বাংলাদেশ দলের ‘চিন্তার জায়গা’ তাহলে কোথায়?

শাহাদাৎ আহমেদ সাহাদ
শাহাদাৎ আহমেদ সাহাদ শাহাদাৎ আহমেদ সাহাদ , স্পোর্টস রিপোর্টার
প্রকাশিত: ০৮:৩৭ এএম, ২৪ অক্টোবর ২০২১

 

তিনটি ভিন্ন সংবাদ সম্মেলন, তিনজন ভিন্ন ব্যক্তি, তিনটি ভিন্ন প্রশ্ন; তবে তিনটি প্রশ্নেই অল্প কথায় একটি উত্তর। যার সারমর্ম বা মূল ভাব হলো ‘চিন্তার কিছু নেই।’ সেই তিন প্রশ্নের বাইরে চতুর্থ আরেক প্রশ্নেও মিলেছে একই উত্তর, তবে খানিক ব্যাখ্যাসহ। সেই ব্যাখ্যার মাঝেও মূল ভাবটা ছিলো, ‘চিন্তার কিছু নেই।’

হেয়ালি না করে সরাসরি মূল বিষয়েই যাওয়া যাক। উল্লিখিত সংবাদ সম্মেলন তিনটি চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের, তিনজন ভিন্ন ব্যক্তি যথাক্রমে সাকিব আল হাসান, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও রাসেল ডোমিঙ্গো। আর ভিন্ন তিনটি (অথবা চারটি) প্রশ্নই মূলত এই লেখার আলোচ্য বিষয়।

স্কটল্যান্ডের কাছে ছয় রানে হেরে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেছিল বাংলাদেশ। এরপর ওমান ও পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে সহজ জয়েই নিশ্চিত করেছে সুপার টুয়েলভের টিকিট। তবে প্রথম ম্যাচে হারের পর থেকে যেনো ‘চিন্তার কিছু নেই’ মুডে ঢুকে গেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।

প্রথম প্রশ্ন ওমানের বিপক্ষে ২৬ রানে জয়ের পর। ব্যাট হাতে ৪২ রান ও বল হাতে ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতা সাকিব আল হাসান এলেন ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে। তার কাছে প্রশ্ন রাখা হলো, ‘শেষ পাঁচ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়েছে বাংলাদেশ দল। এই জায়গাটায় শেষ দিকে আরেকটু পরিকল্পনামাফিক ব্যাটিং করা যায় কি না?’

jagonews24

উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন সাকিব, ‘ওমানের কয় উইকেট পড়েছে?’ উত্তর পান, ‘এরকমই।’ এরপর ছোট্ট হাসি দিয়ে সাকিব বলেন, ‘তাহলে ঠিক আছে।’ তাকে পাল্টা প্রশ্ন করা সম্ভব হয়নি, ‘তাহলে কি ওমানের সমপর্যায়ের দল বাংলাদেশ?’ প্রশ্নটি করা হলে উত্তর কী পাওয়া যেতো তা এখন ভাবা অনর্থক।

কিন্তু আদৌ পাঁচ ওভারে ৬ উইকেট হারানো ‘ঠিক আছে’ কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে যেখানে শেষের ৪-৫ ওভারে গিয়ে ওভারপ্রতি ১০-১২ রান তোলার চেষ্টা থাকে বড় দলগুলোর, সেখানে ৫-৬ উইকেট হারিয়ে ফেলা সত্যিই ঠিক কি না তা বরাবরই আলোচনার জায়গা রাখে।

বিশ্বকাপের আগের কিছু ম্যাচের চিত্র তুলে ধরা হলে দেখা যাবে, আগে ব্যাট করা ইনিংসগুলোর মধ্যে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে প্রথম ১৫ ওভারে ৩ উইকেট হারানো বাংলাদেশ দল, শেষের ৫ ওভারে হারায় আরও ৩ উইকেট। বিপরীতে স্কোরবোর্ডে যোগ হয় ৩৮ রান। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের পঞ্চম ম্যাচে প্রথম ১৪ ওভারে ৪ উইকেট হারানোর পর শেষ ৩২ বলে পড়ে ৪ উইকেট, আসে ২৬ রান। একই সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে শেষ পাঁচ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ৩৪ রান করতে পারে বাংলাদেশ দল।

ঘরের মাঠে স্লো-লো উইকেটে হওয়া শেষ দুই সিরিজের হিসেব বাদ দিলেও, অনেকবারই ভালো অবস্থান থেকে হুট করেই বেশ কিছু উইকেট হারিয়ে শেষ দিকে প্রত্যাশামাফিক রান না পাওয়ার নজির রয়েছে বাংলাদেশ দলের। ২০১৯ সালের ভারত সফরেই যেমন, টি-টোয়েন্টি সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে একপর্যায়ে ১২ ওভার শেষে ২ উইকেটে ৯৭ থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত সংগ্রহ দাঁড়ায় ৬ উইকেটে ১৫৩ রান। অর্থাৎ শেষ ৮ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে যোগ হয় মাত্র ৫৬ রান।

jagonews24

দেশে কিংবা দেশের বাইরে, ভালো অবস্থানে থেকে ফিনিশিংয়ের ব্যর্থতার এমন উদাহরণ সাম্প্রতিক সময়ে অনেক ম্যাচেই পাওয়া যাবে। অথচ একই ম্যাচে ওমানেরও শেষ পাঁচ ওভারে ছয় উইকেট পড়ায় বাংলাদেশের একই কাজ ‘ঠিক আছে’ বলে মনে করেন দলের প্রতিনিধি!

