‘আমার স্বপ্ন বিশ্বমানের পেসার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা’

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৬:১৫ পিএম, ০৮ মে ২০২১

ক্যারিয়ারের শুরুতেই আগুন ঝরানো বোলিং। ওয়ানডে অভিষেকেই ৫ উইকেট। তাও ভারতের মত প্রবল পরাক্রমশালী দলের বিপক্ষে; কিন্তু তারপর সময় গড়ানোর সাথে সাথে তাসকিন আহমেদের বলের তেজ কমতে থাকে। একনম্বর স্ট্রাইকবোলার হওয়া দূরে থাক, দলে জায়গাই হয়ে যায় নড়বড়ে।

২০১৯ সালের বিশ্বকাপের আগে অনেক পরিশ্রম করে ঘাম ঝরিয়েছিলেন; কিন্তু জায়গা পাননি বিশ্বকাপ দলে। সেই বাদ পড়াটা ব্যক্তিগতভাবে খুব কষ্টের ছিল। তারপর দলের আশপাশেও ছিলেন না লম্বা সময়। অবশেষে এবার ফিরলেন তাসকিন। একদম বীরের মত। আবার সেই আগুন ঝরানো বোলিং নিয়ে।

ক্যান্ডির পাল্লেকেল্লে স্টেডিয়ামের নিষ্প্রাণ মরা পিচেও বল হাতে প্রাণের সঞ্চার করেছেন তাসকিন। বাড়তি গতির সঞ্চার করেছেন। প্রচন্ড গরমে লম্বা লম্বা স্পেলে বোলিং করেছেন। নিখুঁত লাইন ও লেন্থে বল ফেলায়ও রেখেছেন দক্ষতার ছাপ।

মাঝে দলের বাইরে ছিটকে পড়া থেকে আবার ফেরা। ইনজুরি জয় করা, ফিটনেস লেভেল বাড়ানো, লম্বা স্পেলে বোলিং করা আর কন্ট্রোল বোলিং রপ্ত করা- সবই দেখা গেছে তাসকিনের বোলিং। কিভাবে নিজেকে আবার ফিরে পেলেন তাসকিন? বাদ পড়ে, ইনজুরি জয় করে নিজেকে এতটা উন্নতি ঘটালেন কি করে?

আজ (৮ মে শনিবার) দুপুরে জাগো নিউজের সাথে আলাপে সে গল্পই শুনিয়েছেন তাসকিন...

জাগো নিউজ : কেমন আছেন তাসকিন?

তাসকিন : এই তো আলহামদুল্লিল্লাহ। আল্লাহর রহমতে ভাল আছি

জাগো নিউজ : শ্রীলঙ্কা থেকে ফেরার পর কি বাসায়ই আছেন?

তাসকিন : হ্যাঁ, দেশে ফেরার পর মোহাম্মদপুরের বাসায়ই আছি। আব্বা, আম্মা, ছোট বোন আর ওয়াইফকে নিয়ে আমাদের মোহাম্মদপুরের বাসাতেই আছি এবং বাসায় কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হচ্ছে।

জাগো নিউজ : তাহলে শ্রীলঙ্কার সাথে ওয়ানডে সিরিজের প্র্যাকটিসে যোগ দেবেন কবে?

তাসকিন : আমরা যারা শ্রীলঙ্কা থেকে টেস্ট সিরিজ খেলে ফিরেছি, তাদের ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা বলে হচ্ছে। তাই এখন আর অনুশীলনে যোগ দেয়া হয়নি। আমরা দুই সপ্তাহ কোয়ারেন্টাইনে কাটিয়ে ১৮ মে ইনশাল্লাহ প্র্যাকটিস শুরু করবো।

জাগো নিউজ : আপনার ফেরাটা দুর্দান্ত। পূর্বসুরিরাও আপনাকে এভাবে ছন্দে ফিরতে দেখে অবাক এবং সবাই আপনার কামব্যাককে অসাধারণ বলে অভিহিত করেছেন। একটু বলবেন এভাবে আবার ছন্দে ফিরে আসার পিছনের গল্পটা কী?

