‘২০ বছর আগের সেই পারফরম্যান্স নিয়ে এখনও পুলকিত হই’

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১০:১০ পিএম, ৩০ এপ্রিল ২০২১

বাঁ-হাতি পেসার মঞ্জুরুল ইসলাম। ২০০১ সালের এপ্রিলে জিম্বাবুয়ের মাটিতে অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গ্রান্ট ফ্লাওয়ার, অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেল, হিথ স্ট্রিকদের মত নামী পারফরমারে গড়া জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট ক্যারিয়ার শুরু করে এক ইনিংসে ৬ উইকেট দখল ছিল তার অনেক বড় কৃতিত্ব।

সেটা ছিল টিম বাংলাদেশের দ্বিতীয় টেস্ট। আর বাঁ-হাতি পেসার মঞ্জুরুল ইসলামের প্রথম টেস্ট। তাতেই ৮১ রানে ৬ উইকেট শিকারী মঞ্জু বনে গিয়েছিলেন ‘হিরো।’

আজ শুক্রবার জাগো নিউজের সাথে আলাপে সেই ম্যাচের সুখ স্মৃতিচারণসহ আলাপে মঞ্জু আরও একটি বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন...।

জাগো নিউজ : কেমন আছেন মঞ্জু?

মঞ্জু : আল্লাহর রহমতে ভাল আছি। তবে মানসিক দিক থেকে তেমন ভাল না। বলতে পারেন মনটা তেমন ভাল না।

জাগো নিউজ : কেন কী সমস্যা?

মঞ্জু : আমার মা অসুস্থ। উনি ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগছেন। তার জন্য উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় কাটে সময়। সবার দোয়া চাই।

জাগো নিউজ : আচ্ছা! আপনিতো টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে এক ইনিংসে ৬ উইকেট শিকারি। তাও দেশে নয়, দেশের বাইরে জিম্বাবুয়ের মাটিতে..! সেই ৬ উইকেট শিকারের কথা কী মনে আছে আপনার?

মঞ্জু : হ্যাঁ, কি বলেন! থাকবে না আবার! ওটাইতো আমার পুরো ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য। সে সোনালি সাফল্যের কথা ভুলি কী করে?

জাগো নিউজ : সেই ৬ উইকেট শিকারের গল্পটা একটু বলবেন?

মঞ্জু : আমার জীবনে সেটাই ছিল প্রথম টেস্ট। আর আমাদের টিম বাংলাদেশের সেটা ছিল দ্বিতীয় টেস্ট। ২০০০ সালের নভেম্বরে ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ভারতের সাথে অভিষেক টেস্টের পর সেটাই ছিল আমাদের দলের দ্বিতীয় টেস্ট আর আমার প্রথম টেস্ট। আমি অবশ্য প্রথম টেস্ট স্কোয়াডেও ছিলাম। তবে ১১ জনে জায়গা পাইনি।

ঠিক তার ৫ মাস পর ২০০১ সালের এই এপ্রিলে জিম্বাবুয়ে সফরে প্রথম টেস্ট ছিল বুলাওয়ের কুইন্স স্পোর্টস ক্লাব মাঠে। নিজের প্রথম টেস্টেই আমি ৬ উইকেট শিকার করেছিলাম। সেটা সত্যিই অবিস্মরণীয় স্মৃতি।

জাগো নিউজ : বাংলাদেশের একজন পেসার জিম্বাবুয়ের মাটিতে প্রথম টেস্ট খেলতে নেমে ৬ উইকেট পেল, সে সাফল্যটা আপনাকে কতটা উদ্বেলিত করেছিল?

মঞ্জু : অনেকটাই। আমি একজন ডেব্যুট্যান্ট ছিলাম। অধিনায়ক ছিলেন নাঈমুর রহমান দুর্জয় ভাই। আর প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে তো আর আজকের মত ভগ্ন, দুর্বল, কমজোরি ও তারকাশূন্য ছিল না।

অধিনায়ক ছিলেন জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের সব সময়ের সেরা তারকা অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার। স্টুয়ার্ট কার্লাইল, অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেল, গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার, হিথ স্ট্রিক, অ্যান্ডি ব্লিগনট আর ডিয়ন ইব্রাহিমের মত পরিচিত ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রতিষ্ঠিত পারফরমারে গড়া তখনকার জিম্বাবুয়ে ছিল অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী।

সেই দলের বিপক্ষে আমি প্রথমবার বল হাতে নিয়ে ৬ উইকেট পেয়েছি, এটা ভাবতেই এখনো মনটা খুশিতে ভরে যায়। পুলকিত হই। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে আমরা ওই ম্যাচ জিতিনি। এমনকি ড্র’ও করতে পারিনি। হেরেছি (ইনিংস ও ৩২ রানের ব্যবধানে)। কিন্তু জিম্বাবুয়ের এমন শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপকে আমরা সাড়ে চারশোর আশপাশে (৪৫৭ রানে) বেঁধে ফেলেছিলাম।

