‘আমাকে কি পর্যাপ্ত সুযোগ দেয়া হয়েছে?’

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৮:১৯ পিএম, ২৭ এপ্রিল ২০২১

শুরুতেই হইচই ফেলা দেয়া। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ম্যাচেই শতরান। ২০১২ সালের ৩০ নভেম্বর থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, এই ২৭ মাসে ২৯ ওয়ানডেতে তিন সেঞ্চুরি ও তিন ফিফটি। যার দুটিতে আবার ৮০ ও ৯০।

কিন্তু ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ আর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচের পর থেকেই অনিয়মিত এনামুল হক বিজয়। এরপর আর কখনোই টানা জাতীয় দলে খেলার সুযোগ হয়নি। সেভাবে আর সুযোগ পাননি এ টপ অর্ডার।

স্বাভাবিকভাবেই ভিতরে অনেক জ্বালা। চাতক পাখির মত অপেক্ষায় থাকেন জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার। ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফর্মও করেন। ঢাকা লিগ এবং প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার ২২টি সেঞ্চুরি। কিন্তু হায়! তবুও সুযোগ মেলে না। মনের গহীনে জমেছে রাজ্যের সংশয়।

আজ মঙ্গলবার জাগো নিউজের সাথে খোলামেলা আলাপে মনের সেই অব্যক্ত কথাগুলোই বলেছেন এনামুল হক বিজয়।

জাগো নিউজ : কেমন আছেন বিজয়, কোথায় আছেন এখন?

এনামুল হক বিজয় : আছি স্ত্রী পরিবার নিয়ে মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বরের বাসায়, আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।

জাগো নিউজ : করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় কিভাবে কাটছে সময়?

বিজয় : করোনার মধ্যে সবারই অবস্থা ভাল না। সবারই অবস্থা খারাপ। দেশের অবস্থাও তাই। আমার দেশ কাঁদতেছে। সারা বিশ্বও করোনামুক্তির জন্য কান্নাকাটি করছে। এর মধ্যে কেমন আর থাকবো? এমন এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও আল্লাহর রহমতে মোটামুটি আছি।

জাগো নিউজ : এখন যেহেতু খেলা, প্র্যাকটিস সব বন্ধ। কী করে কাটছে সময়? নিজেকে ফিট রাখার কাজটি করছেন কিভাবে?

বিজয় : হ্যাঁ, লকডাউনের মধ্যে ঘরেই কাটছে সময়। তারপরও আমি মাঝে মাঝে জিমে যাবার চেষ্টা করেছি। একটু রানিং-জগিংও করছি। আর একটু রিহ্যাবও চলছে। চিকিৎসকের কিছু ট্রিটমেন্টও চলছে। সেগুলো করছি। মোটামুটি নিজেকে যতটা পারা যায় ঠিক রাখার চেষ্টা করছি।

জাগো নিউজ : ইনজুরির কথা বললেন, একটু জানাবেন কোথায় কবে ইনজুরির শিকার হলেন?

বিজয় : হ্যাঁ, আমিতো মাস্কো ক্রিকেট একাডেমিতে প্র্যাকটিস করতে গিয়েছিলাম। সেখানে ‘থ্রো ডাউনের’ সময় বাঁ-হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুলে ব্যথা পেয়ে যাই। তারপর এক মাসের মত ব্রেক ছিল। এজন্য জাতীয় লিগের প্রথম দুই ম্যাচ আমি খেলতে পারিনি।

জাগো নিউজ : এখন কেমন?

বিজয় : এখন আল্লাহর রহমতে মোটামুটি সুস্থ। আবার প্র্যাকটিস শুরু করেছি। আবার ব্যাথা দেখা দিয়েছিল, বরফ দিয়ে আবার সেটাকে কমিয়ে পেলা হয়েছে। আশা করি খুব শিগগিরই ঠিক হয়ে যেতে পারবো।

জাগো নিউজ : জাতীয় দলের বাইরে থাকা অবস্থায় ঘরোয়া ক্রিকেটই অবলম্বন। ঢাকা লিগ আর ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটকে কতটা মিস করছেন?

