‘কারো দোষ নেই, আমিই সুযোগগুলো মিস করেছি’

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৮:৪১ পিএম, ২৯ এপ্রিল ২০২১

কাকে দুষবেন জহুরুল ইসলাম অমি? নিজেকে নাকি ভাগ্যকে? প্রথমতঃ সময়মত নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। এরপর ইনজুরি বারবার ক্যারিয়ারের পথে বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে।

পায়ের লিগামেন্ট সার্জারি হয়েছে বার দুয়েক। ২০১৪ সালে চিকিৎসক তাকে ক্রিকেট ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ইনজুরির সাথে অনেক লড়াই সংগ্রামের পর এখনো মাঠে টিকে আছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটে সমসাময়িক কালের, ‘ভদ্রছেলে জহুরুল ইসলাম অমি।’

রাজশাহীর এ নম্র-বিনয়ী ক্রিকেটার নিজেকেই দুষতে চান। আজ বৃহস্পতিবার রাজশাহী থেকে জাগো নিউজের সাথে মুঠোফোন সাক্ষাৎকারে জীবনের অনেক না বলা কথা জানিয়েছেন জহুরুল।

জাগো নিউজ : জহুরুল কেমন আছেন?

জহুরুল : জি, আলহামদুলিল্লাহ বাবু ভাই। আল্লাহ ভাল রেখেছেন।

জাগো নিউজ : কোথায় আছেন এখন, ঢাকা না রাজশাহীতে?

জহুরুল : রাজশাহীতে আমার বাবার বাসায়। রাজশাহী শহরে কেশবপুর পুলিশ লাইন গেট।

জাগো নিউজ : বাসায় সবাই কেমন আছেন?

জহুরুল : জি আলহামদুল্লিল্লাহ সবাই ভাল আছে ।

জাগো নিউজ : করোনা, যে কারণে লকডাউন, কিভাবে কাটছে সময় আপনার? কোন ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ, রানিং বা জিমওয়ার্ক করার কোন সুযোগ পাচ্ছেন?

জহুরুল : রোজার মাস। আল্লাহর নামে রোজা করছি। বছরের এই একটি মাস সময় কাটানো সহজ। রোজায় কোথা দিয়ে কেটে যায় সময়, বোঝাই যায় না। বিকেলে একটু কাজ করি। মাঠে যাই, রানিং করি। জিম করি।

আমাদের যেটা বিভাগীয় স্টেডিয়াম (শহীদ কামরুজ্জামান স্টেডিয়াম) সেখানেই বিকেলে গিয়ে একা একা দৌড়াই। একটু জিমও করি। শুক্রবার বাদ দিয়ে এইটুকুই করছি।

জাগো নিউজ : শহীদ কামরুজ্জামান স্টেডিয়ামে কী জিমনেশিয়াম আছে?

জহুরুল : নাহ! জিম নাই। ওটা আমাদেরই বানানো।

জাগো নিউজ : আপনাদের মানে?

জহুরুল : আমরা মানে রাজশাহী বিভাগীয় ক্রিকেটার্স এসোসিয়েশন এর উদ্যোগে করা। আমরা ক্রিকেটাররা মিলেই করেছি। আমাদের নিজস্ব কোন জিম নাই, তাই আমরা ‘আর সি এ’ এই ব্যানারে স্টেডিয়ামের ভেতরে একটি অস্থায়ী জিম তৈরি করেছি। ৭০০ স্কয়ার ফিট জায়গা নিয়েছি।

আমাদের রাজশাহীর অগ্রজ প্রতিম ক্রিকেটার সাইফুল্লাহ জেম ভাই, যিনি স্টেডিয়ামের ভেন্যু ম্যানেজার, তিনি আমাদের ওই জিম তৈরিতে সহায়তা করেছেন। আমাদের জায়গাও দিয়েছেন। বিসিবিও জিমনেসিয়ামের সব আনুসাঙ্গিক আধুনিক উপকরণ দেবে।

জাগো নিউজ : এখন আপনি জাতীয় দলের বাইরে, এই অবস্থায় ঘরোয়া ক্রিকেটে মনোযোগ দেয়া কতটা সম্ভব ?

