‘নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো, তবে এ নিয়ে বসে থাকলে চলবে না’

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৩:৪০ পিএম, ১৪ জানুয়ারি ২০২২

জাতীয় দলের মূল বহর দেশে ফিরবে শনিবার (১৫ জানুয়ারি) বিকেলে। তবে টিম ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ সুজন দেশে ফিরে এসেছেন বুধবার রাতেই। উদ্দেশ্য এবারের বিপিএলে তার নতুন দল ফরচুন বরিশালের একটা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া। আজ শুক্রবারই স্থানীয় এক হোটেলে সে অনুষ্ঠান।

প্রথমত, নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের সময়ের লম্বা (৭ ঘন্টা) ব্যবধান। তার ওপর দীর্ঘ বিমানভ্রমণের ক্লান্তি ও অবসাদ। তাই বৃহস্পতিবার সারাদিন ঘুমিয়েই কেটেছে। সন্ধ্যার পর জাগো নিউজের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন খালেদ মাহমুদ সুজন।

কেমন ছিল নিউজিল্যান্ড সফর, সাকিব-তামিমের মতো অভিজ্ঞ ও অতি নির্ভরযোগ্য পারফরমার ছাড়া এক ঝাঁক তরুণে গড়া দল নিয়ে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট জয়ের পেছনের রহস্যটা কী?

এ সাফল্য আগামীতে দেশের ক্রিকেটে বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে কি কি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে, পরের ধাপে করণীয়ই বা কী- এসব নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন খালেদ মাহমুদ সুজন।

জাগো নিউজ: পুরো সিরিজটাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? কেমন ছিল নিউজিল্যান্ড সফর?

সুজন: ওভারঅল খুব ভালো ছিল মাশাআল্লাহ। এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমরা কখনও কল্পনাও করিনি এমনকি আমাদের প্রত্যাশাও ছিল না যে আমরা এই টিম নিয়ে নিউজিল্যান্ডে গিয়ে টেস্ট জিতবো। তবে আমরা যে সব প্ল্যান করেছিলাম, ছেলেরা প্ল্যান অনুযায়ী পারফর্ম করছে। এক্সিকিউশন ভালো হয়েছে। ছেলেরা কষ্ট করেছে। এগুলো সবই ভালো ছিল। টিম ডিসিপ্লিন ভালো ছিল। একটা দল হয়ে খেলতে পেরেছে।

জাগো নিউজ: কখন মনে হলো আমরা টেস্ট জিততে পারি বা জিততে যাচ্ছি?

সুজন: আসলে কি চতুর্থ দিন সকালেও কিন্তু আমরা ভাবিনি যে জিতে যাব। চতুর্থ দিন শেষেও বলার মত অবস্থা ছিল না যে টেস্ট জিতবো। কারণ তখনও ওদের ৫ উইকেট হাতে ছিল। সে উইকেটগুলো নেওয়ার ব্যাপার ছিল। তবে লক্ষ্য ছিল একটাই, ওদের আমরা যখনই অলআউট করি; টার্গেট ১৪০-১৫০ বা তার বেশি যাই হোক না কেন, আমরা জেতার জন্যই খেলবো।

এইভাবে প্ল্যান করে আগাবো। সত্যি কথা বলতে কী, যখন ওদের অলআউট করে দিলাম, তখনই বুঝে গেলাম যে আমরা জিতবো। তার আগে কী হয় না হয়, আমরা পারবো কিনা, এসব নিয়েই চিন্তা ছিল।

জাগো নিউজ: প্রথম টেস্টের কোন কোন জায়গা বা অংশ আপনার মনে হয় জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে?

সুজন: প্রথমেই আমি মাহমুদুল হাসান জয়ের কথা বলবো। জয়ের ব্যাটিংটা ছিল আশা দারুণ জাগানিয়া। ওর ব্যাটিং সবার মনে সাহস সঞ্চার করেছে। তারপর সবার কন্ট্রিবিউশন ভালো ছিল। সবাই চেষ্টা করেছে।

জাগো নিউজ: সাকিব-তামিম ছাড়া এমন তরুণ, নবীন ও অনভিজ্ঞ দল নিয়ে যখন নিউজিল্যান্ডে পা রাখলেন, তখন মনের অবস্থা কী ছিল?

