‘আরব আমিরাত পৌঁছে যখন দেখলাম ঈদ শেষ, দুঃখে কান্না চলে এসেছিল’

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৬:৪৫ পিএম, ১৪ মে ২০২১ | আপডেট: ০৯:১২ পিএম, ১৪ মে ২০২১

এখনকার ঈদ মানেই দায়িত্ব এবং কর্তব্য; কিন্তু ছেলেবেলার ঈদ ছিল পুরোটাই উৎসব-আনন্দে ভরা। তখন কোন দায়-দায়িত্ব কিংবা কর্তব্য বলতে কিছুই ছিল না। বন্ধুদের সাথে ঈদের দিন মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ানোই ছিল মূল লক্ষ্য।

জাগো নিউজের সাথে ছেলে বেলার ও এখনকার ঈদের তুলনা করতে গিয়ে এমন ব্যাখ্যাই দিয়েছেন আকরাম খান। বর্তমান বোর্ড পরিচালক এবং জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান জাগো নিউজের সাথে একান্ত আলাপে ছোট বেলার ঈদ, খেলোয়াড়ী জীবনে প্রথম পরিবার ছাড়া দেশের বাইরে ঈদ করা এবং এখনকার ঈদ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সেখানে অনেক প্রসঙ্গই উঠে এসেছে।

এর মধ্যে দুটি ঘটনা আকরাম খান কখনো ভুলবেন না। যার একটি হলো পরিবার-পরিজন ছাড়া প্রথম জাতীয় দলের সাথে দেশের বাইরে ঈদ করার ঘটনা। আকরাম খানের ভাষায়, সেটা ছিল আমার জীবনের এক কষ্টের দিন।

Akram Khan

সেই দেশের বাইরে প্রথম ঈদ করার অভিজ্ঞতা বর্ননা করতে গিয়ে আকরাম স্বীকার করেন, মনের দুঃখে তার কান্না চলে এসেছিল। আকরাম খান স্মৃতিচারণ করেন এভাবে, ‘সম্ভবত ৯০ সালে শারজায় দক্ষিণ এশিয়ান ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে গিয়েছিলাম আমরা। আমি ওই দলের অন্যতম কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে ছিলাম।’

‘সেবার আমি প্রথম পরিবার ছাড়া প্রথম ঈদ করেছিলাম। সত্যি বলতে দ্বিধা নেই, এখনকার ঈদ হলো কর্তব্যময়। এখন ঈদ আসলেই স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন সবার কথা মাথায় রাখতে হয়। পরিবার-পরিজনের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ হয়েছে জাগ্রত। সবার প্রতিই কর্তব্যবোধ থেকে কিছু না কিছু করার চিন্তা মাথায় আসে। করতেও হয়। করার চেষ্টাও থাকে।’

‘কিন্তু আমি যে সময়ের কথা বলছি, সেটা ঠিক ৩১ বছর আগে আমি একদম তরুণ, আমার কাছে তখন ঈদ মানেই আনন্দ, উৎসব। এখনকার মত কোন দায়িত্ব কর্তব্যবোধ জাগেনি তখন। নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকার সময় ছিল সেটা। বলতে পারেন নিজে এবং সমবয়সী ও বন্ধুদের সাথে ঈদের আনন্দ উপভোগ করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। সেই সময়ে আমি প্রথমবার ঈদের জাতীয় দলের সাথে খেলতে আরব আমিরাত গিয়েছিলাম, সেটা খুব মনে আছে। কারণ আমার খুবই মন খারাপ ছিল। এখনো মনে আছে আমাদের ফ্লাইট ছিল পাকিস্তান হয়ে আরব আমিরাত। আমরা যখন ঢাকা ছাড়ি তারপর দিন ছিল আমাদের বাংলাদেশে ঈদ। আর যেদিন শারজা গিয়ে পৌঁছেছি, সেদিন আরব আমিরাতে ঈদ। আমরা পাকিস্তানে যাত্রা বিরতির পর কানেক্টিং ফ্লাইটে আরব আমিরাতে যখন গিয়ে পৌঁছালাম, তখন স্থানীয় সময় সন্ধ্যা। মানে আমাদের দেশের ঈদও গেল, আরব আমিাতে গিয়েও ঈদের দিন পেলাম না। কি যে খারাপ লেগেছিল বলে বোঝাতে পারবো না। সত্যি বলতে কি আমার দুঃখে কান্না চলে এসেছিল।’