জহুরুল : আসলে এটা খুব কঠিন। এক কথায় জাতীয় দলে না থাকলে ঘরোয়া ক্রিকেটে মোটিভেট করা মোটেই সহজ না। বেশ কঠিন। জাতীয় দলে থাকলে ঘরোয়া ক্রিকেটে ভাল খেলার ইচ্ছে, তাগিদ আর সংকল্পটা আপনাআপনি চলে আসে। আর জাতীয় দলের বাইরে থাকলে ঘরের ক্রিকেটে ভাল খেলা উদ্দেশ্যটা তৈরি করতে হয়।

প্রতি বছরই একটা প্ল্যান করে ডমিস্টিক খেলতে নামি। অন্যদের কথা জানি না। সত্যি বলতে কী, আমি এখন প্রতি বছরই ঘরোয়া ক্রিকেট শুরুর আগে ভাবি আমাকে ন্যাশনাল টিমে ফিরতে হবে। ডমিস্টিকে ভাল খেলবো সেই চিন্তায় নয়। ন্যাশনাল টিমে খেলবো- এই চিন্তা করে ডমিস্টিকে ভাল খেলার অনুপ্রেরণা নিতে চেষ্টা করি। ঘরের ক্রিকেটে ভাল খেলতে পারলে আবার জাতীয় দলে ফিরবো- সেটা ভেবে অনুপ্রাণিত হবার চেষ্টা করি। এই চিন্তায় প্র্যাকটিস করি। ভাল খেলার উদ্যম পাই।

জাগো নিউজ : অনেক ক্রিকেটারেরই আক্ষেপ, কেউ কেউ চাপা অনুযোগও করেন, জাতীয় দল থেকে বাদ পড়লে একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর আর ঘরোয়া ক্রিকেটের পারফরমেন্সের তেমন মূল্যায়ন হয় না। আপনারও কী তেমন আক্ষেপ আছে?

জহুরুল : নাহ! আমার সে অর্থে কোন আক্ষেপ, অভিযোগ কিংবা অনুযোগ নেই। আমার আক্ষেপ আসলে নিজেকে নিয়েই। আমি কারো ওপর দোষ চাপাতে রাজি নই। আমি ৭টি টেস্ট খেলেছি। এরমধ্যে গোটা সাতেক ইনিংস (আসলে ৫ বার - ৪৩, ৪৬, ৪১*, ৪৮ ও ৪৩) চল্লিশের ঘরে ও তার আশপাশে।

একজন ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্টে ওয়েল সেট হয়ে চল্লিশের ঘরে ও তার আশপাশে আউট হওয়া হচ্ছে রীতিমত ‘ক্রাইম’। আমি অনেক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারিনি। পাওয়া সুযোগগুলো খুব বাজে ভাবে মিস করেছি। ডমিষ্টিক পারফরমেন্স কাউন্ট করে কিনা জানি না? গত প্রিমিয়ার লিগ ভাল খেলেছি।

আমাকে তো ভালই মূল্যায়ন করেছি। তারপর ব্যাঙ্গালুরু পাঠানো হলো ‘এ’ টিমের সাথে। সেখোনে সেকেন্ড হায়েস্ট রান করলাম। তারপর শ্রীলঙ্কাও গিয়েছিলাম চারদিনের ম্যাচের সিরিজ খেলতে। সেখানে হায়েস্ট রান স্কোরার ছিলাম আমাদের দলের।

এরপরই ভারতের সাথে যে দুটি টেস্ট হলো আমি কিন্তু ওই দলে ছিলাম। আমারও ভিসা করানো হয়েছিল। ১৬-১৭ জনের মধ্যে আমি ছিলাম। কিন্তু ইনজুরিতে পড়ার কারণে আর থাকা হয়নি। আমার কোমরে ব্যথা দেখা দেওয়ায় আর দলে নেয়া হয়নি।

তারপর শ্রীলঙ্কা থেকে এসে জাতীয় লিগে ভাল খেললাম। ৫০ প্লাস আর ৪৭ এর মত দুটি ইনিংস খেললাম। আবার আহত হয়ে গেলাম। তাই আমি কখনোই বলতে চাই না যে আমার ঘরোয়া ক্রিকেটের পারফরম্যান্স মূল্যায়িত হয়নি। আমার মনে হয় আমি ঠিকই মূল্যায়িত হয়েছি। যখনই ঘরোয়া ক্রিকেটে ভাল খেলেছি, ডাক পেয়েছি আবার জাতীয় দলে।

জাগো নিউজ : আপনি মানছেন নিজেই সুযোগ হাতছাড়া করেছেন, তাহলে কী জহুরুল নিজের ওপরই অসন্তুষ্ট?