সুজন: সিরিজ শুরুর আগে সত্যি করে বললে, অনেকটা কঠিন ছিল পুরো ব্যাপারটা। অভিজ্ঞতার আলোকে চিন্তা করলে খুবই অনভিজ্ঞ লাইনআপ। এক্সপেরিয়েন্স একদম ছিল না বললেই চলে।

মুশফিক আর মুমিনুল ছাড়া কারোরই সে অর্থে টেস্ট এক্সপেরিয়েন্স ছিল না। ফাস্ট বোলারদের কেউ ৩০-৪০ টেস্ট খেলেনি। ব্যাটসম্যানদের মধ্যে মুশফিক আর মুমিনুল ছাড়া শুধু লিটন দাস হয়তো হার্ডলি ২৮-২৯ টেস্ট খেলেছে। এছাড়া ওরকম কেউ ছিল না। এরকম এক দল নিয়ে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে তাদের মোকাবিলা করা ছিল এক কঠিন মিশন।

জাগো নিউজ: এরকম এক দল নিয়ে শেষ পর্যন্ত মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্ট জয়, কী করে সম্ভব হলো?

সুজন: আসলে আমাদের টিমের বন্ডিংটা খুব ভালো হয়েছিল। আমরা ১২ দিন এমআইকিউ সেন্টারে ছিলাম, বের হতে পারতাম না, দৈনিক ২৫ মিনিট সময় বেঁধে দেয়া হতো। তখন সবাই মিলে বের হতাম। অনেক কথা হতো, গল্প হতো, মজা হতো। ওই ২৫ মিনিট সময়ও আমরা খুব ভালো কাটিয়েছি। একজন একজনের খুব কাছে এসেছি।

আর প্র্যাকটিসও খুব ভালো ছিল। স্পেসিফিক ট্রেনিং হয়েছে। আমরা কেমন কী আশা করি, লক্ষ্য এঁটেই অনুশীলন হয়েছে। এছাড়া ছেলেদের মধ্যে সাহসের ব্যাপার ছিল।

জাগো নিউজ: আপনি নিজে ক্রিকেটারদের কী বলেছিলেন?

সুজন: ছেলেদের বলা হয়েছে, আমরা হারতেই পারি। তবে লড়াই করে হারবো। হারার আগে হেরে যাবো না। আমরা জানি জেতা টাফ। তারপরও আমরা ট্রাই করবো। না হয়, না হবে। অসুবিধা নেই। এটাই বলছিলাম।

জাগো নিউজ: ইতিহাস জানাচ্ছে এর চেয়ে ঢের সমৃদ্ধ, অভিজ্ঞ আর শক্তিশালী দল নিয়ে প্রথম ইনিংসে ৫৯৫ রানের বিরাট স্কোর গড়েও টেস্ট জেতা বহু দূরে, ড্র করাও সম্ভব হয়নি। সাকিব আল হাসানের ডাবল সেঞ্চুরি, মুশফিকুর রহিমের দেড়শো রানের ইনিংসও কোনো কাজে দেয়নি। এবার ব্যক্তিগত পর্যায়ে তো তার ধারেকাছের পারফরম্যান্স হয়নি। তারপরও কিভাবে জয় ধরা দিলো?

সুজন: যেটা হয়েছে, সেটা হলো- সবার কমবেশি অবদান ছিল। সম্মিলিত পাফরম্যান্সটা কাজে দিয়েছে। দলগত সাফল্যর জন্য যা খুব দরকার। দেখেন, মুশফিক প্রথম টেস্টে প্রথম ইনিংসে ১২ রান করেছে। কিন্তু সে অনেকগুলো বল খেলে গেছে, সেটা আমাদের ইনিংসটাকে বর্ধিত করেছে। সব কটা ছেলেরই কন্ট্রিবিউশন ছিল। ওই কন্ট্রিবিউশনের মিশেলেই ধরা দিয়েছে সাফল্য।

জাগো নিউজ: প্রথম টেস্টে কন্ডিশন, উইকেট কি কোনো ভূমিকা রেখেছিল?

