‘ছোট বেলায় ১০-২০ টাকা সালামি পাওয়ার আনন্দই ছিল আলাদা’

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৬:৩৬ পিএম, ১৪ মে ২০২১ | আপডেট: ০৮:৫৬ পিএম, ১৪ মে ২০২১

মাঝে অন্ধকার পথে পা বাড়ালেও আসল সত্য হলো মোহাম্মদ আশরাফুল ক্রিকেট অন্তঃপ্রাণ মানুষ। সেই ছেলেবেলা থেকেই ক্রিকেট ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। এখনো তার জীবনে ক্রিকেটই শেষ কথা। ক্রিকেটই তার প্রথম ভালবাসা।

যে বয়সে ছেলেরা সম বয়সীদের সাথে ঈদে হই হুল্লোড় করে কাটায়, এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করে- সেই সময়ে মোহাম্মদ আশরাফুলের সঙ্গী ব্যাট আর বল। মাদারটেকে খালার বাসার গলিতে বিকেল হলেই কর্কের বলে ব্যাট হাতে দেখা যেত আশরাফুলকে। ঈদের দিনেও ক্রিকেট খেলা ছিল তার সবচেয়ে পছন্দের।

কেমন ছিল আশরাফুলের শৈশব, কৈশোরের ঈদ? খেলোয়াড়ী জীবনে কবে প্রথম দেশের বাইরে পরিবার পরিজন, মা-বাবা, ভাই-বোন ছাড়া ঈদ করেছেন? জীবনের সবচেয়ে সুখের আর কষ্টের ঈদ কোনটি?

জাগো নিউজের সাথে আন্তরিক আলাপে সে সব স্মৃতিচারণ করেছেন অভিষেক টেস্টের কনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান। আসুন শুনি সেই একান্ত কথোপকোথন-

জাগো নিউজ : ছোট বেলার ঈদটা কেমন ছিল? কী করতেন ঈদের দিন?

আশরাফুল : ছেলে বেলার ঈদ আসলে প্রাণ চাঞ্চল্যে ভরা। ছোট বেলার বন্ধুদের নিয়ে ঘোরাঘুরি। হইচই। ছুটোছুটি। আর মুরুব্বিদের ঈদের সালাম করে সালামি পাওয়ার আনন্দটাই ছিল অন্যরকম। এখনো মনে আছে মুরুব্বীদের সালাম করলে ১০ টাকা ২০ টাকা করে পেতাম। সেই টাকা একসঙ্গে করে বন্ধুরা মিলে শিশু পার্কে যেতাম। বলতে পারেন এটা ছিল আমার শৈশবের ঈদ। একটু বড় হতে মানে কৈশোরে পা রাখতেই বদলে যায় আমার ঈদ আনন্দ তথা ঈদের দিনের কার্যক্রম।

জাগো নিউজ : সেটা কেমন?

আশরাফুল : বয়স ১৩ হতেই ক্রিকেট হয়ে পড়ে আমার ভাললাগা, ভালবাসা আর সার্বক্ষনিক সঙ্গী। আমার চিন্তা-চেতনা আর স্বত্তায় মিশে যায় ক্রিকেট। তখন ঈদের দিন নামাজের পর ক্রিকেট খেলাই হয়ে ওঠে আমার বিনোদন। ঈদের দিন আমরা বিশেষ করে আমি ক্রিকেট খেলতাম।

আমার খালাতো ভাইয়া খেলতেন ক্রিকেট, তাদের বাসায় ঢোকার গলিতে। আমিও সেখানে ঈদের দিন গিয়ে ক্রিকেট খেলতাম। মাদারটেক নতুন পাড়ায় ছিল খালার বাসা। বাসায় ঢোকার গলিটি ছিল খুব সরু। ৪ ফুট চওড়া সেই গলিতে খুব স্বাভাবিকভাবে গাড়ি ঢুকতো না। আমরা ক্রিকেট খেলতাম।

আমরা কর্কের বল দিয়ে খেলতাম। তখন ক্রিকেট বলের আগে অনেকেই কর্কের বল দিয়ে খেলতেন। কর্ক দিয়ে তৈরি ওই বল খুব শক্ত ছিল। আমি খুব ছোট বেলা থেকেই ওই কর্কের বলে খেলতাম। আমি ওই বল দিয়ে আমি রাস্তায় খেলতাম। রাস্তার পাকাটা খুব প্লেইন ছিল। যে কারণে বাউন্সটা খুব ঠিক থাকতো। বল একই উচ্চতায় ব্যাটে আসতো। তবে বেশ জোরে এবং পড়েই খুব দ্রুত চলে আসতো।