জহুরুল : হান্ড্রেড পারসেন্ট। সময়টা খুব সীমিত। আপনি হয়ত ২০ বছরও খেলতে পারেন; কিন্তু শুরুর যাত্রার সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ ও সংক্ষিপ্ত। এক থেকে দেড় বছর একদম টার্নিং পয়েন্ট। ওই সময়টা একদমই হেলাফেলার টাইম না। প্রতিটি ইনিংস মূল্যবান। প্রতিটি প্র্যাকটিস সেশনেরও তখন অনেক মূল্য থাকে।

এখন আমি যতই রান করি, আমার এখন বয়স হয়েছে। আমাকে যদি ন্যাশনাল টিম নেয়ও, তাও হয়ত বড়জোর বছর দুয়েকের জন্য; কিন্তু একজন ১৯-২০ বছর বয়সের ছেলে দলে ঢুকলে তার কাছ থেকে লং সার্ভিস পাওয়া যাবে। তাই আমাকে শুধু ভাল খেললে চলবে না। ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি’ পারফরম করতে হবে। এটা সত্যি আমি যখন ন্যাশনাল টিমে ঢুকেছিলাম, তারপর যদি এক থেকে দেড় বছর নিজেকে ঠিকমত মেলে ধরতে পারতাম, আমার ক্যারিয়ারও মুশফিকের মত হতে পারতো। সুযোগটা সময়মত কাজে লাগানোই আসল।

জাগো নিউজ : আচ্ছা! ইনজুরিওতো আপনাকে অনেক ভুগিয়েছে।

জহুরুল : হ্যাঁ, এটা আমি অস্বীকার করবো না। আমি যদিও ব্যক্তি জীবনে খুবই ডিসিপ্লিন্ড এবং আমার জীবন যাত্রা খুবই সাজানো গোছানো। সুশৃঙ্খল। তারপরও ইনজুরি আমাকে ভুগিয়েছে। আমি এটাকে ‘ব্যাডলাকই’ বলবো। আমি রুটিন মেনে চলার চেষ্টা করেছি। ঘুমানো বলেন, খাওয়া বলেন বিশ্রাম নেয়া বলেন- সবই ঠিকঠাক মত করেছি।

তারপরও ইনজুরি এসে গ্রাস করেছে। এমন কিছু ঘটে গেছে আমার জীবনে, যা হয়ত কপাল লিখন ছিল। তবে এগুলো নিয়েও আমি আপসেট না। বলার কিছু নেই। আমি ইনজুরির কারণেও বেশ কবার দলের বাইরে চলে গেছি। আমার ফিরেছি। এটাও এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। এক সময় চিকিৎসক তো আমাকে ক্রিকেট খেলতেই নিষেধ করে দিয়েছিলেন।

জাগো নিউজ : সেটা কবে কখন, কী হয়েছিল?

জহুরুল : আমার কয়েকটি বড় অপারেশন হয়েছে। প্রথমবার হয়েছিল ২০০৯’তে লিগামেন্ট সার্জারি। আর ২০১৪ সালে চেন্নাই অ্যাপোলো হাসপাতালে সার্জারি হলো, তখন চিকিৎসক খেলা ছেড়ে দিতে বললেন। উনি তখন মাসক্যুইলার সার্জারিতে ভারতের সবচেয়ে বড় ডাক্তার, তিনি বললেন, তুমি খেলা ছেড়ে দাও। তখন আমি ৫-৬ মাস একদম ঘরে বন্দী ছিলাম।