তাসকিন: আসলে আবার ফর্ম ফিরে পাবার সে অর্থে তেমন কোন গল্প-কাহিনী নেই। গত বছর করোনার সময় প্রথম যে লকডাউন হয়েছে, তখন থেকেই আমি একদম রুটিন করে ঘরে ফিজিক্যাল ট্রেনিং করেছি। অনেক হার্ড টাইম কাটিয়েছি। আমার মনে হয় ঠিক এই সময়ের কথা, তখনতো বাসায়ই ছিলাম। বাসার ভিতরেই আমি জিম আর রানিংটা জোরেসোরে করতে শুরু করেছিলাম। শুধু তাই নয়। আমি নিজেকে ঘসেমেজে তৈরির জন্য যা যা দরকার মনে করেছি, তার সবকিছুই করার চেষ্টা ছিল। আমার লাইফস্টাইল পাল্টে ফেলা থেকে শুরু মাইন্ড ট্রেনারের কাছ থেকে মাইন্ড ট্রেনিং, ফিটনেস ট্রেনিং- স্টার্ট করলাম। এখনো তাই করি।

কিন্তু বাসায় ফিজিক্যাল ট্রেনিং করতে পারলেও বোলিং করার অপশন তো আর ছিল না। তখন দেখা যেত, খালেদ মাহমুদ সুজন স্যার, মাহবুল জ্যাকি স্যার আর ওটিস গিবসন স্যারের কাছে আমার বোলিং ভিডিও পাঠাতাম। তারা ওই ভিডিওগুলো দেখে টিপস দিতেন। সুজন স্যার (খালেদ মাহমুদ সুজন) আর জ্যাকি স্যারকে (বিসিবি বোলিং কোচ মাহবুব জ্যাকি) বোলিং ভিডিও পাঠানোর কারণ হলো তারা দু’জনই আমাকে ছোট থেকেই চেনেন। জানেন।

Taskin

সুজন স্যার তো আমাকে একদম ছোট থেকেই চেনেন। আমাকে সর্বপ্রথম ছোটবেলায় টপ লেভেলে খেলার সুযোগও করে দিয়েছেন। আর জ্যাকি স্যারও আমার বিসিবি অনূর্ধ্ব-১৫ দলের পেস বোলিং কোচ ছিলেন। পেস ফাউন্ডেশনেরও কোচ ছিলেন। তিনিও আমাকে ছোটবেলা থেকেই চেনেন। জানেন।

আমি আসলে তখন সবাইকে নক করেছি। এমনকি বাবুল স্যারকেও (মিজানুর রহমান বাবুল), কারণ আমার বেড়ে ওঠা তাদের চোখের সামনেই। তাই তারা আমাকে খুব কাছ দেখে দেখেছেন, আমার বোলিং সম্পর্কে তাদের খুব ধারণা আছে। মোটকথা, তাদের সবারই আমার বোলিং সম্পর্কে ভাল জানা।

তাই যখন ইনজুরি আর অফ ফর্ম মিলে আমার খারাপ সময় যাচ্ছিল, এ জিনিসগুলো ওভারকাম করার জন্যই আমার ছোট বেলার কোচদের সাথে যোগাযোগ করি এবং ব্যক্তিগতভাবে আলাদা আলাদা ট্রেনার, মাইন্ড ট্রেনার, নিওট্রিশিয়ান আলাদা আলাদা নিয়োগ দেই এবং তারা আমার উত্তরণে সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন। তারা আমার আপন ভাইয়ের মত কাজ করেছেন। ওই দুঃসময়ে তারা আমাকে প্রচুর সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। এখনও করছেন। ওই সময় ফিটনেস ডেভেলপ করার চেষ্টা করেছি। সেই সাথে বোলিংটা নিয়েও ভাল করার কাজ করেছি।

জাগো নিউজ : জাতীয় দলের পেস বোলিং কোচ ওটিস গিবসনের কোন ভূমিকা ছিল না, তিনি কী করেছেন?