ওই ছোটবেলা থেকে কর্কের শক্ত বলে খেলে খেলেই আমার সাহস বেড়ে গিয়েছিল। এখন বুঝি রিফ্লেক্সটাও হয়েছিল শার্প। আমি খুব স্বচ্ছন্দেই কর্কের বলে ব্যাটিং করতাম। শুধু ঈদের দিনই নয়, প্রতিদিন বিকেলবেলা ওই রাস্তায় কর্কের বলে খেলাই আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়েছিল। রাস্তার আশপাশের বাসার জানালার কত কাঁচ যে আমার ব্যাটের আঘাতের বল লেগে ভেঙ্গেছে বলে শেষ করা যাবে না।

Ashraful

জাগো নিউজ : এমনিতে ঈদের দিনের কোন মজার স্মৃতি, কাপড়-চোপড় কেনার ঘটনা?

আশরাফুল : সত্যি বলতে কী, আমার কাছে ঈদ খুব স্পেশাল কিছু মনে হতো না। তাই খুব একটা বড় স্মৃতিতে নেই। আর কেনা কাটার কথা যদি বলেন, তাহলে বলবো আমার ছোট বেলায় মার্কেটে যাওয়া হতো খুব কম। বেশিরভাগ সময় বাবা আর ভাইয়া ঈদের নতুন কাপড় চোপড় নিয়ে আসতেন।

তবে তেমন একটা সুখ স্মৃতি না থাকলেও একটা দুঃখের স্মৃতি আছে। ছেলেবেলায় একবার আমার পা ভেঙ্গে গিয়েছিল, আমি ওই ভাঙ্গা পা নিয়েই রোজার ও কোরবানির ঈদ করেছিলাম। সেই ঘটনাটি খুব মনে পড়ে। আমি ক্লাস ফোরে পড়ি তখন। লুকোছুরি খেলতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে পা ভেঙ্গে ফেলেছিলাম। আসলে ঘুরেফিরে আবার বলি আমার শৈশব ও কৈশোরের ঈদের খুশি আর আনন্দ বলতে মুরুব্বিদের কাছ থেকে ওই ১০ টাকা-২০ টাকা সালামী পাওয়া। ওটাই মজা লাগতো।

জাগো নিউজ : প্রথম কবে পরিবার ছাড়া ঈদ করেছেন, মনে আছে?

আশরাফুল : হ্যাঁ খুব মনে আছে। আমি বাবা-মা, ভাই-বোন আত্মীয়-পরিজন ছাড়া প্রথম ঈদ করেছি খুব অল্প বয়সে। তখন আমার বয়স মোটে ১৫-১৬, ২০০০ সালে।

জাগো নিউজ : সেটা কোথায়? কোন আসরে?

আশরাফুল : ওটা ছিল যুব বিশ্বকাপ। আমরা শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলাম যুব বিশ্বকাপ খেলতে। হান্নান ভাই (হান্নান সরকার) ভাই ছিলেন ক্যাপ্টেন। রাজিন ভাই (রাজিন সালেহ), পেসার বিকাশ ভাই (অভিষেক টেস্ট খেলা বাঁহাতি পেসার) সহ আর অনেকে ছিলেন ওই দলে। এখনো মনে আছে জানুয়ারিতে রোজার ঈদ হয়েছিল। ঈদের দিন আমাদের প্র্যাকটিস ম্যাচ ছিল। আমরা ঈদের দিন নামাজ পড়ে প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলতে গিয়েছিলাম। কোচ ছিলেন দিপু স্যার (দিপু রায় চৌধুরী)। আমি ছিলাম দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। দেশের বাইরে প্রথম ঈদ। আর আমি খেলা পাগল। আমি পাড়ায় ঈদের দিন এমনিতেই ক্রিকেট খেলতাম। আর সেবার দেশের বাইরে প্রথম বাবা-মা, ভাই পরিবারসহ ঈদ করতে গিয়ে তত মন খারাপ হয়নি। শ্রীলঙ্কায় গিয়ে প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলতে পেরে ভালই লেগেছিল।

সেবার রোজার ঈদের পাশাপাশি কোরবানির ঈদও করেছিলাম দেশের বাইরে। কোরবানির ঈদের সময় দুর্জয় ভাই (নাঈমুর রহমান) এর নেতৃত্বে ‘এ’ দলের হয়ে মালয়েশিয়ায় যাই খেলতে। আমরা ঈদের দিন সকালের ফ্লাইটে মালয়েশিয়া যাই। এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় মসজিদে। ঈদের নামাজ পড়ার জন্য। সেখানে গিয়ে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়।

