়ের অবিস্মরণীয় সাফল্য সবার ওপরে। এর বাইরে রয়েছে ২০১৭ সালের মার্চে শ্রীলঙ্কার মাটিতে নিজেদের শততম টেস্টে ৪ উইকেটের ঐতিহাসিক জয়।

সবার জানা, ২০১৬ সালের অক্টোবরে শেরে বাংলায় অফস্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজের (১২ উইকেট) স্পিন ঘূর্ণির সামনে বেসামাল হয়ে ১০৮ রানের বড় ব্যবধানে হার মানে ইংলিশরা। ঐ জয়ে তামিম ইকবালের ভূমিকাও ছিল প্রচুর। ম্যাচে দুই ইনিংসেই তামিম ভাল খেলেছেন।

প্রথম ইনিংসে তামিমের অনবদ্য শতক (১০৪) আর অধিনায়ক মুমিনুল হকের (৬৬) হাফসেঞ্চুরিতে ২২০ পর্যন্ত যায় বাংলাদেশ। আসলে তাতেই গড়ে উঠেছিল সাফল্যের ভিত। পরের ইনিংসেও তামিম ছিলেন সাবলীল। ওয়ানডে মেজাজে খেলা ৪০ রানের ইনিংসটি ছিল পরের ব্যাটসম্যানদের জন্য সাহস ও অনুপ্রেরণার দাওয়াই।

এই শেষ নয়। তামিম যে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অবিস্মরণীয় জয়েরও অন্যতম স্থপতি, সেটাও হয়তো বেমালুম ভুলে গেছেন অনেকে। সেটা ২০১৭ সালের আগস্টের ঘটনা। শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে সাকিব আল হাসানের অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে (৮৯ রান ও ১০ উইকেট) অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০ রানের জয় পায় বাংলাদেশ।

ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডিং পারফরম্যান্সের জন্য সাকিব হন ম্যাচসেরা। কিন্তু তামিমও পিছিয়ে ছিলেন না। দুই ইনিংসে তামিমের ব্যাট থেকে আসে জোড়া হাফসেঞ্চুরি (৭১ ও ৭৮)। তামিম ভাল খেলায় দুই ইনিংসেই পরের দিকের ব্যাটসম্যানরা পেয়েছেন ভাল খেলার সাহস। তামিমের চওড়া ব্যাট দলকে খুঁজে দিয়েছে জয়ের পথ।

তামিমের সাফল্যর গল্প কিন্তু আরও বড়, আরও লম্বা। মনে করে দেখুন তো, চার বছর আগে ২০১৭ সালের মার্চে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শততম টেস্টে জয়ের ঘটনা। কলম্বোর পি সারা ওভালে নিজেদের ১০০ নম্বর টেস্টে লঙ্কানদের মাটিতে ৪ উইকেটের দারুণ জয়ে উৎসবে মেতেছিল টাইগাররা।

সেই অবিস্মরণীয় জয়ের নায়ক আর কেউ নন, তামিম ইকবাল। ম্যাচের দুই ইনিংসেই সময়ের দাবি মিটিয়েছেন তামিম। যখন যেটা দরকার, তাই করেছেন। প্রথম ইনিংসে ৯১ বলে ৪৯ রানের টেস্ট ইনিংস। সৌম্য সরকারের (৬১) সঙ্গে প্রথম উইকেটে ৯৫ রানের বড় পার্টনারশিপ। পরে ১৯১ রানের টার্গেটে ১২৫ বলে ৮২ রানের ইনিংস খেলে দলকে জয়ের পথে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে ম্যাচসেরা হন তামিম।

কেউ কেউ হয়তো ২০১০ সালে ক্রিকেটের মক্কাখ্যাত লর্ডস (১০০ বলে ১০৩) আর ম্যানচেস্টারে পরপর দুই টেস্টে (১১৪ বলে ১০৮) সেঞ্চুরির কথা বলবেন। ঐ সাহসী শতক দুটি তামিমকে নিয়ে গিয়েছিল অন্য মাত্রায়। দেশের বাইরে টেস্টের বড় ও অভিজাত মঞ্চেও ভাল খেলার পর্যাপ্ত সামর্থ্য আছে তার- সে সত্য হয়েছিল প্রতিষ্ঠিত।

ঐ দুই সেঞ্চুরি ছাপিয়ে আরেকটি স্মরণীয় ব্যাটিং সাফল্য তামিমকে করে রেখেছে আরও বড়। সেটা ২০১৫ সালের ঘটনা। খুলনায় পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ২৯৬ রানের বিরাট ব্যবধানে পিছিয়ে পড়া ম্যাচে যখন বাংলাদেশ নিশ্চিত পরাজয়ের প্রহর গুনছিল, ঠিক তখন তামিম খেলেন টেস্টে তার সবচেয়ে ধৈর্য্যশীল ইনিংস। তার ক্যারিয়ারের একমাত্র ডাবল সেঞ্চুরি (২০৬) আর ইমরুল কায়েসের (১৫০) সেঞ্চুরির সুবাদে পরাজয় এড়িয়ে ম্যাচ ড্র করে বাংলাদেশ। অনবদ্য ডাবল সেঞ্চুরির পুরষ্কার হিসেবে তামিম পান ম্যাচসেরার পুরষ্কার।