তাসকিন : ওটিস গিবসন আমাকে পেয়েছেন জাতীয় দলে ফেরার পরে। তিনিও ছোট ছোট বোলিং ড্রিলগুলো আমাকে করাচ্ছেন। সেগুলোও কাজ দিয়েছে। অনেস্টলি হেল্প করছে।

আসলে দিন শেষে সব বোলিং কোচের ব্যাসিক থিওরিগুলো এক। সেটা আমাদের দেশের কোচই বলেন কিংবা ফরেন কোচ- সবার থিওরি কিন্তু এক। তারপরও গিবসন যেহেতু ন্যাশনাল টিমের পেস বোলিং কোচ, তার থিওরিই আমার কাছে প্রধান ও অগ্রাধিকার পায়। তার অ্যাডভাইজগুলো এনজয় করছি।

তবে একটা বড় কথা কি, আমার বোলিংয়ের কোন বিশেষ মৌলিক জায়গায় তিনি হাত দেননি। কোনো বড় ধরনের বা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনেননি। অ্যাকশন, রানআপ, ফলো থ্রু কোনোটায়ই তিনি হাত দেননি। শুধু ট্যাকটিক্যাল কিছু ইস্যুতে হাত দিয়েছেন। কিভাবে বাড়তি সুইং করানো যায়, আর লাইন-লেন্থ ভাল করা যায়? এগুলো নিয়েই কাজ করছেন। টিপস দিচ্ছেন।

জাগো নিউজ : তাহলে কী দাড়ালো? যদি বলা হয় আসলে তাসকিনের নতুন ফেরার পিছনের গল্পর নায়ক তবে তাসকিন নিজেই? নিজ গরজ ও খরচে ট্রেনার, মাইন্ড ট্রেনার আর পুষ্টিবিদ নিয়োগ এবং বিভিন্ন কোচের পরামর্শ, সহযোগিতার চেয়েও কী তাহলে তাসকিনের নিজের চেষ্টা, পরিশ্রম, একাগ্রতা, দৃঢ় সংকল্প আর ভাল করার তাগিদটাই ছিল মূল? এমন বলাটা কী বাড়াবাড়ি হবে?

তাসকিন : নাহ মোটেই বাড়াবাড়ি হবেনা। এটাই সত্য। আমি সেই এক বছর আগে যে কাজ স্টার্ট করেছি, এখনো ঠিক সেই কাজই করছি। কারণ আমার স্বপ্ন, আশা হলো অনেক বড় প্লেয়ার হওয়া। বিশ্বমানের পেসার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।

Taskin

জাগো নিউজ : আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী? নিজেকে কোথায় দেখতে চান?

তাসকিন : আমার লক্ষ্য অনেক বড়। আমি অনেক ভাল করতে চাই। ওপরে যেতে চাই। সে অর্থে ধরলে এখনো আমি কিছুই করতে পারিনি। সবে একটা দুটি সিরিজ ভাল হওয়া মানেই যে ভাল কিছু করে ফেলেছি- এমন নয়। এখনো অনেকদুর যেতে হবে। বড় চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে।

জাগো নিউজ : শ্রীলঙ্কায় চামিন্দা ভাসকে খুব কাছে পেয়েছিলেন, তার সাথে কোন আলাপ হয়েছে কিংবা কোন পরামর্শ কী নিতে পেরেছেন?

তাসকিন : আমার ইচ্ছে ছিল। আমি এটা ভেবেওছিলাম। যোগাযোগও করেছিলাম। তবে চামিন্দা ভাস সময় বের করতে পারেননি।

জাগো নিউজ : শ্রীলঙ্কায় যদিও শেষ টেস্ট হেরে গেছেন, তারপরও নিজের বোালিং সম্পর্কে কিছু বলুন, আপনি কি সন্তুষ্ট?

