সেই লিটন, এই লিটন

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৮:১৮ পিএম, ২৬ নভেম্বর ২০২১

‘বাবু ভাই, ছেলেটা কে হে? হাতে এতো সুন্দর সুন্দর মার। ক্রিকেট অভিধানের সব শটই দেখি সে খেলতে পারে। কী অনায়াসে ব্যাট চালালো! যাদের বল সে কখনও খেলেনি, হয়তো তাদের সামনে থেকেও দেখেনি কোনদিন, সেই ইশান্ত শর্মা, উমেশ যাদবের গতি আর হরভাজন সিং, রবিচন্দ্রন অশ্বিনের স্পিন কী অসামান্য দক্ষতায় খেলে ফেললো! ব্যাট চালনা দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটাই তার টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম ইনিংস। একবারের জন্য না ভড়কে, না ঘাবড়ে বুক ভরা সাহস নিয়ে কী সাহসী ব্যাটিংই না করলো ছেলেটা। হাতের শটের বাহার। কোন জড়তা নেই। যে বল যেখানে খেলতে চাইলো, সেখান দিয়েই খেললো। মারের তোরটা বেশি ছিল, কিন্তু খেললো ঝানু উইলোবাজের মতো বাড়তি ইম্প্রোভাইজ না করে তেড়েফুড়ে ব্যাট না চালিয়ে একদম ব্যাকরণ মেনেই বাউন্ডারির পর বাউন্ডারি হাঁকালো। দেখে নিও ছেলেটি অনেক দূর যাবে।’

ওপরের কথাগুলো একাধিক ভারতীয় সাংবাদিকের। প্রায় ৬ বছর আগে ২০১৫ সালের জুনে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা স্টেডিয়ামের প্রেসবক্সে বসে লিটন দাসের প্রথম টেস্ট ইনিংস দেখে মুগ্ধ, অভিভূত হয়ে অমন মন্তব্য করেছিলেন ভারতের নামী সাংবাদিকরা। গৌতম ভট্টাচার্য্য, দেবাশিষ দত্তের মতো ঝানু সাংবাদিক ও নামী ক্রিকেট লিখিয়েরাও লিটনের ব্যাটিংয়ের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছিলেন।

এতটুকু শুনে ভাবছেন, কী ব্যাপার লিটন তো অভিষেকে কোনো সেঞ্চুরি করেনি, এমনকি হাফসেঞ্চুরিও নেই। লিটন দাসের প্রথম টেস্ট ইনিংসটি থেমে গিয়েছিল ৪৪ রানে। এটুকু পড়ে নিশ্চয়ই ভাবছেন, ৪৪ রানের ইনিংস নিয়ে অত কথা? টেস্টে ৪৪-৪৫ বা ৫০-৬০ তো শ-শ আছে। অভিষেকেও অনেক ব্যাটসম্যানের এর ঢের বেশি স্কোর আছে। হাফসেঞ্চুরি, সেঞ্চুরি আছে ভুরিভুরি।

তাহলে টেস্ট অভিষেকে লিটন দাসের ঐ ৪৪ রানের ইনিংসটি দেখে ভারতীয় সাংবাদিকরা মুগ্ধ হলেন কী করে? নিশ্চয়ই এমন প্রশ্ন মনে উকিঝুঁকি দিচ্ছে। সেটাই স্বাভাবিক। তাহলে শুনুন, লিটন দাসের টেস্ট ক্যারিয়ারের ঐ প্রথম ইনিংসটি শুধু ভারতীয় প্রচার মাধ্যমেরই নজর কাড়েনি, মাঠে বসে এবং টিভির পর্দায় দেখা প্রায় সবারই মনে দাগ কেটে আছে।

ভাবছেন কী বলছি আবোল তাবোল! ৪৪ রানের ইনিংস আবার মনে দাগ কেটে থাকে নাকি? হ্যাঁ থাকে, হ্যাঁ আছে। উইকেটে ছিলেন মোটে ৫৯ মিনিট। বল খেলেছিলেন ৪৫টি। ঐ অল্প সময়ে চাপের মধ্যে ব্যাট করতে নেমেও অল্প বয়সী লিটন রেখেছিলেন তার অসামান্য ব্যাটিং প্রতিভার স্বাক্ষর।

ক্রিকেট অভিধানের সব শটই খেলেছিলেন সেদিন। ড্রাইভ, কাট, ফ্লিক, গ্ল্যান্স, হুক আর পুল অনায়াসে খেলেছেন। কী অসাধারণ ব্যাটিং শৈলি। ভারতের প্রথম ইনিংসে করা ৪৬২ রানের জবাবে আজকের মতই ধুঁকছিল বাংলাদেশ, ১৭৬ রানেই খোয়া গিয়েছিল ৬ উইকেট। সাত নম্বরে নেমে ইশান্ত, উমেশ, হরভজন, অশ্বিনদের নিয়ে সাজানো ভারতের ধারালো বোলিংয়ের মুখোমুখি লিটন।

সবাইকে অবাক করে অসীম সাহস নিয়ে বুক চিতিয়ে লড়েন তিনি। হাঁকান একের পর এক বাউন্ডারি, ৪৪ রানের মধ্যে ৩৮ই আসে বাউন্ডারি থেকে। ভাবছেন তেড়েফুড়ে আর এদিকওদিক ব্যাট ছুড়ে বুঝি এই ৪৪ রান করা। মোটেই তা নয়। একদম ক্রিকেটীয় শট খেলে। যার প্রতিটি শটই ছিল একদম ছবির মতো।

সেই ৬ বছর আগে ক্যারিয়ারের প্রথম ইনিংসে লিটন হাফসেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন অনভিজ্ঞতায়। আর ২৫ টেস্ট পর পরিণত লিটন আজ খেললেন একদম পরিপাটি সাজানো গোছানো ইনিংস। একদম পারফেক্ট টেস্ট নক। অপ্রয়োজনীয় শট না খেলে শুধু আলগা ডেলিভারির অপেক্ষায় থেকে, সেগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টায় ছিলেন। ফলও মিললো।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সময়টা খুব খারাপ কেটেছে। নিজেকে হারিয়ে খুঁজেছেন, আড়ষ্ট ছিলেন। দেখে মনে হয়েছে শটস খেলা ভুলে গেছেন। কিন্তু শুক্রবার শাহিন আফ্রিদী, হাসান আলি, ফাহিম আশরাফ, সাজিদ খান আর নৌমান আলির বিপক্ষে ধৈর্য্য-মনোযোগের পাশাপাশি মন মাতানো দৃষ্টিনন্দন, শৈল্পিক শট খেলে লিটন যেনো সেই চিরন্তন প্রবচনটাই মনে করিয়ে দিলেন, ‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পারমানেন্ট।’

এআরবি/এসএএস/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]