‘বুড়ো বাঘ’ আশরাফুল দেখালেন এখনও থাবা ভোলেননি

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১০:৫৪ পিএম, ২৪ জুন ২০২১

ত্রিশ বছরের ক্রীড়া সাংবাদিকতা জীবন, তার আগে অন্তত ১০ বছর দর্শক-সমর্থকের ভূমিকায় ফুটবল, হকির পাশাপাশি ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট দেখা তিন যুগের বেশি সময়ে অন্তত শ'খানেক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই দেখার সুযোগ মিলেছে। যার সব কয়টার স্মৃতি মনে নেই। তবে কিছৃু কিছু খেলা, কয়েকটি জমজমাট ব্যাট-বলের লড়াই কখনও ভোলার মত নয়।

সে সব খেলা মনের স্মৃতির আয়নায় জ্বলজ্বল করছে। বেশ কিছুদিন পর সেরকম এক লড়াই দেখার সৌভাগ্য হলো। বৃহস্পতিবার আবাহনী আর শেখ জামালের ম্যাচটি সত্যি আমার দেখা গত কয়েক বছরের মধ্যে স্মরণীয় ম্যাচ। এমন উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই দেখে ভাল লেগেছে।

স্কোরলাইনটা বড় ছিল, ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ভাল ছিল। লিটন দাস তার মান দেখিয়েছেন।সাময়িক খারাপ সময় কাটালেও তিনি যে অনেক মেধাবী, প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান- তা আজ আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন লিটন। আবার জানান দিলেন, ফর্ম সাময়িক তবে ক্লাস চিরস্থায়ী।

jagonews24

এর বাইরে মোহাম্মদ আশরাফুলের ব্যাটিং দেখে ফিরে গেলাম সেই পুরোনো দিনে। আসলে মেধা-প্রজ্ঞায় আশরাফুল যে অনন্য, তার হাতে যে হরেক শট- তা দীর্ঘদিন পর আবার দেখলাম। উইকেটের সামনে ড্রাইভ, তুলে মারা শট, কাট, পুল, স্কুপ আর রিভার্স শট এখনও কত পারফেক্ট!

অবাক বিস্ময়ে তাই দেখলাম আর মনে মনে আফসোস করলাম, কী অসাধারণ প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান এই আশরাফুল। কিন্তু হায়! নিজেই নিজের প্রতিভার ওপর অবিচার করেছেন। অন্ধকার পথে পা না বাড়ালে আজও নির্ঘাত জাতীয় দলকে সার্ভিস দিতে পারতেন।

দেশের ক্রিকেটে তার এমন একটি ইনিংসের কথা খুব মনে পড়ল আজ। সেটা ২০০৬-২০০৭ মৌসুমের ঘটনা। সেবার ঢাকাই ক্লাব ক্রিকেটে প্রথম টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট হয়েছিল। আশরাফুল তখন সোনারগাঁ ক্রিকেটার্সে খেলেন। মোহামেডানের সঙ্গে ধানমন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দারুণ এক ম্যাচ হয়েছিল।

যে খেলায় ১১ ছক্কা হাঁকানোসহ প্রায় ১৭৫-১৮০ স্টাইকরেটে ঝড়ো শতক উপহার দিয়েছিলেন মোহামেডানের ওপেনার জুনায়েদ সিদ্দিকী। খুব সম্ভবত ১৩০+ রানের ইনিংস খেলে সোনারগাঁ ক্রিকেটার্সের বিপক্ষে মোহামেডানকে রান পাহাড় গড়ে দিয়েছিলেন বাঁহাতি জুনায়েদ।

জবাবে সোনারগাঁ ক্রিকেটার্স এর পক্ষে দারুণ সেঞ্চুরি করেছিলেন আশরাফুল। পাল্টা জবাব যাকে বলে। মোহামেডানের বোলারদের এক মুহূর্তের জন্য স্বস্তি না দিয়ে ইচ্ছেমত ব্যাটিং করেছিলেন। একসময় মনে হচ্ছিল মোহামেডানের রান পাহাড় টপকে যাবে সোনারগাঁ। মোহামেডান শিবিরে সে কী উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা!

jagonews24

ঢাকাই ক্লাব ক্রিকেটে মানে কুড়ি ওভারের লিগ ও টুর্নামেন্টে (বিপিএলে নয়) ঐ ম্যাচের চেয়ে ব্যাট ও বলের অমন আকর্ষণীয়, তীব্র ও জমজমাট লড়াই হয়েছে বলে আমার জানা নেই, আমি দেখিনি। সবচেয়ে বড় কথা সেবার পঞ্চাশ ওভারের প্রিমিয়ার লিগের আগে দিয়ে ২০ ওভারের লিগ বা টুর্নামেন্ট হয়েছিল ওয়ার্মআপ আসর হিসেবে।

