পাকিস্তান-ভারত বংশোদ্ভূত ওমানিজদের কি স্পিনে ঘায়েল করা সম্ভব?

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১১:২৭ এএম, ১৯ অক্টোবর ২০২১

কেউ কেউ এটাকে ‘পচা শামুকে পা কাটা’ বলছেন। তবে ইতিহাস পরিস্কার সাক্ষী দিচ্ছে, ক্রিকেটের সবচেয়ে ছোট ফরম্যাটের বিশ্বকাপে এটাই প্রথম পচা শামুকে পা কাটা নয়। শক্তি, সামর্থ্য ও অভিজ্ঞতা ও র‌্যাংকিং-রেটিংয়ে পিছিয়ে থাকা দলের কাছে এর আগেও টি টোয়েন্টি ফরম্যাটে হারের রেকর্ড আছে।

সেটা কোন বড় মঞ্চেই যে শুধু, তাও নয়। যেমন ১৭ অক্টোবর যে স্কটল্যান্ডের কাছে ৬ রানে হেরেছে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের দল, ঠিক সেই একই দলের কাছে ২০১২ সালেও ৩৪ রানে হারের তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে।

নেদারল্যান্ডসের হেগে স্কটিশ ওপেনার রিচি ব্যারিংটনের উত্তাল শতকের (৫৮ বলে ৫ ছক্কা ও ৮ বাউন্ডারিতে ১০০) মুখে তছনছ হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের বোলিং-ফিল্ডিং। স্কটল্যান্ডের ১৬২ রানের জবাবে মুশফিকুর রহিমের বাংলাদেশ করেছিল মোটে ১২৮ রান।

এর বাইরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও বাংলাদেশ এর আগে দুই দুইবার আইসিসির দুটি সহযোগি সদস্য দেশের কাছে হেরেছে। প্রথমবার আয়ারল্যান্ডের কাছে, ২০০৯ সালের বিশ্বকাপে। ৯ জুন ইংল্যান্ডের নটিংহ্যামে বিশ্বকাপ টি টোয়েন্টির ‘এ’ গ্রুপের ম্যাচে তখনকার নন টেস্ট প্লেয়িং কান্ট্রি আয়ারল্যান্ডের কাছে ৬ উইকেটে হেরেছিল আশরাফুলের দল। ১৩৭ রানের ছোট পুঁজি গড়ে আইরিশদের আটকে রাখতে পারেনি টিম বাংলাদেশ। ১০ বল আগেই আইরিশরা পৌঁছে গিয়েছিল জয়ের বন্দরে।

এরপর আরও একটি করুন ও ন্যাক্কারজনক পরাজয় আছে বাংলাদেশের। সেটা দেশের মাটিতে এবং ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টির বাছাই পর্বে। সেবার চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে আইসিসির সহযোগি সদস্য হংকংয়ের কাছেও হেরেছিল বাংলাদেশ।

২০১৪ সালের ২০ মার্চ মাসে হংকংয়ের কাছে ২ উইকেটের করুন পরাজয় গ্রাস করেছিল মুশফিকুর রহিমের দলকে। বাংলাদেশকে মাত্র ১০৮ রানে (১৬.৩ ওভারে) অলআউট করে দিয়ে ২ উইকেটের অবিচ্ছিন্ন জয় ছিনিয়ে নেয় হংকং।

তারপর এবারও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে আইসিসির অনুমোদিত প্র্যাকটিস ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের কাছে ৩৪ রানে হেরেছে রিয়াদের দল। ভক্ত ও সমর্থকদের ধারণা ছিল আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ।

যে পিচেই হোক না কেন, ২০ ওভারের ম্যাচ খেলার সংখ্যা বেড়েছে। তাই ভক্ত ও সমর্থকদের ধারনা ছিল এবার স্কটল্যান্ড, ওমান আর পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে প্রাথমিক পর্বের বাধা সহজে অতিক্রম করে মূল পর্বে পৌঁছে যাবে টাইগাররা।

কিন্তু বাস্তবে তা আর হয়নি। মূল পর্বে যাবার পথটা হঠাৎই কঠিন হয়ে পড়েছে। আজ ওমানের সাথে ম্যাচটি রীতিমতো বাঁচা-মরার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

এখন মূল পর্বে খেলার আশা জিইয়ে রাখতে মঙ্গলবার স্বাগতিক ওমানের সাথে জয়ের বিকল্প নেই রিয়াদ, লিটন, সাকিব, মুশফিক ও মোস্তাফিজদের। তারা কী তা পারবেন? সংশয় কিন্তু জেগেছে। আর সে সংশয় জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশের দূর্বল আর শ্রীহীন ব্যাটিংয়ের কারণে।

একজন ব্যাটসম্যানও পূর্ণ আস্থা, আত্মবিশ্বাসী নন। একটা আড়ষ্টতা কমবেশি সবাইকে কুঁড়েকুঁড়ে খাচ্ছে। যে কারণে কারো ব্যাটে রান নেই। দলীয় সংগ্রহও তাই কম। ১৪০-১৪১ করতেও নাভিঃশ্বাস উঠে যাচ্ছে। ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া এবং নিজিল্যান্ডের বিপক্ষে একবার মাত্র ১৪০ রানে পা রাখতে পেরেছিল। এবার আবুধাবিতে প্র্যাকটিস ম্যাচে শ্রীলঙ্কা ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষেও সেই ১৪০- রানে আটকে থাকতে হয়েছে।