আমি একাই ৬ উইকেট নিলাম। যা তখনকার প্রেক্ষাপটে ছিল অনেক বড় সাফল্য। জিম্বাবুয়ের ঘরের মাঠে অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের মত বিশ্বমানের ব্যাটসম্যানের নেতৃত্বে প্রচন্ড শক্তিশালী এক দল। খুবই কঠিন প্রতিপক্ষ। আর আমাদের মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট। সেই ম্যাচে ৫ উইকেটের বেশি শিকার, রীতিমত দারুণ ব্যাপার ছিল। শুধু আমার জন্য নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যও তখন অনেক বড় ব্যক্তিগত সাফল্য ও অর্জন ছিল।

জাগো নিউজ : আপনার কী মনে আছে, এমন একঝাঁক নাম করার উইলোবাজে সাজানো দলের বিপক্ষে আপনার সাফল্যের পিছনের কাহিনী কী ছিল?

মঞ্জু : সেভাবে বলতে গেলে বলবো পেছনের কোন কাহিনীই নেই। কি আর থাকবে বলুন! আমি তো একদম আনকোরা তরুণ। জীবনের প্রথম টেস্ট খেলতে নেমেছি মাত্র। টেস্ট ক্রিকেটের ‘অ’ ‘আ’ও তেমন জানি না। তবে আমি শুরুর থেকেই একটি কাজ করেছি, তাহলো একটা ভাল চ্যানেলে বল ফেলার চেষ্টা ছিল। খুব ভাল লাইন ও লেন্থ বজায় রেখে বল করেছি।

আর বুলাওয়ের উইকেট তো শতভাগ স্পোর্টিং, আপনি নিজের ক্যারিশমায় সুইং, ম্যুভমেন্ট আদায় করতে পারলে পারবেন। আমার কিছু ডেলিভারি সুইং করেছিল। তার প্রমাণ হলো আমি যে ৬ জনকে আউট করেছিলাম, তার তিনজনই আউট হয়েছিলেন উইকেটের পিছনে ক্যাচ দিয়ে এবং সেই তালিকায় জিম্বাবুয়ের তখনকার অধিনায়ক অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারও ছিলেন।

জাগো নিউজ : আপনি কাকে কিভাবে আউট করেছিলেন, তা কী মনে আছে?

মঞ্জু : হ্যাঁ, অনেকটাই আছে। আমি উইকেটের সহায়তা কাজে লাগিয়ে সুইং পাচ্ছিলাম। বল মুভ করছিল। অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের মত ব্যাকরণসিদ্ধ ব্যাটসম্যানও সম্ভবত স্লিপ না হয় গালিতে ক্যাচ দিয়েছিলেন।

এর আগে প্রথম উইকেট ছিলেন জিম্বাবুয়ান ওপেনার ডিয়ন ইব্রাহিম। ডানহাতি ডিয়ন ইব্রাহিম অফ স্ট্যাম্পের বাইরে কৌনিক ডেলিভারিতে ব্যাট সরাতে গিয়েও পারেননি। বল তার ব্যাট চুমে চলে যায় কিপার পাইলট ভাইয়েরর গ্লাভসে।

Manjurul islam

এরপর স্টুয়ার্ট কার্লাইলকে বোল্ড করেছিলাম। বল ভিতরে এসে তার উইকেট ভেঙ্গে দিয়েছিল। এছাড়া হিথ স্ট্রিক ও এন্ডি ব্লিগনটকেও আউট করেছিলাম। হিথ স্ট্রিক ক্যাচ দিয়েছিলেন শর্ট মিড উইকেটে বদলি ফিল্ডার রফিক ভাইয়ের হাতে। আর ব্লিগনট পুল খেলতে গিয়ে আকাশে তুলে দিয়েছিলেন। আমি নিজেই তা ধরেছিলাম।

জাগো নিউজ : উইকেট কেমন ছিল?

মঞ্জু : উইকেট ছিল স্পোর্টিং। পেস ও বাউন্সও ছিল ইভেন।

জাগো নিউজ : আপনি ওই ম্যাচে ৩৫ ওভার বল করেছিলেন। যার ১২টি ছিল মেডেন। ৮১ রানে পতন ঘটিয়েছিলেন ৬ উইকেটের। অনেক লম্বা সময় বল করেছিলেন...!

মঞ্জু : আমার মাঝে আহামরি কোন কিছু করার চেষ্টা ছিলনা। একটা চ্যানেলে মানে এক জায়গায় বল করেছিলাম। আসলে টেস্টে উইকেট আদায় করে নিতে হয়। আপনাকে উইকেট দেবে না। সেটা জানা ছিল আমার। আমি জানতাম, যদি অফ স্ট্যাম্প ও তার আশপাশে ক্রমাগত বল করতে পারি, তাহলে সাফল্য আসবেই। ব্যাটসম্যান হয়ত অনেক বল না খেলে ছেড়ে দেবে। কিন্তু এক সময় বিরক্ত হয়ে বা ভুল করে ব্যাট পেতে দেবে। আমিও প্রথম টেস্টে সেই কাজটিই করেছিলাম এবং সফলও হয়েছিলাম।

৩৫ ওভার বোলিং করার কথা যদি বলেন, তাহলে একটি কথাই বলবো। ফিজিক্যালি ফিট হওয়া ছিল একান্ত জরুরি। আপনাকে টেস্টে ৩৫ ওভার বল করতে হলে খুব ফিট হতে হবে। আমি আমার দলের তখন অন্যতম ফিট ক্রিকেটার ছিলাম। তাই অত দীর্ঘ সময় বল করতে পেরেছি।

জাগো নিউজ : এখনকার পেসারদের দেখে কি মনে হয়?