আসা যাক, দ্বিতীয় প্রশ্নে। এবার বিষয় বাংলাদেশের শেষ দিকের বোলিং। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি ম্যাচ দিয়ে শুরু হয় টাইগারদের বিশ্বকাপ মিশন। সেই ম্যাচে আগে ব্যাট করা বাংলাদেশ দলের সংগ্রহ ছিল ১৪৭ রান। পরে ফিল্ডিং করতে নেমে মাত্র ৭৫ রানে ৬ উইকেট তুলে নেন বোলাররা। কিন্তু সপ্তম উইকেটে ৭৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে ম্যাচ জিতে নেয় শ্রীলঙ্কা। যেখানে শেষ ৪ ওভারেই তারা করে ৪৩ রান। পরে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় প্রস্তুতি ম্যাচের শেষ ৪ ওভারে টাইগার বোলারদের খরচ ৫৩ রান, নেয়া যায়নি কোনো উইকেট।

দুই প্রস্তুতি ম্যাচে শেষদিকের এমন বোলিংয়ের ধারা বজায় থাকে বিশ্বকাপের মূল আসরেও। প্রথম পর্বে স্কটিশদের বিপক্ষে ম্যাচটিতে ৫৩ রানে ৬ উইকেট নেয়ার পরেও তারা দাঁড় করে ফেলে ১৪০ রানের সংগ্রহ। যেখানে শেষ ৮ ওভারে তোলে ৮৫ রান আর শেষ ৪ ওভারে আসে ৪৪ রান।

ওমানের বিপক্ষে পরের ম্যাচে এমন কিছু হয়নি। তবে ১৬.৪ ওভারের মধ্যে ৭ উইকেট তুলে নিলেও শেষ ২০ বলে অলআউট করা যায়নি তাদের। এর মধ্যে শেষ দুই ওভারে দশম উইকেট জুটিই যোগ করে ১৫ রান, বাংলাদেশের জয়ের ব্যবধান নেমে আসে ২৬ রানে।

পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে শেষ ম্যাচে জয়ের ব্যবধান নিয়েও কোনো সমস্যা নেই। নিজেদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৮৪ রানে জিতেছে বাংলাদেশ, পিএনজিকে অলআউট করেছে ৯৭ রানে। ম্যাচ না দেখা কেউ নিশ্চয়ই বাহবা দেবেন এতে, নিঃসন্দেহে বাহবা দেয়ার মতোই পারফরম্যানস। কিন্তু সেই ম্যাচে পিএনজিকে আরও কমে অলআউট করার সুবর্ণ সুযোগ ছিলো বাংলাদেশের সামনে। মাত্র ২৯ রানে ৭ উইকেট নেয়ার পর শেষ তিন উইকেটের জন্য বাংলাদেশকে খরচ করতে হয় ৬৮ রান। যা প্রথম ৭ উইকেটের দ্বিগুণেরও বেশি।

পরপর পাঁচ ম্যাচে শেষদিকের এমন বোলিং নিয়ে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের সামনে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, শেষদিকের এমন আলগা বোলিং সুপার টুয়েলভের বড় দলগুলোর বিপক্ষে চিন্তার কারণ হতে পারে কি না। প্রশ্ন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই টাইগার অধিনায়কের উত্তর, ‘না। চিন্তার কোনো কারণ নেই।’

আবারও সেই একই বিষয়। শেষ দিকে টানা এমন আলগা ও খরুচে বোলিং কি সত্যিই চিন্তার কারণ নয়? প্রতিপক্ষ দলে যখন শেষ দিকে কাইরন পোলার্ড-আন্দ্রে রাসেল, ডেভিড মিলার, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল কিংবা ভানিন্দু হাসারাঙ্গাদের মতো পরীক্ষিত মারকুটে ব্যাটাররা, তখন এমন আলগা বোলিংয়ের মাশুলটা সুদে-আসলেই গুনতে হবে যেকোনো দলকে।

jagonews24

কিন্তু শেষদিকের ব্যাটিংয়ের মতো শেষদিকের বোলিংটাও ‘চিন্তার কারণ নয়’ বাংলাদেশ দলের জন্য। শুধু যে দলগত এ সমস্যাগুলোই চিন্তার কারণ নয়, এমনটা নয়। ব্যক্তিগত পারফরম্যানস নিয়েও যেনো চিন্তার কিছু নেই টাইগার শিবিরে। যা জানা গেছে, তৃতীয় সংবাদ সম্মেলনে আসা দলের হেড কোচ রাসেল ডোমিঙ্গোর কাছ থেকে।

