ফাওয়াদ আলমের ভূমিকায় রিয়াদ, হাসান আলি হবেন কে?

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৬:৫৭ পিএম, ০৮ জুলাই ২০২১

টি-টোয়েন্টির মারমার কাটকাট রূপ আর চাকচিক্য দেখে যারা টেস্ট ক্রিকেট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তারা ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য্যটাই উপভোগ করা থেকে দুরে।

ক্রিকেটের মধুর সৌন্দর্য্যই টেস্ট। টেস্টেই ক্রিকেটের সব সৌন্দর্য্য, গুণাগুন বিদ্যমান। একটা ম্যাচ কত বর্ণিল হতে পারে, এর মধ্যে কতরকম ওঠা-নামার গল্প বিরাজমান, হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে তার আরেকবার প্রমাণ হলো।

গতকাল ৭ জুলাই ঠিক এই সময় টিম বাংলাদেশের কী ‘ছ্যাড়াব্যাড়া’ অবস্থা! হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে আটজন স্বীকৃত ব্যাটসম্যান নিয়ে টস জিতে প্রথম ব্যাটিংয়ে নেমে লাঞ্চের আগেই মুমিনুল বাহিনীর স্কোর ছিল ৩ উইকেট ৭০।

লাঞ্চ আর চা বিরতির মাঝখানের সময়টায় বিপদ আরও ঘনিভূত হলো। এক সময় ১০৮ রানে খোয়া গেল ৫ উইকেট। ৮ রানে সাজঘরে ফেরা সাইফ হাসান, নাজমুল হাসান শান্তর সঙ্গী হয়ে ব্যর্থতার মিছিলে শরিক হয়েছিলেন ওপেনার সাদমান, নির্ভরতার প্রতীক মুশফিক আর চালিকাশক্তি সাকিব।

সেখান থেকে প্রথমে অধিনায়ক মুমিনুল, পরে লিটন দাস আর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের হাত ধরে ঘুরে দাঁড়ানো এবং ৮ উইকেটে ২৯৪ রানে প্রথম দিন শেষ করা। আবার টেস্ট দলে জায়গা পেয়েই হাফ সেঞ্চুরি উপহার দেয়া মাহমুদউল্লাহর সাথে ক্রিজে ছিলেন পেসার তাসকিন।
জিম্বাবুইয়ানরা দ্বিতীয় নতুন বল নিয়ে নিলো। এখান থেকে আর কতদুর যাবে বাংলাদেশ? বৃহস্পতিবার সকালে বড়জোর বিশ-তিরিশ মিনিট কিংবা হয় প্রথম ঘণ্টা? ৩২০-৩২৫ রানেই শেষ হয়ে যাবে টাইগারদের ইনিংস!

অতিবড় টাইগার ভক্ত ও সমর্থকও যে এর বেশি ভাবেননি। কিন্তু তারা যা ভাবেননি, বাস্তবে সেই অভাবনীয় কাণ্ডটাই ঘটলো। পেসার ও ১০ নম্বর ব্যাটসম্যান তাসকিনকে নিয়ে অনেকদুর এগিয়ে গেলেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। এগিয়েই গেলেন না শুধু, ওই অবস্থা থেকে যতদুর যাওয়া সম্ভব ততদুর গেলেন দুজন।

৫৪ রানে নট আউট অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ সেঞ্চুরি করলেন। শতরানই নয়, তার টেস্ট ক্যারিয়ারের সবচেয়ে লম্বা ইনিংসটিই (১৫০ নটআউট) খেললেন রিয়াদ। আর তাসকিন ছাড়িয়ে গেলেন সব কল্পনাকেও।

এই টেস্টের আগে ক্যারিয়ারে এক ইনিংসে ৩৩ রানের বেশি করতে না পারা তাসকিন প্রথম ফিফটি হাঁকিয়ে বসলেন। শতরানের কাছাকাছিও চলে গিয়েছিলেন। ২৫ রানের জন্য পারেননি।

৭৫ রানে স্পিনার মিল্টন শুম্বার উইকেট সোজা বলে ক্রস ব্যাটে মারতে গিয়ে আউট না হলে হয়ত আবুল হাসান রাজুর পর দ্বিতীয় বাংলাদেশী ব্যাটসম্যান হিসেবে ১০ নম্বরে নেমে টেস্ট শতরানের দূর্লভ কৃতিত্বের অধিকারী হতেন তাসকিন।