মঞ্জু : খুব ভাল। আজকে তাসকিনকে দেখে আমার খুব ভাল লেগেছে। সে রাইট চ্যানেলে বল করেছে প্রচুর। দ্রুত গতির সাথে সুইংও আদায় করে নিয়েছে। কালকে তার বলে ক্যাচ দুটি হাত ছাড়া না হলে তাসকিন আরও সফল হতো। আর দু’জনার একজনারও সেঞ্চুরি হতো না।

আজকে তাসকিন রাইট ওয়েতে বল ফেলেছে। বলে পেসও ছিল। ম্যুভমেনটও হয়েছে। তাইতো অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস অফ স্টাম্পের বাইরে অসহায়ের মত ক্যাচ তুলে দিয়েছেন। আর নিশাংকাও ইন সুইংয়ে বোল্ড হয়েছে। শরিফুলও গুড প্রসপ্রেক্ট। আমার মনে হয় আমাদের পেসাররা অনেকদিন পর ভাল ও সমীহ জাগানো বোলিং করেছে। দেখে ভাল লেগেছে।

জাগো নিউজ : মঞ্জু আপনার এখনকার কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে কিছু বলেন?

মঞ্জু : আমি এখন বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দলের প্রধান নির্বাচক ও ম্যানেজারের দায়িত্বে আছি। তিন মাস ধরে এখানে জয়েন করেছি। এ জায়গাটা বেশ এনজয় করছি।

জাগো নিউজ : দেশের হয়ে প্রথম টেস্টে ৬ উইকেট শিকারী মঞ্জু এইচপি বা বয়স ভিত্তিক দলের পেস বোলিং কোচ না হয়ে নারী ক্রিকেটের নির্বাচক ও ম্যানেজার?

মঞ্জু : আসলে বোর্ড আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে নারী ক্রিকেটের। দেশের ক্রিকেটের সাথে সম্পৃক্ত থাকা ও কাজ করার মাঝে অনেক তৃপ্তি আছে। আমি কাজ করছি। তবে হ্যাঁ, আমাকে কখনো অনূর্ধ্ব-১৯ কিংবা এইচপির পেস বোলিং কোচের দায়িত্ব দিলে অবশ্যই বিবেচনা করবো। যদি কাজ করার ক্ষেত্রটা ভাল থাকে তাহলে আমি অবশ্যই করবো।

জাগো নিউজ : সালমা, রুমানা আর জাহানারা ছাড়া ভবিষ্যতের তারকা হতে পারেন এমন কোন নারী ক্রিকেটার কী আছেন?

মঞ্জু : অবশ্যই আছে। আমি আপনাকে অন্তত পাঁচ থেকে ছয়জন ক্রিকেটারের নাম বলবো, যারা খুবই মেধাবি এবং সম্ভাবনাময়।

জাগো নিউজ : তারা কারা নাম বলবেন কী?

মঞ্জু : আমি প্রথমেই বলবো আমাদের নারী ইমার্জিং দলের অধিনায়ক নিগার সুলতানা জোতির কথা। বলে দিচ্ছে সে ওয়ার্ল্ড ক্লাস প্লেয়ার হবে। তিন নম্বরে ব্যাটিং করে। পাশাপাশি উইকেট কিপিং করে। ডান হাতি ব্যাটসম্যান।

আরেকটি মেয়ে আছে মোর্শেদা খাতুন হ্যাপি। বাঁ-হাতি টপ অর্ডার। ভেরি গুড প্লেয়ার। এছাড়া রিতু মনি। ফাস্ট বোলিং অলরাউন্ডার। আরও কয়েকটি নাম বলছি, রাবেয়া খাতুন। মাত্র ১৬ বছর। দক্ষিণ আফ্রিকান ইমার্জিং দলের সাথে একটি ম্যাচ খেলেছে। তাতেই ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছে। ডানহাতি লেগস্পিনার। বিকেএসপির ছাত্রী। বরিশালের মেয়ে।

এছাড়া ফারিহা হক তৃষ্ণা বাঁ-হাতি ফাস্ট বোলার। একটি মেয়ে আছে সানজিদা আকতার মেঘলা। আমার মনে হয় এরা সবাই অমিত সম্ভাবনাময়। সবাই আশা করি জাতীয় দলে খেলবে।

এআরবি/আইএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]