বিজয় : খুব ভাললাগা কাজ করেছে যে খেলাটা চালু হয়েছে। ন্যাশনাল লিগ শুরু হয়েছিল খুব ভালভাবে। হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবাই খুব হতাশ। তাকিয়ে আছি প্রিমিয়ার লিগের দিকে। প্রিমিয়ার লিগ যদি হয়, তা নিয়ে আমরা সবাই এক্সাইটেড। আমরা শুনেছি যে প্রিমিয়ার লিগ শুরু হবে, তা শুনেই ভাল লাগে। এর বাইরে আমরা আসলে সারা বছর যে প্র্যাকটিসটা করি, নিজেদের তৈরি রাখার চেষ্টা করি- করোনার কারণে তাও গ্যাপ কমে গেছে । তারপরও খেলাটা মাঠে গড়িয়েছিল। সেটাও ভাল লাগা। স্বস্তিও।

জাগো নিউজ : আপনার শুরু ছিল উল্কার বেগে, কিন্তু সে অনুযায়ী আপনার ক্যারিয়ার তত আলো ছড়ায়নি। আপনি জাতীয় দলে স্থান হারিয়েছেন। কেমন লাগে? ভেতরের অনুভুতিটা কেমন, একটু বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবেন কী?

বিজয় : আসলে কী বলবো? আমার ক্যারিয়ারে প্রথম ২৩ ওয়ানডেতেই তিনটি সেঞ্চুরি হয়ে গিয়েছিল। হ্যাঁ, সত্যি আমার যেখানে থাকার কথা ছিল, আমি এখন সেখানে নেই। ক্যারিয়ার যতটা বর্ণিল হতে পারতো, তা হয়নি। তা নিয়ে আক্ষেপ, কষ্ট, দুঃখ-বেদনা আর হতাশা আছে অবশ্যই।

আবার সঙ্গে একটি বড় প্রশ্নও আছে। আমার জিজ্ঞাসা, আচ্ছা-এর জন্য আমি একাই দায়ী? আমার ক্যারিয়ারের আজকের এ অনিশ্চিত অবস্থার জন্য কী একা আমি দায়ী? আমি জানি না। আমি ন্যাশনাল টিমে যখন নিয়মিত ছিলাম, তখন টপ পারফরমার ছিলাম। কিন্তু যেই না দলে অনিয়মিত হতে শুরু করলাম, তারপর আর সেভাবে চান্সই পেলাম না। শেষ ৫ বছরে আমি একবার সুযোগ পেয়েছি। দেশ ও বিদেশে সমান তিনটি করে ওয়ানডে খেলেছি। এই কিন্তু আমার সুযোগ। তারপর না টি-টোয়েন্টি দলে ডাক পেয়েছি, না টেস্টে সুযোগ পেয়েছি।

টেস্টে এখন ফার্স্ট ক্লাসে আমার ২২টা সেঞ্চুরি। অলমোস্ট ১০০’র কাছাকাছি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলে ফেলেছি। আমি নিজেকে এখন যথেষ্ঠ অভিজ্ঞ পারফরমার বলেই মনে করি।

টেস্ট ক্রিকেটের জন্য আমি দুই চার বছর ধরেই তৈরি; কিন্তু আমি কোন সুযোগ পাইনি। টি-টোয়েন্টি’তেও আমার শেষ ম্যাচে আমি ৪৯ রান করেছিলাম; কিন্তু তারপর আর সুযোগ পাইনি। জানি না আমি একাই দায়ী কি না? আমার এ অবস্থার দায় আর কেউ নেবেন কিনা? তাও জানা নেই।

মানছি ফিরে এসে আমি ছয় থেকে সাতটা ম্যাচ টানা খেলেছিলাম। মানছি ভাল করতে পারিনি; কিন্তু তারপর থেকে ম্যাচ খেলার সুযোগ পাওয়া বহুদুরে, আমি দলেই নেই। মানুষ যখন আমাকে প্রশ্ন করে, আপনি আসছেন, যাচ্ছেন- ব্যাপারটা কী? তাদের উত্তর দেই, আমি আসছি-যাচ্ছি না। একবারই এসেছিলাম। তারপর আর সেভাবে আসিনি। সুযোগও মেলেনি। আমিও একটি প্রশ্ন রাখতে চাই, আচ্ছা আমাকে কি পর্যাপ্ত সুযোগ দেয়া হয়েছে?