আমরা মসজিদে গিয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক বসে থেকেও দেখি জামাত আর শুরু হয় না। হুজুর খুতবা পড়ছেন। লোকজন আসছে আর নিজেরা যে যার মত নামাজ পড়ে চলে যাচ্ছে। আমরা অপেক্ষা করছিলাম এই বুঝি জামাত শুরু হবে। পরে দেখি আর জামাত হলোই না। পরে আমরা নিজেরা নামাজ পড়ে চলে যাই টিম হোটেলে। জামাত কী আগেই হয়ে গিয়েছিল কি না? বুঝিনি। আর আমিতো তখন বেশ ছোট। ঠিক বুঝিও নাই।

জাগো নিউজ : আপনার খেলোয়াড়ী জীবনে ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট খেলে পাওয়া অর্থ থেকে বাবা-মা, পরিবার-পরিজনদের জন্য ঈদের কেনাকাটা করার প্রথম অভিজ্ঞতা কী মনে আছে?

আশরাফুল : আমি আসলে সব সময়ই আমার আয়ের অর্থ বাসায় দিয়ে দেই। তাই নিজ হাতে কোন ঈদ শপিং করা হয়নি। বেশিরভাগ সময় ভাইয়াই ঈদের কেনাকাটা করতেন। আমার ক্লাব পেমেন্ট পাওয়া অর্থ রেখে দেয়া হতো। সেখান থেকেই ঈদ শপিং করা হতো।

জাগো নিউজ : আপনি কবে কোন ক্লাবের পক্ষে খেলে প্রথম পেমেন্ট পেয়েছিলেন, মনে আছে?

আশরাফুল : হ্যাঁ, অবশ্যই মনে আছে। সেটা ভুলি কী করে? ২০০০ সালে ঘটনা। আমি তখন সুর্যতরুণ ক্লাবে। সেবার আমি ২৫ হাজার টাকা পেয়েছিলাম। তবে একসঙ্গে নয়, ভেঙ্গে ভেঙ্গে পেমেন্ট করেছিল। আমি চাইনি। আমাকে ব্যাট-প্যাড ও গ্লাভস কেনার জন্য দেয়া হয়েছিল।

Ashraful

জাগো নিউজ : খেলোয়াড়ী জীবনে ঈদের কোনো ঘটনা সব থেকে মনে দাগ কেটে আছে?

আশরাফুল : হ্যাঁ আছে। ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে দেশের বাইরে করা ঈদটি আমার খেলোয়াড়ী জীবনের সবচেয়ে হতাশার, কষ্টের ও বেদনার ঈদ।

জাগো নিউজ : সেবারের স্মৃতিচারণ করবেন একটু?

আশরাফুল : দক্ষিণ আফ্রিকায় হওয়া ওই বিশ্বকাপে কোরবানীর ঈদের ঠিক আগের রাতে খেলা ছিল কানাডার সাথে। আমরা আইসিসির সহযোগি সদস্য কানাডার কাছে হেরে গিয়েছিলাম। ওই সময় আমাদের চেয়ে কানাডা বেশ দুর্বল ও কমজোরি দল। তাদের কাছে হার নেহায়েত অপ্রত্যাশিত। চরম হতাশার। আমার মনে হয় শুধু আমার কাছেই নয়, আমাদের পুরো দলের জন্য বাংলাদেশের মানুষের জন্য এর চেয়ে খারাপ ঈদ আর হতে পারে না।

আগের দিন কানাডার কাছে হারের পর প্রথম ঈদের নামাজ পড়তে পারিনি। মনে আছে মঞ্জু ভাই আর সুজন ভাই আর একজন- শুধু তিনজন গিয়েছিলেন ঈদের নামাজ পড়তে। আমি রুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে দেখি গাড়ি চলে গেছে। বাকিদের সাথে মনমরা হয়েছিলাম সারাদিন। দেশে আর বিদেশে সত্যি এমন নিরানন্দের ঈদ আর কখনো কাটেনি।

জাগো নিউজ : এখন ছেলেপুলে হবার পরও কী ঈদের শপিং করেন না?

আশরাফুল : হ্যাঁ, এখন করি। তবে বাচ্চাদের ড্রেসট্রেস আমার স্ত্রীই কেনে।

জাগো নিউজ : ঈদের দিনে এখন কিভাবে কাটে?

আশরাফুল : পরিবার-পরিজনের সাথে কাটাই। সবার সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করি। আর ঈদের পরদিন আমার কোচ ওয়াহিদ স্যারের বাসায় যাই। সেটা আজ থেকে নয়। সেই ১৯৯৭ সাল থেকে আমরা খেলোয়াড় বন্ধুরা দলবেঁধে গুরু ওয়াহিদ স্যারের বাসায় যাই। তার সাথে সময় কাটাই।

এআরবি/আইএইচএস/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]