নবম উইকেট জুটিতে হলো ১৯১ রানের পার্টনারশিপ। তাসকিনের টেস্ট শতক হাঁকানোর দিনে আরও একটি আফসোস তাড়া করছে বাংলাদেশ ভক্তদের। আর ৪ রান যোগ করতে পারলে নবম উইকেটে টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পার্টনারশিপের বিরল বিশ্বরেকর্ড এর স্রষ্টা হওয়ার কৃতিত্ব দেখাতে পারতেন রিয়াদ ও তাসকিন।

তা না হলেও নিজেদের নবম উইকেটের সর্বাধিক রানের পার্টনারশিপে আগের দিন প্রথম দুই সেশনে প্রায় ধ্বংস্তুপের কাছে চলে যাওয়া দলটিই আজ প্রথম সেশন কোন উইকেট না হারিয়ে এবং প্রায় চা-বিরতি পর্যন্ত (১৫ মিনিট আগে) উইকেটে কাটিয়ে থামলো ৪৬৮ রানে! ভাবা যায়।

কাল ছিল যা শুধুই কল্পনা। রাতটুকু পার হয়ে আজ সেটাই বাস্তব। আসলে এই হলো টেস্ট ক্রিকেট। এখানে কে কখন রাজা, কখন প্রজা- বলা দুষ্কর। এক সেশনেই বদলে যায় দৃশ্যপট। আগের সেশনে যা অলিক কল্পনা, পরের দু’ঘণ্টায় ঘটে তাই। হারারাতে যে তাই ঘটলো!

সকালের সেশনে রিয়াদ আর তাসকিনের ব্যাটিং দেখে অনেক ভাললাগার মাঝে খানিক অতৃপ্তি, আফসোস-অনুশোচনা টাইগার ভক্তদের। ইস! কাল শেষ বিকেলে লিটন দাস যদি ৯৫ রানের মাথায় ওই পুল শটটি না খেলতেন, তাহলে নির্ঘাত এখন আরও অনেক মজবুত অবস্থান থাকতো টিম বাংলাদেশের।

লিটন হয়ত দেড়শোর ঘরে থাকতেন এখন আর রিয়াদতো সেঞ্চুরি করেই ফেলেছেন। আরও পরে তাসকিসের এ ইনিংসটি যোগ হলে হয়ত সাড়ে পাঁশোর ঘরে পৌঁছে যেত স্কোর। তখন আর জয়ভিন্ন অন্য চিন্তা মাথায়ই ঢুকতো না।

এখনো কী অন্য চিন্তা করার অবকাশ আছে? বাংলাদেশ কী পারবে এই রান করেই জিম্বাবুয়ের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে? এমনটা ভেবে যারা সংশয়ে, তাদের জন্য আছে আশার খবর।

ব্রেন্ডন টেলরের তারুণ্য নির্ভর অনভিজ্ঞ দলকে ফলোঅনে ফেলতে পারলেই কিন্তু ম্যাচ জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হবে। সেটা যে হবে, তার একটি প্রামাণ্য দলিল দেই, শুনুন।

এই হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে এই দুই মাস আগে অর্থ্যাৎ গত মে মাসে ৪২৬ রান করেই ইনিংস ব্যবধানে জিতেছিল পাকিস্তান। জিম্বাবুয়ের ইনিংস গুঁড়িয়ে গিয়েছিল ১৭৬ ও ১৩৪ রানে। বাংলাদেশের মত পাকিস্তান ইনিংসেও শতরান ছিল মোটে একজনের। তিনি ফাওয়াদ আলম (১৪০)। কাকতালীয়ভাবে তিনিও মাহমুদউল্লাহর মতই ৩৫ উত্তীর্ণ।

দুই ইনিংসে একজন জিম্বাবুইয়ানও হাফ সেঞ্চুরি হাঁকাতে পারেননি। রয় কাইয়ার ৪৮’ই ছিল প্রথম ইনিংসের সর্বোচ্চ সংগ্রাহক। দ্বিতীয় ইনিংসে ওপেনার তারাইসাই মাসাকান্দা ৪৩ রানই ছিল সর্বোচ্চ। পাকিস্তানের ফাস্ট মিডিয়াম বোলার হাসান আলি (৪/৫৩ ও ৫/৩৬ = ৯ উইকেট) একাই পার্থক্য গড়ে দিয়েছিলেন।

তার সাথে প্রথম ইনিংসে ৪ উইকেট শিকারী ছিলেন দ্রুত গতির বোলার শাহীন আফ্রিদিও। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ফাওয়াদ আলমের ভূমিকা নিয়েছেন। এখন দেখার বিষয় বাংলাদেশের পক্ষে হাসান আলির কাজটি কে করেন?

কেউ এখন বল হাতে বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারলে হয়ত এই পুঁজিই হতে পারে জয়ের জন্য যথেষ্ঠ।

এআরবি/আইএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]