তার এক ম্যাচে দুই দলের দুজন ব্যাটসম্যানের সেঞ্চুরি! সেটাই দেখেছিলাম প্রথম। ঢাকার ক্লাব পর্যায়ের টি-টোয়েন্টি আসরে এক ম্যাচে দু দলের দুই ব্যাটসম্যানের শতরানের নজিরও সম্ভবত নেই। তাই ধানমন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মোহামেডান আর সোনারগাঁ ক্রিকেটার্সের সেই ম্যাচ আর জুনায়েদ সিদ্দিকী ও আশরাফুলের শতরান স্মৃতিপটে আকা আছে এখনও।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য আশরাফুলের সে শতক কাজে দেয়নি। শতরানের পর আশরাফুল আউট হয়ে যান। মোহামেডান জিতে যায় অল্প কয়েক রানে। জুনায়েদের ১১ ছক্কা আর আশরাফুলের সাহসী বীরের মত বুক চিতানো উইলোবাজি এখনও অনেকের মনেই গেঁথে আছে, হয়তো থাকবেও।

ফর্মের চূড়ায় থেকে আশরাফুল তখন পারেননি সেঞ্চুুরি করেও টি-টোয়েন্টি ম্যাচে মোহামেডানের রান পাহাড় টপকাতে। আর ১৫ বছর পর শেরে বাংলায় পড়ন্ত বয়সে শতরান না করেও আশরাফুল ঠিক দল জিতিয়ে বিজয়ীর বেশে ফিরেছেন সাজঘরে।

আজ ক্যারিয়ার সায়াহ্নে আশরাফুলকে আবাহনীর বিপক্ষে ম্যাচ শেষ করে সাজঘরে আসতে দেখে বারবার সেই প্রবাদটি মনে পড়ল, ‘বাঘ বুড়ো হলেও থাবা ভোলে না।’

পাশাপাশি আরও কয়েকটি ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দেখেও হলেম বিমোহিত। সোহানকে দেখে খুব ভাল লাগল। তাকে ভাল মত ব্যবহার করা গেলে জাতীয় দলের অনেক বড় সম্পদ ও শক্তি হতে পারেন এ সাহসী যোদ্ধা। তিনিই এ সময়ের সেরা ফিনিশার। পেস ও স্পিন দুই বোলিংয়ের বিপক্ষে বিগ হিট নেয়ার দারুণ ক্ষমতা আছে এ উইকেটকিপার ব্যাটসম্যানের। পাশাপাশি ইম্প্রোভাইজ করার ক্ষমতাও প্রচুর।

জিয়াউর রহমান আরও একবার প্রমাণ দিলেন বিগ হিটার সবাই হতে পারে না। শুধু টেকনিক আর বেসিক ভাল থাকলেই উড়িয়ে মারা যায় না। আরও কিছু লাগে- সাহস, পাওয়ার খুব জরুরি। সাথে নাসিরও দেখিয়ে দিলেন, এখনও ফুরিয়ে যাইনি আমি। একটু পরিচর্যা হলে আবার হয়তো সেই চেনা নাসিরের দেখা মিলতেও পারে।

jagonews24

এর বাইরে আর একটি বিষয় দেখলাম, বুঝলাম ও অনুভব করলাম। তা হলো অভিজ্ঞতা একটি বিরাট সম্পদ। বিশেষ করে কঠিন ও জটিল পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞতা অনেক কাজে দেয়।

সাইফউদ্দীন, তানজিম সাকিব আর মেহেদি রানার বিপক্ষে আশরাফুল, নাসির, সোহান ও জিয়ার সাফল্যের বড় কারণ অভিজ্ঞতা। ঐ তিন পেসারের বলে বৈচিত্র আছে। তারা সাধ্যমত চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু সিনিয়রদের অভিজ্ঞতার সাথে কুলিয়ে উঠতে পারেননি।

আজকের লড়াইয়ে আবাহনীর বিপক্ষে শেখ জামালের জয় শুধু আশরাফুল-সোহানদের জয় নয়, অনভিজ্ঞতা বা স্বল্প অভিজ্ঞতার বিপক্ষে বয়োজেষ্ঠ আর অভিজ্ঞদের জয়।

এআরবি/ইএ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]