সুজন: আসলে কিছু জিনিস আমাদের ফেবারে ছিল। ফেবার বলতে কন্ডিশন বিশেষ করে কন্ডিশনটা আমাদের পক্ষে ছিল। গরম ছিল। মানে নিউজিল্যান্ডে যেমন হাড় কাঁপানো ঠান্ডা থাকে, ওমন ছিল না। উইকেটও কিন্তু নিউজিল্যান্ডে যেরকম থাকে, সেরকম ছিল না। সত্যি কথা বলতে গেলে, এটা একটা অ্যাডভান্টেজ ছিল। আর মাঠে বোলিং-ফিল্ডিংটাও হয়েছে অনেক ভালো। আমরা ভালো কিছু ক্যাচও নিছি।

জাগো নিউজ: শেষ টেস্টটাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

সুজন: শেষ টেস্টটা আসলে আমরা ভালো করিনি। ভালো ব্যাটিং করিনি। বোলিংও ভালো হয়নি। আর উইকেটটা ডিফারেন্ট ছিল। ক্রাইস্টচার্চের উইকেট অন্যরকম। এখানে একটু বল সুইং করে। আসলে অভিজ্ঞতা কম থাকলে যা হয়, আমাদের ব্যাটিং ভালো হয়নি। আউটের ধরন ভালো ছিলনা। তবে আমি ছেলেদের দোষ দেব না। এসব উইকেটে তো আমরা নিয়মিত খেলি না।

জাগো নিউজ: নিউজিল্যান্ডের মাটিতে কিউইদের সঙ্গে প্রথম টেস্ট জয় আর সিরিজ ড্র করে ফেরা। আসলে সবমিলিয়ে বাংলাদেশের প্রাপ্তি-অর্জন কী?

সুজন: এটা একরকম শুরু বলতে পারেন। অনেক কিছুই হয়েছে, যা আমরা আশা করিনি। সেদিক থেকে এটা একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলতে পারেন। আসলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রসদ মিলেছে।

আমাদের ছেলেরা যে পারে, বাইরে গিয়ে টেস্ট ম্যাচ জেতার সামর্থ্য আছে। সে সাহসটা বড় দরকার ছিল। এটা আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য অনেক বড় কাজ করবে। আমরা যে এক ঝাঁক তরুণ নিয়ে নিউজিল্যান্ডের মত দেশে গিয়ে টেস্ট জিততে পারি, সিরিজ না হেরে ড্র করে ফিরে আসতে পারি, সেটা অন্তত জানা হলো। যা আগামীতে অনেক বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।

তারপরও এ নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। আমাদের মানে বোর্ডেরও অনেক কিছু করার আছে। নিজেদের গোছাতে হবে। দল হিসেবে আরও ভালো খেলতে হবে। ওটা যদি পারি, তাহলেই কেবল সামনে এগোনো সম্ভব হবে।

জাগো নিউজ: নিউজিল্যান্ড থেকে থেকে ফেরার পর আপনি কোন কাজটা আগে করতে চান? কোন দিকটায় বেশি নজর আপনার?

সুজন: আমি সাদমানকে দিয়েই উদাহরণ দেই। ও তো টেস্ট ছাড়া আর কোনো ফরম্যাটে খেলে না। আমার মনে হয় সাদমানের টেস্ট ছাড়া অন্য ফরম্যাটে খেলার চান্স কম। সাদমান একা না, মুমিনুলসহ পেসার ও বোলারদের মধ্যেও যারা শুধু টেস্ট খেলে তাদের নিয়ে স্পেসিফিক কাজ করার ইচ্ছে আছে।

তাদের নিয়ে অনেক কিছুই করার আছে। তারা অন্য সময় যাতে খুব ভালোমত অনুশীলন করতে পারে, নিজেদের ঘষা মাজার সুযোগটা যাতে পায়। বিশেষ করে বিদেশি কন্ডিশনকে মাথায় রেখে যাতে নিজেদের তৈরি করতে পারে, সে সুযোগ করে দিতে হবে।

এআরবি/এমএমআর/এসএএস/এমএস

অনেক কিছুই হয়েছে, যা আমরা আশা করিনি। সেদিক থেকে এটা একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলতে পারেন। তারপরও এ নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। আমাদের মানে বোর্ডেরও অনেক কিছু করার আছে

ছেলেদের বলা হয়েছে, আমরা হারতেই পারি। তবে লড়াই করে হারবো। হারার আগে হেরে যাবো না। আমরা জানি জেতা টাফ। তারপরও আমরা ট্রাই করবো। না হয়, না হবে। অসুবিধা নেই। এটাই বলছিলাম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]