Akram Khan

ছোট বেলার ঈদের স্মৃতিচারণ করে আকরাম বলেন, ‘আমরা আসলে ছেলেবেলার ঈদটা অনেক উপভোগ করতাম। বন্ধুরা মিলে আগে থেকে প্ল্যান করতাম কে কিভাবে ঈদ করবো। কেমন কাপড়-চোপড় কিনবো? কী বানাবো? কার কী ডিজাইন থাকবে? এসব নিয়ে ১৫ দিন ২০ দিন আগে থেকেই চিন্তা ভাবনা থাকতো। ঈদের দিন মুরুব্বিদের কাছ থেকে ঈদের বখশিস, ঈদি পেতাম, তা দিয়ে এখানে সেখানে ঘোরাঘুরি করতে যেতাম।’

এর বাইরে ঢাকা লিগে প্রথমবার খেলে পাওয়া পারিশ্রমিকের একটা অংশ ভাই-বোনদের জন্য গিফট কেনায় ব্যয় করার সুখ স্মৃতিও এখনো জাগ্রত আকরাম খানের।

‘প্রথমবার ক্লাব ক্রিকেট খেলে পাওয়া অর্থ দিয়ে আম্মা, বোন ও ভাইদের গিফট কিনে দিয়েছিলাম, সেটা খুব মনে আছে। আমার মনে আছে আমি ১৯৮৪-৮৫ মৌসুমে রেলওয়ের হয়ে ৬ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলাম। এর মধ্যে ২ হাজার আমার ক্রিকেট গিয়ার্স, ব্যাট, প্যাড, গ্লাভস কিনতেই চলে গিয়েছিল। বাকি টাকা থেকে পরিবারের জন্য গিফট কিনেছিলাম। খুব ভাল লেগেছিল।’

আকরাম যোগ করেন, ‘আমরা যখন ক্লাব ক্রিকেট খেলতাম, তখন পেমেন্ট অনেক কম ছিল। এখনকার মত বিপিএল আর প্রিমিয়ার লিগে ক্রিকেটারদের বাজার এত রমরমা ছিল না। আমরাতো আর এখনকার ক্রিকেটারদের মত এত প্রাচুর্য্য আর অর্থ-বিত্তর মধ্যে বেড়ে উঠিনি।’

‘এরপর আবাহনীতে গিয়ে অনেক বড় অ্যামাউন্ট অর্থ পেয়েছি। খুব স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের জন্য ভাল গিফটও কিনে দিতে পেরেছি। ঠিক মনে নেই সেটা ঈদের সময় ছিল কি না, তবে আবাহনী থেকে যেবার আমি প্রথম বড় অংকের টাকা পাই সেবার আমার আম্মার জন্য একটা স্বর্ণের উপহার কিনে দিয়েছিলাম, সেটা সারা জীবন আমার মনে আছে।’

‘এখনকার ঈদ মানেই হলো দায়িত্ব-কর্তব্য। এখন দায়িত্ব অনেক বেশি। স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন, আতœীয় স্বজন ) কম বেশী সবার জন্যই কিছু না কিছু গিফট কিনতে হয়। তার মাঝেই আছে অনেক বড় প্রশান্তি। ভাললাগা। মনে হয় সবার জন্য কিছু করতে পেরেছি। সেটাও অনেক ভাল লাগার। ও তৃপ্তির। মহান আল্লাহ তা’আলার কাছে কৃতজ্ঞ আমি, যে আমাকে সেই দায়িত্ব পালনের তৌফিক দিয়েছেন। তার জন্য হাজার শোকর।’

এআরবি/আইএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]