প্রিয় বঙ্গবন্ধুতে শেষবারের মতো এলেন ‘নিথর’ জালাল আহমেদ

বিশেষ সংবাদদাতা
বিশেষ সংবাদদাতা বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৯:০৬ পিএম, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১

এক সময় বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামই ছিল তার কর্মক্ষেত্র। সেই ৬০ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে এই মাঠই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় প্রাঙ্গণ। খেলেছেন প্রচুর। ধানমন্ডি, মোহামেডান, আবাহনী, সাধারণ বীমা আর কলাবাগানসহ আরও বেশকিছু ক্লাবের প্রশিক্ষক হিসেবেও দেশের ক্রীড়া কেন্দ্রে ছিল তার স্বদর্প পদচারণা।

দীর্ঘদিন পর আজ (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আবার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে এলেন জালাল আহমেদ চৌধুরী। তবে ক্রিকেটার, কোচ, ক্রিকেট বিশ্লেষক, সাংবাদিক কিংবা লেখকের ভূমিকায় নয়। তার প্রিয় ভূবন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার আবার জালাল আহমেদ এলেন প্রাণহীন নিথর দেহে, লাশবাহী গাড়িতে।

ক্রিকেটার, প্রশিক্ষক, ক্লাব সংগঠক, ফেডারেশন কর্তা, সাংবাদিকসহ ক্রীড়াঙ্গনের শতাধিক মানুষ চোখের জলে বিদায় দিলেন প্রিয় ‘জালাল ভাইকে।’

ভলিবল ফেডারেশন সম্পাদক আশিকুর রহমান মিকু, হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কোহিনুর রহমান এবং তার গাজী আশরাফ হোসেন লিপু, সহযোদ্ধা ওসমান খান ছুটে এসেছিলেন প্রিয় জালাল ভাইকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।

সত্তর দশকের মাঝামাঝি ধানমন্ডি ক্লাবের হয়ে ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করেছিলেন গাজী আশরাফ হোসেন লিপু, তখন জালাল আহমেদ চৌধুরী ছিলেন তার কোচ কাম প্লেয়ার। ওই সময়ের স্মৃতিচারণ করে জাতীয় দলের প্রথম ওয়ানডে ক্যাপ্টেন গাজী আশরাফ লিপু বলেন, ‘জালাল ভাই আমার অন্যরকম ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণা।’

ঢাকা লিগে নিজের শতরানের ঘটনা উল্লেখ করে লিপু বলেন, ‘আমি যখন ’৭৮ সালে ওয়ারির বিপক্ষে প্রথম সেঞ্চুরি করি, তখন জালাল ভাই ভারতের পাতিয়ালায় উচ্চতর প্রশিক্ষণে ছিলেন। পরদিন আমি বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে এসেছিলাম ঢাকা মোহামেডানের ফুটবল ম্যাচ দেখতে। সেখানে আমাকে কে যেন একটি খাম হাতে দিল। দেখি জালাল ভাই দিয়েছেন। সেখানে সেঞ্চুরির জন্য অনেক শুভেচ্ছা, অভিনন্দন আর শুভ কামনা জানানো লেখা। আর নগদ ১০০ টাকা। সেটা যে কত ভালো লাগার, বলে বোঝাতে পারবো না।’

Jalal ahmed Chowdury

প্রিয় জালাল ভাইয়ের বিয়োগে কাতর কোচ ওসমান খানও। বাংলাদেশ জাতীয় দলের নেপথ্য কারিগর হিসেবে জালাল আহমেদ চৌধুরীর সাথে অনেকটা সময় কাজ করেছেন ওসমান খানও। ’৯৭ এর আইসিসি ট্রফির প্রাথমিক ক্যাম্প পরিচালনায় ছিলেন জালাল আর ওসমান। জালাল ভাইকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান খানের অশ্রুস্বজল চোখের একটাই কথা, আমি আর জালাল ভাই একসঙ্গে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছি। জালাল ভাই চলে গেলেন। আমি একা হয়ে গেলাম।

বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বিকেল ৩টার পর প্রথম নামাজে জানাজার পর জালাল আহমেদের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার জন্মস্থান আজিমপুরে। আজিমপুরের ইরাকি মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জানাজা। তারপর আজিমপুর কবরস্থানে অন্তিম শয়ানে শায়িত হন দেশের ক্রিকেটের এ সব্যসাচী ব্যক্তিত্ব।

সেখানেও এসেছিলেন দেশের ক্রিকেটের অনেক পরিচিত মুখ। জালাল আহমেদ চৌধুরীর বন্ধু ও প্রায় একসঙ্গে খেলোয়াড়ি জীবন শুরু করা দেশবরেণ্য ক্রিকেটার জাহাঙ্গীর শাহ বাদশাহ, জালাল আহমেদের হাতের ছোঁয়ায় পরিণত অলরাউন্ডার গোলাম ফারুক সুরু, জাতীয় দলের সাবেক পেসার হাসিবুল হোসেন শান্ত আর এহসানুল হক সেজান, কোচ জুয়েলও ছিলেন জালালের আজিমপুরের জানাজায়।

ক্লাব কোচিং ছাড়াও তিনি ছিলেন জাতীয় দলের সাবেক প্রশিক্ষক। ২০০২ সালের বিশ্ব যুব ক্রিকেটে জুনিয়র টাইগারদের কোচ ছিলেন জালাল। ওই দলে নাফিস ইকবাল, আশরাফুল, মাশরাফি, আফতাবের মতো ক্রিকেটারও ছিলেন। ক্রিকেটই ছিল তার ভালোলাগা, ভালোবাসা।

২০১১ সালে পত্নী বিয়োগের পর যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী কন্যা ও পুত্র তাকে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে গিয়েছিলেন; কিন্তু সেখানে মন টেকেনি। বছর খানেক পর দেশে ফিরে আবার ক্লাব কোচিংয়ে জড়িয়ে পড়েন।

ক্রীড়াঙ্গনের সর্বস্তরের মানুষ তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধায় বিদায় জানালেও যে ক্রিকেটের জন্য জীবনের সবটা উজাড় করেছেন জালাল, চির বিদায়ের আগে সেই ক্রিকেট বোর্ড থেকে একটি ফুলও পাননি জালাল।

শুধু বোর্ড পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববিই বিসিবির প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে কোনো পুষ্পস্তবকও দেয়া হয়নি। বোর্ড সভা ছিল, এই ধুয়া তুলে ববি ছাড়া কোনো বোর্ড পরিচালক, সিইও কিংবা বোর্ডের কোনো কর্তাব্যক্তিও তার জানাজায় শরিক হননি।

তবে বিসিবি পরিচালনা পর্ষদের সভা শুরুর আগে ক্রিকেটার ও আম্পায়ার নাদির শাহ এবং জালাল আহমেদ চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

এআরবি/আইএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]