তাসকিন : আল্লাহর রহমতে আমি সন্তুষ্ট। ডেফিনেটলি স্যাটিসফাইড। ওই উইকেটে ফাস্ট বোলারদের কোন হেল্পই ছিল না। ফ্ল্যা ট্র্যাক ছিল। এর মধ্যেও আলহামদুলিল্লাহ আমি অনেক ওভার বল করার সুযোগ পেয়েছি। লং স্পেলেও বোলিং করতে পেরেছি। তৃতীয় দিনও মন খুলে বোলিং করতে পেরেছি।

উইকেট অনেক সময় পাব, অনেক সময় পাব না- বাট ভাল বল করতে পারাটাই আসল কথা। তারপরও আমি সন্তুষ্ট। আমি দুটি কারণে খুশি। প্রথমতঃ বেটার ফিটনেস আর বেটার বোলিং কন্ট্রোল- এ দুটি বিষয়ই আমার ভাল লাগার জায়গা। তবে এখন নেক্সট লেভেলে যাওয়াই মূল লক্ষ্য। আরও কাজ করতে হবে।

জাগো নিউজ : দেশের উইকেটে পেসারদের জন্য কিছুই থাকে না। ৫-৭ ওভার পরই স্পিনাররা অ্যাকশনে চলে আসেন। পেস বোলাররা বোলিংয়ের সুযোগই কম পান। বোলিং উন্নত করার জন্য দেশের উইকেট উন্নত হবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন কি না?

তাসকিন : আসলে স্পোর্টিং উইকেটই চাই। ওয়েদার আর অন্যান্য কারণে হয়ত তা হয়ে ওঠে না। তবে আমি চাইবো যাতে ডমিস্টিক ক্রিকেটে যেন আর একটু বেটার উইকেট থাকে। তাহলে শুধু বোলারদেরই না। বোলার-ব্যাটসম্যান সবার জন্যই ভাল হবে।

জাগো নিউজ- শ্রীলঙ্কার সাথে ওয়ানডে সিরিজ দরজায় কড়া নাড়ছে। তারপর দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে জমজমাট আসর প্রিমিয়ার লিগ হবে। টেস্ট সিরিজে এমন আালোর ঝলকানির পর তাসকিনের আগামির টার্গেট কী?

তাসকিন : আসলে শ্রীলঙ্কার সিরিজের আগেই তো নিউজিল্যান্ডে ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি খেলে গিয়েছিলাম। আমার জন্য সব সিরিজই নিজেকে মেলে ধরার এবং পেস বোলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার একটা বড় সুযোগ। নতুন সুযোগ। নতুন সিরিজ। আমি চাইবো নতুন করে আবার শুরু করতে।

যেটা হয়ে গেছে, সেটা শেষ। অতীত। পরের সিরিজে আবার নতুন করে ভাল করাই প্রধান লক্ষ্য। সেরাটা দিয়ে দেশের হয়ে খেলতে পারি এবং বাংলাদেশের ম্যাচ জেতানোয় আমার অবদান থাকে- সেটা আমার সব সময়ই লক্ষ্য থাকে। ইচ্ছেও। বাকি সব আল্লাহর ইচ্ছে। বোলিং কন্ট্রোল আর রাইট প্র্যাকটিস, হার্ড ওয়ার্ক, লাইফস্টাইল ঠিক রাখা- এগুলোই শুধু আমার হাতে। বাকি সব মানে সাফল্য-ব্যর্থতা মহান সৃষ্টিকর্তার হাতে। আমার লক্ষ্য হলো সর্বশেষ সিরিজ থেকে ইম্প্রুভ করা। দলের সাফল্যে কার্যকর অবদান রাখা।

জাগো নিউজ : আর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ সম্পর্কে কিছু বলুন? আপনার মোহামেডান টিম কেমন?

তাসকিন : হ্যাঁ, টিম ভাল। কিছু এক্সাইটিং প্লেয়ার আছে। পেস বোালিংটাও দারুণ। রনি (আবু হায়দার), রাহি (আবু জায়েদ) আর আমি আছি।

জাগো নিউজ : সাকিব আল হাসানের খেলার সম্ভাবনাও তো খুব প্রবল।

তাসকিন : ওহহ, তাহলে তো খুব ভাল।

এআরবি/আইএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]