এবার প্রসঙ্গ টাইগারদের উদ্বোধনী জুটি। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১৯টি কুড়ি ওভার ম্যাচ খেলে মাত্র দুইটিতে পঞ্চাশোর্ধ্ব রানের ওপেনিং জুটি পেয়েছে বাংলাদেশ। যার একটি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে, অন্যটি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের তিন ম্যাচে বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটিগুলো যথাক্রমে ৮, ১১ ও ০ রানের।

সুপার টুয়েলভে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচের আগেরদিন (শনিবার) সংবাদ সম্মেলনে আসা হেড কোচের কাছে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বোধনী জুটিতে ভুগছে বাংলাদেশ। এখানে পরিবর্তন আনার কোনো পরিকল্পনা আছে?’ এক শব্দের উত্তরে ডোমিঙ্গো বলেন, ‘নো (না)।’ অর্থাৎ টানা ব্যর্থ হওয়া উদ্বোধনী জুটি নিয়েই এগুনোর পরিকল্পনা বাংলাদেশের। এটি নিয়েও তাদের চিন্তার কিছু নেই।

অথচ ঐতিহাসিকভাবেই এটি সত্য যে, যেকোনো ফরম্যাটেই বড় একটা সংগ্রহ পাওয়ার জন্য ভালো উদ্বোধনী জুটির বিকল্প নেই। সেটা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের যেকোনো দলের বেলায়ই সত্য। কিন্তু উদ্বোধনী জুটি ক্রমাগত ব্যর্থ হলেও এখানে পরিবর্তনের কিছুই যেনো খুঁজে পান না দলের হেড কোচ!

এই তিন ‘চিন্তার কিছু নেই’র সঙ্গে যোগ করা যায় চতুর্থ আরেকটি প্রশ্ন। যেখানে উঠে আসে দলের দুই তারকা ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম ও মোস্তাফিজুর রহমানের সাম্প্রতিক পারফরম্যানসের ব্যাপারে আলোচনা। এ দুজনের পাশে দাঁড়িয়ে অধিনায়কোচিত বক্তব্যে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ জানিয়েছেন, কারও পারফরম্যানস নিয়েই দুশ্চিন্তা করছে না বাংলাদেশ টিম ম্যানেজম্যান্ট।

অথচ পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০১৮ সালের নিদাহাস ট্রফিতে পরপর দুই ম্যাচে ৭২ রান করার পর খেলা ২৮ ম্যাচে মাত্র একবার ফিফটি ছুঁতে পেরেছেন মুশফিক। এ সময় তিনি রান করেছেন ৩৯৫, মাত্র ১৬.৪৫ গড় ও ১০২.৫৯ স্ট্রাইকরেটে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে যা রীতিমতো ভয়াবহ ব্যাটিংয়ের শামিল। অন্যদিকে চলতি বিশ্বকাপে তিন ম্যাচেই খরুচে ছিলেন মোস্তাফিজ, ১২ ওভারে ছয় উইকেট নিলেও সাড়ে আট ইকোনমি রেটে খরচ করেছেন ১০২ রান।

দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের এমন পারফরম্যানসের পরও অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ দৃপ্ত কণ্ঠেই বলেছেন, কারও পারফরম্যানস নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। সংবাদ মাধ্যমের সামনে নিজের খেলোয়াড়কে আগলে রাখাই একজন আদর্শ খেলোয়াড়ের কাজ। কিন্তু দলের ভেতরে নিজেদের মধ্যেও যদি এমন পারফরম্যানস শুধরানোর আলোচনা না করে দল, তাহলে কিন্তু বিপদ অবশ্যম্ভাবী।

ব্যক্তিগত পারফরম্যানসের ক্ষেত্রে না হয় নিজেদের খেলোয়াড়দের আগলে রাখার জন্য ‘চিন্তার কিছু নেই’ বিষয়ক কথা বলছেন বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধিরা। একইভাবে শেষ দিকের বোলিং কিংবা ব্যাটিংয়ের অপূর্ণতাকেও ‘চিন্তার কিছু নেই’ বলা হয়তো দলের দুর্বলতা বাইরে প্রকাশ না করার পরিকল্পনা হিসেবেই চালিয়ে দেয়া যায়।

আর যদি এসব অপূর্ণতার জায়গাকে সত্যিই ‘চিন্তার কিছু নেই’ হিসেবে ধরে নেয় বাংলাদেশ, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন চলে আসে, বাংলাদেশের চিন্তার জায়গা আসলে কোনটা?

এসএএস/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]