দেশের বাইরে মুমিনুলের টেস্ট সেঞ্চুুরি নেই কেন?

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৯:০৬ এএম, ২১ এপ্রিল ২০২১

কী অদ্ভুত! যার টেস্ট ক্যারিয়ার শুরু দেশের বাইরে, অভিষেক ম্যাচেই প্রথম ইনিংসে হাফসেঞ্চুরি, পরের টেস্টে আবার দ্বিতীয় ফিফটি। ক্যারিয়ারের আট বছরের মাথায় সেই মুমিনুল হক টেস্টে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। যার ব্যাট সবচেয়ে বিশ্বস্ত।

ধারাবাহিকভাবে ভাল খেলার পাশাপাশি সেঞ্চুরি হাঁকানোয় তার আশপাশে নেই কেউ। ম্যাচ পিছু সেঞ্চুরির হিসেব কষলে তামিম (৬২ টেস্টে ৯), মুশফিক (৭২ টেস্টে ৭), আশরাফুল (৬১ টেস্টে ৬) ও সাকিব (৫৭ টেস্টে ৫) সবাই মুমিনুলের (৪২ টেস্টে ১০) পেছনে। দেশের সর্বাধিক ১০ টেস্ট সেঞ্চুরির মালিক কক্সবাজারের এ উইলোবাজ।

কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, তার সবকয়টি সেঞ্চুরি দেশের মাটিতে। হয় চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে, না হয় ঢাকার শেরে বাংলায়। মেলানো কঠিন! দেশে যার ব্যাট এত স্বচ্ছন্দ, যিনি বিশ্বের সব বাঘা বাঘা বোলারের বিপক্ষে ঘরের মাঠে সাবলীল, লম্বা ইনিংস উপহার দিয়েছেন। সেই মুমিনুল দেশের বাইরে গিয়ে দীর্ঘ ইনিংস খেলতে পারেননি। বিদেশের মাটিতে ১৭ টেস্টে তার ফিফটি ৬টি। সর্বোচ্চ ৭৭, নিউজিল্যান্ডের মাটিতে।

কেন মুমিনুল দেশের বাইরে পারেন না? তার ব্যাট দেশে যতটা সাবলীল ও নির্ভরযোগ্য, বিদেশে তা নয়। কী কারণ? টেকনিক, স্কিলে ঘাটতি? টেম্পারমেন্টে সমস্যা? নাকি মানসিক স্থিরতা কিংবা সাহস কম? এসব প্রশ্ন নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন মোহাম্মদ আশরাফুল।

টেস্ট ইতিহাসের সর্বকণিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান আশরাফুল মনে করেন না যে মুমিনুলের বড় কোন সমস্যা আছে। আশরাফুলের ব্যাখ্যা, ‘টেকনিক, স্কিল- ওসব কিছু না। আসলে মুমিনুল বিদেশে খেলেছেও কম। দেশে ২৫-৩০টির মত (আসলে ২৫টি) টেস্ট খেলে থাকলে, বাইরে খেলেছে ১০-১২ টি (বাস্তবে ১৭টি)। যেহেতু কম খেলেছে, তাই সেঞ্চুরি হয়নি।’

মুমিনুল দেশের বাইরে ভাল খেলেন না, সেঞ্চুরি নেই- এটাকে আসলে খুব আমলে আনতে চান না আশরাফুল। পূর্বসূরিই শুধু নয়, অনুজপ্রতিম মুমিনুলকে সতীর্থ হিসেবেও পেয়েছেন আশরাফুল। যে টেস্টে মুমিনুলের অভিষেক ঘটেছিল, তাতে ছিলেন আশরাফুলও। সেই ম্যাচের স্মৃতি এখনও পুরোই মনে আছে। তাই আশরাফুল অবলীলায় বলে দিলেন, ‘মুমিনুলের ডেব্যু হয়েছিল দেশের বাইরে, শ্রীলঙ্কায়। আমর খুব ভাল মনে আছে। আমার সাথে তার পার্টনারশিপও হয়েছে। মুমিনুল পঞ্চাশোর্ধ্ব (৫৫) ইনিংস খেলেছিল। আমি ঐ ম্যাচে ১৯০ করেছিলাম। কাজেই তার যদি বিদেশে ভাল খেলার সামর্থ্য না থাকত, তাহলে কেউ টেস্ট অভিষেকে ৫০ করে কিভাবে?’