কিন্তু কঠিন সত্য হলো, সেই তামিম এখন ঠিক ঐ জায়গায় নেই। মানে এখন তার ব্যাট আর সেভাবে কথা বলছে না। সর্বশেষ টেস্ট সেঞ্চুরি সেই ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে, হ্যামিল্টনে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে মেজাজে শতরান করেছিলেন তামিম ইকবাল, খেলেছিলেন ১২৮ বলে ২১ বাউন্ডারি ও ১ ছক্কায় সাজানো ১২৬ রানের ইনিংস।

এরপর আর শতরানের দেখা মেলেনি। তবে পরিসংখ্যান জানাচ্ছে ফর্ম খুব খারাপ ছিল না। পরের ইনিংসগুলোতে তা বোঝা যাবে। প্রায় ২৬ মাস আগে কিউইদের বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্ট সেঞ্চুরির পর তামিমের বাকি ইনিংসগুলো ছিল যথাক্রমে ৭৪, ৭৪, ৪, ৩, ৩৪, ৪১, ৯, ০, ৪৪ ও ৫০। অর্থাৎ ১০ ইনিংসে তিনটি ফিফটি আর দুইবার চল্লিশের ঘরে আউট। এ পরিসংখ্যান খালি চোখে বেশ সমৃদ্ধ। দশ ইনিংসে তিন ফিফটি মোট রান ৩৩৩।

কিন্তু তামিমের শেষ ৫ টেস্টের ব্যাটিংয়ে মিলেছে এক অন্যরকম বার্তা। যেখানে সর্বশেষ ৫ টেস্টের ১০ ইনিংসে চার চারবার দুই অংকে পৌঁছায়নি তার ব্যাট। শুরুর পরপরই আউট হয়ে গেছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তামিম হয় তার অফস্টাম্পের বাইরে থেকে ভেতরে আসা বলে লেগবিফোর উইকেটের ফাঁদে জড়িয়েছেন, না হয় অফস্টাম্পের আশপাশের বলে কট বিহাইন্ড হয়ে সাজঘরে ফিরেছেন। যে ইনিংসগুলোয় তামিমের ব্যাট কথা বলেনি, তার সবকটায় বাংলাদেশের অবস্থা ছিল খারাপ।

সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামে অবশ্য উল্টো চিত্র ছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেই টেস্টে তামিম চরমভাবে ব্যর্থ (৯ ও ০) হলেও বাকিদের দৃঢ়তায় বাংলাদেশ লড়াই করেছিল এবং ম্যাচের প্রথম ৪ দিন টাইগারদেরই প্রাধান্য ছিল। কিন্তু শেষ দিনে গিয়ে ক্যারিবীয় কাইল মায়ার্সের অবিশ্বাস্য ও অতি মানবীয় ব্যাটিংয়ের কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে ৩ উইকেটে হার মানে মুমিনুলের দল।

একই সিরিজের ঢাকা টেস্টে অবশ্য তামিম সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন দলকে ভাল সার্ভিস দিতে। শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে ঐ ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ৪৪ রানে সাজঘরে ফেরা তামিম পরের ইনিংসে পঞ্চাশে পা দিয়ে (৫০) আউট হন। সে ম্যাচেও বাংলাদেশ লড়াই করে শেষ অবধি পরাজিত হয় ১৭ রানে।

সময়ের চাকা ঘুরে আবার টেস্ট খেলতে নামছে টাইগাররা। রাত পোহালে ক্যান্ডির পাল্লেকেল্লে স্টেডিয়ামে বুধবার শুরু বাংলাদেশ আর শ্রীলঙ্কার দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্ট। তামিম কি এবার নিজের সেই হারানো রুপ ফিরে পাবেন? আবার জ্বলে উঠবে তার ব্যাট? চার বছর আগে এই শ্রীলঙ্কার মাটিতে একমাত্র টেস্ট জয়ের ম্যাচে উভয় ইনিংসে ভাল ব্যাটিং করে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হওয়ার সেই সুখস্মৃতি কি তাকে অনুপ্রাণিত করবে?

কঠিন সত্য হলো, সেই আফগানিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভাঙাচোরা দলের কাছে টেস্টে খাবি খাওয়া বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানো ও ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে যে তামিমের ব্যাটে রান খুব দরকার। ইতিহাস ও পরিসংখ্যান বারবার জানান দিয়েছে, তামিম শুরুতে ভাল খেলে একটা লম্বা চওড়া ইনিংস সাজাতে পারলে বাংলাদেশ ভাল খেলে। পরবর্তী ব্যাটসম্যানরা সাহস পান, ভাল খেলার রসদ মেলে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ না খেলে দেশে ফিরে আসা তামিম কি সেই হারানো ছন্দ ফিরে পাবেন আবার?

এআরবি/এসএএস/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]