জাগো নিউজ : জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর পারফর্ম করেও ফেরা কঠিন, অনেক ক্রিকেটারই বলেছেন একথা। আপনার কী মনে হয়? আপনার মত ক্রিকেটারের ফেরার মঞ্চ কী তৈরি?

বিজয় : আমার মনে হয় না ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফরমেন্সের প্রকৃত মূল্যায়ন হয়। দুঃখ নিয়েই বলবো, আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটের ভাল পারফরমারদের সঠিক মূল্যায়ন হয় না। এই অবমূল্যায়নটা দেশের ক্রিকেটের জন্য খুব ভাল কিছু না।

ঘরোয়া ক্রিকেটের ভাল পারফরমাররা যদি ক্রমাগত অবমূল্যায়িত হতে থাকেন, তাহলে এক সময় দেশের ক্রিকেটে একটা শূন্যতা সৃষ্টি হতে পারে। শুধু আমি আমার কথা বলবো কেন- জহুরুল ইসলাম অমি, নাইম ইসলাম, শামসুর রহমান শুভ, মার্শাল আইয়ুব, সোহরাওয়ার্দী শুভ, ইলিয়াস সানি, শফিউল ইসলাম, সোহাগ গাজী, সানজামুল ইসলাম আর নাজমুল অপুর মত আরও কয়েকজন ভাল ক্রিকেটার আছেন, যারা ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত ভাল পারফর্ম করেও মূল্যায়িত হননি।

এরা সবাই কী প্রশ্ন তুলতে পারে না? পর্যায়ক্রমে যদি এমন জহুরল অমি আরও আট-দশটা তৈরি হয়, তাহলে তো বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যই ক্ষতি। কারণ তাকে তৈরি করতে সময়, শ্রম ও অর্থ সবই ব্যয় হয়েছে। আমি যখন দেখি একজন ঘরোয়া ক্রিকেটে টানা দুই বছর ভাল করে বারবার জাতীয় দলে ফিরেছে, তখন ভাল লাগে। আবার যখন দেখি কেউ একজন বাদ পড়ে এক ম্যাচ ভাল খেলেই টেস্ট সিরিজে ডাক পেয়ে গেছে তখন ভাল লাগার বদলে হিংসা কাজ করে।

আমার কথা, নামের দিকে না তাকিয়ে পারফরম্যান্সকে মূল্য দেয়া উচিৎ। আমার নামের পাশে এখন ৩৫ সেঞ্চুরি। তামিম ভাই ছাড়া আমাদের আর কারো নেই এতগুলো সেঞ্চুরি। কিন্তু আমি কোথাও নেই? এ দোষ কী আমার একার?

জাগো নিউজ : এত দুঃখ, কষ্টর পরও কী আবার জাতীয় দলে ফেরার আশা করেন?

বিজয় : অবশ্যই করি এবং খুব আত্মবিশ্বাস আর আস্থার সাথেই করি। আমি আশাবাদী। আমার এ নিয়ে কোন বড় ধরনের উদ্বেগ, টেনসন নেই। আমার স্থির বিশ্বাস, আবার জাতীয় ফিরবো, খেলবো এবং লম্বা সময় ধরে ন্যাশনাল টিমকে সার্ভিস দেব। এমন ভালভাবে প্রতিনিধিত্ব করবো, যাতে আমার ফেরাটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।

এআরবি/আইএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]