তাই আশরাফুল কিছুতেই মানতে চান না, মুমিনুলের টেকনিকে সমস্যা আছে। তার বারবার মনে হয় দেশের বাইরে কম খেলা হয়। আর মুমিনুল সেভাবে বেশি ম্যাচে খেলেনি বাইরে। আর খেললেও একটা দীর্ঘবিরতি দিয়ে খেলেছে। যে কারণে বিদেশের উইকেট, কন্ডিশনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার সুযোগই মিলেছে কম। তাই হয়তো তার বিদেশে সাফল্য কম।

সামর্থ্যে ঘাটতি বা মানসিক সমস্যার কথা না বললেও আশরাফুল একটি টেকনিক্যাল কারণ চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, দেশের বাইরের পিচগুলোর বাড়তি গতি বিশেষ করে বাড়তি বাউন্সের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হয়তো কোথাও সমস্যা হয় মুমিনুলের।

আশরাফুলের ব্যাখ্যা, ‘আমাদের দেশের উইকেটগুলো হয় স্লো এন্ড লো। বল দেরিতে ব্যাটে আসে এবং নিচে থাকে। লক্ষ্য করে দেখেন, মুমিনুল কিন্তু ঐ পেস আর বাউন্সের সঙ্গে দারুণ মানিয়ে নিয়ে ব্যাট করে। মনেই হয় না, সমস্যা হচ্ছে। দেশের পিচের গতি ও বাউন্সের সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে নিলেও, আমার মনে হয় দেশের বাইরের বাড়তি বাউন্সে এডজাস্ট করতে সমস্যা হয়। তাই বিদেশে তার সাফল্য কম।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘বিদেশের উইকেটে তুলনামূলক বাউন্সটা ভাল থাকে। বল ওঠা নামা করে না। খুব ভাল ক্যারি করে। ভাল উচ্চতায় লাফিয়ে কিপারের গ্লাভসে চলে যায়। হয়তো সেই জায়গায় তার এডজাস্ট করতে কোন সমস্যা হয়। আবার ভাগ্যেরও আনুকুল্য প্রয়োজন আছে। যেটা হয়তো দেশের বাইরে গিয়ে পায়নি। অল্প সময়েই আউট হয়ে গেছে বেশি।’

তারপরও তার কি টেকনিক, স্কিল আর টেম্পারামেন্টের কোথাও সমস্যা ধরা পড়েছে? আপনার কী মনে হয়? আশরাফুলের ব্যাখ্যা, ‘নাহ! সেটা এভাবে বলা যাবে না। দেশের বাইরে পরপর অন্তত তিনটা সিরিজ খেললে তারপর বলতে পারতাম। কিন্তু তাতো হয় না। দেশের বাইরে আমাদের খেলাই হয় কম। আমরা বিদেশে টেস্ট সিরিজই কম খেলি। যাও খেলা হয়, তাও লম্বা সময়ের বিরতি দিয়ে। দেখা যায় একবার বিদেশ সফরের পর দীর্ঘসময় আর বাইরে কোন খেলা থাকে না। অনেক সময় বছরে একটি সিরিজ বিদেশে খেলা হয়।’

‘আমার মনে হয় মুমিনুলের ক্ষেত্রে এটাই একটা সমস্যা হয়েছে। সে কিন্তু বাইরে খুব বেশি খেলেনি। মুমিনুল সম্ভবত দুইবার নিউজিল্যান্ডে গেছে। একবার করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, পাকিস্তান আর জিম্বাবুয়ে সফর করেছে। আর শ্রীলঙ্কায় গেছে দুইবার। সেগুলোও বেশ বিরতি দিয়ে। লম্বা সময়ের বিরতি হলো একটা দেশের কন্ডিশন ও উইকেটের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর পথে বড় অন্তরায়। মানিয়ে নিতে অনেক সমস্যা হয়। তবে একটানা তিন-চারটা সিরিজ বাইরে খেললে বোঝা যেত সমস্যাটা আসলে কোথায়?’

এআরবি/এসএএস/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]