একই সময়ে আমার মেয়ের আবার জার্ম টিউমার মানে ক্যান্সার ধরা পড়লো। এই সময় আমি একদম ভেঙ্গে পড়লাম। আল্লাহর রহমতে আমার মেয়ে সেড়ে উঠলো। আমার পাও ঠিক হলো। তখন চেন্নাইয়েরই আরেক চিকিৎসক আমাকে সাজেশান দিলেন, জহুরুল তুমি যতদিন পারবা ক্রিকেট খেলো। ভদ্রলোক ১১টি ফার্স্ট ক্লাস খেলার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। তিনি যখন বললেন তুমি যতদিন খেলবা ততদিনই সুস্থ্য থাকবা।

এটা আমার দুই পায়ে প্রবলেম। তখন উনি আমাকে সাজেশন দিলেন কেরালায় একটি আয়র্বেদ হাসপাতালে যাবার জন্য। আমি গত ৫ বছর সময় করে ওই আয়ুর্বেদ হাসাপাতালে গেছি। শুধু করোনার জন্য যাওয়া হয়নি শেষ এক বছর। সেখানে আমি প্রতি বছর গিয়ে ১৪ দিন হাসপাতালে থাকতেও হয় এবং অনেক উপকার পেয়েছি। এরপর ওই প্রবলেমগুলো কেটে গেছে।

জাগো নিউজ : এমন কোন ইনজুরির কথা কি মনে আছে, যা আপনাকে সত্যিই পুড়িয়েছে?

জহুরুল : হ্যাঁ আছে। ২০১৫ সালে বিপিএলে রংপুর রাইডার্সের হয়ে ভাল খেললাম। আমার ক্যাপ্টেন ছিল মাশরাফি। বিপিএল শেষে মাশরাফি বললো জিম্বাবুয়ের সাথে প্রথম দুই টি-টোয়েন্টি ম্যাচ তুই খেলবি। ওই দিনই বিপ টেস্ট ছিল। সেই টেস্ট দিতে গিয়ে আমার মাসল টি আর হয় , গ্রেড থ্রি ইনজুরি। তারপর এবার আমার নাগপুর টেস্ট খেলার সম্ভাবনাও অনেক বেশি ছিল।

হেড কোচ রাসেল ডোমিঙ্গোও বলেছিলেন তুমি টেস্ট টিমে থাকবা। শ্রীলঙ্কান ‘এ’ টিমের সাথে আমার ৯৭ রানের এক ইনিংস দেখেই ডোমিঙ্গো উৎসাহ দেখিয়েছিলেন। এবারও আমি যখন দলে ঢুকবো তখন রাজশাহীতে এক এক্সিডেন্টে আমার কোমরের ডিস্কে প্রচন্ড ব্যাথা পাই। এক প্রাইভেট কার পিছন থেকে ধাক্কা দিলে আমি রিকশা থেকে পড়ে কোমরে প্রচন্ড চোট পাই। আমার আবার টেস্ট দলে ফেরা ও খেলার স্বপ্ন ভেস্তে যায়।

জাগো নিউজ : আচ্ছা এত বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে জহুরুল কী এখনো আবার জাতীয় দলে ফেরায় আশাবাদী?

জহুরুল : আমি স্টিল হোপফুল। নির্ভর করবে ফিটনেসের ওপর। আমার ফিটনেস এখনো ভাল আছে। সুস্থ্য থাকলে আর ব্যাটে রান করলে আশা করি আবার ডাক পাব। আমার প্রতি কোন সময় অন্যায় হয়নি। আমি সৌভাগ্যবান, যখনই রান করেছি। তখনই ডাক পেয়েছি। কাজেই আশা ছাড়িনি।

জাগো নিউজ : আপনি কোন ফরম্যাটে জাতীয় দলে ফিরতে চান?

জহুরুল : আমার আসলে টেস্ট খেলার দিকেই আকর্ষণ বেশি। ছেলে বেলা থেকেই আমি টেস্ট প্লেয়ার হতে চেয়েছি। তাই আমি এই বয়সে (৩৪ বছর ৪ মাস) আমি আবার টেস্ট খেলতে চাই।

এআরবি/আইএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]