যেখানে সব দল ১৬০-১৭০ রান করছে, পাপুয়া নিউগিনির মত দলও শূন্য রানে ২ উইকেট হারিয়ে ১৩০-এর ঘরে পৌঁছে গেছে। ৫৩ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে স্কটল্যান্ড পা রাখলো ১৪০-এর ঘরে, সেখানে বাংলাদেশ পুরো ম্যাচ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ব্যাট চালিয়ে থামলো ১৩৪-এ।

এই যে দলের ব্যাটিংয়ের হতচ্ছিরি অবস্থা, সে দলকে নিয়ে আশাবাদী হওয়াও যে কঠিন। আর তাই ওমানের বিপক্ষে বাংলাদেশের অনেক ভক্ত ও সমর্থকের মনেই জেগেছে সংশয়। রিয়াদের দল পারবে তো? ক্রিকেট দুনিয়ায় ‘ওমান’ এখনো কোন শক্তি নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো তুলনাই চলে না। অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলায় ঢের পিছিয়ে ওমান।

আর স্কটিশদের মত একটা পেশাদার সেটআপও নেই তাদের। বেশিরভাগ ক্রিকেটারই পাকিস্তান এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত। সেটা একদিকে প্লাস। অন্যদিকে মাইনাস পয়েন্ট। প্লাস পয়েন্ট হলো, ওমান দল হিসেবে স্কটল্যান্ডের মত অত সুগঠিত না। পেশাদার ব্যস্থপনা, মানসিকতা গড়ড়ে ওঠেনি। গেম প্ল্যান তত সাজানো গোছানে নয়। ক্রিকেটারদের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধও স্কটিশদের মত নয়।

প্রথম ম্যাচে পাপুয়া নিউগিনিকে (১০ উইকেটে) উড়িয়ে দিয়েছে স্বাগতিকরা। ১৩০ রানে পাপুয়া নিউগিনিকে অলআউট করে বিনা উইকেটে স্কোর আপ করেছে ওমানিজ ওপেনাররা। ১৩ ওভারে শেষ হয়েছে খেলা। এ জয়ের মূল নায়ক তিনজন। বাঁ-হাতি স্পিনার, অধিনায়ক জিসান মাকসুদ। আর দুই ওপেনার জতিন্দার সিং এবং আকিব ইলিয়াস।

৩৩ বছর বয়সী বাঁ-হাতি স্পিনার জিসান মাকসুদ ২০ রানে ৪ উইকেট দখল করে নিজেকে মেলে ধরেছেন। এছাড়া দুই পেসার বাঁ-হাতি বিলাল খান (২ উইকেট) ও কলিমউল্লাহ (২/১৯) ও নজর কেড়েছেন। তবে দুই ওপেনার আকিব ইলিয়াস সুলেহারি ও জতিন্দার সিংকে দেখে বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছে।

পাকিস্তানের শিয়ালকোটের ২৯ বছরের ডানহাতি ওপেনার আকিব ইলিয়াস একটু রয়েসয়ে (৪৩ বলে ৫০) খেললেও ভারতের পাঞ্জাবের লুধিয়ানার ৩২ বছরের মারকুটে ওপেনার জতিন্দার সিং (৪ ছক্কা ও ৭ বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ৪২ বলে নটআউট ৭৩ রান)। এই আকিব আবার অফব্রেক এবং লেগব্রেক দুই রকম বলই করতে পারেন।

ওমান একাদশের সবাই ভারত ও পাকিস্তানী বংশোদ্ভুত। জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং ক্রিকেটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়াও ভারত এবং পাকিস্তানে। কাজেই তাদের সবারই স্পিনে দক্ষ হওয়ার কথা। সেটাই চিন্তার কারণ। স্বাভাবিক হিসেবে উপমহাদেশের দলকে স্পিন দিয়ে ঘায়েল করা কঠিন। এখন পাকিস্তান ও ভারতে বড় হওয়া ক্রিকেটারে সাজানো ওমানকেও স্পিন দিয়ে ঘায়েল করা কঠিন হতে পারে। জিততে না পারলেও স্কটিশদের টলানো সম্ভব হয়েছিল ওই স্পিন ঘূর্ণিতে।

জিতলেও সাকিব আর শেখ মাহদিকে মোটেই স্বচ্ছন্দে খেলতে পারেনি স্কটিশরা। রীতিমত অস্বস্তিতে ভুগেছে। যে কারণে ৫৩ রানে ৬ উইকেট হারিয়েছিল স্কটিশরা। যার ৫ উইকেটই জমা পড়ে মাহদি (১৯ রানে তিনটি) এবং সাকিবের (১৭ রানে ২টি) ঝুলিতে। এখন ওমানের বিপক্ষে এই দুই স্পিনার কতটা কী করেন, সেটাই দেখার।

স্পিনাররা ভেলকি দেখাতে না পারলে সত্যি বাংলাদেশের জেতা কঠিন হবে।

এআরবি/আইএইচএস/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]