ব্রায়ান লারাদের বিপক্ষে সেদিন ‘মাইন্ড গেম’ খেলেছিলাম: পাইলট

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৬:১২ পিএম, ২৩ জুন ২০২২

মাত্র একদিন পরই বাংলাদেশ আর ওয়েষ্ট ইন্ডিজের মধ্যকার দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট। প্রথম টেস্টে সাকিব আল হাসানের দল হেরেছে ৭ উইকেটে। ভক্ত ও সমর্থকরা তারপরও আশার প্রহর গুনছেন। একটা ভাল কিছুর প্রত্যাশায় সবাই।

সেই প্রত্যাশার মাত্রা বাড়ার বিশেষ কারণও আছে। ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে, দেড়যুগ আগে ২০০৪ সালে মে-জুন মাসে ঠিক এই সেন্ট লুসিয়ায় খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ। ব্রায়ান লারার নেতৃত্বে ওই ম্যাচে ওয়েষ্ট ইন্ডিজের দারুণ শক্তিশালী একটি দলের সঙ্গে পুরো পাঁচদিন ব্যাট ও বল হাতে বীরের মত লড়াই করে দুর্দান্ত ড্র করে রীতিমত ইতিহাস তৈরি করেছিল হাবিবুল বাশারের বাংলাদেশ।

ইতিহাস আরও জানাচ্ছে কোনো প্রতিষ্ঠিত ও বড় দলের বিপক্ষে বৃষ্টি ও প্রকৃতির সহায়তা ছাড়া নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে সেটাই ছিল টাইগারদের প্রথম টেস্ট ড্র‘য়ের কৃতিত্ব। যেটাকে বলে জয়ের চেয়েও বড়।

Khaled Masud Pilot

সুতরাং, সেন্ট লুসিয়ায় এবার আবার টেস্ট শুরুর আগে ঘুরে ফিরে আসছে ওই ম্যাচের সুখ স্মৃতি। প্রথম ইনিংসে হাবিবুল বাশার (১১৩) আর মোহাম্মদ রফিকের (১১১) জোড়া সেঞ্চুরি এবং মোহাম্মদ আশরাফুলের ৮১ রানের ওপর ভর করে বাংলাদেশ পায় ৪১৬ রানের লড়াকু পুঁজি। জবাবে ওয়েষ্ট ইন্ডিজ করে ৩৫২ রান। ক্রিস গেইল একাই করেন ১৪১।

তবে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে বাশার বাহিনীর ৬৪ রানের লিডটি ভেস্তেই যাচ্ছিল বলা যায়। শুরু থেকেই চরম বিপদে পড়ে দল। ৭৯ রানে ৬ এবং ১২৩ রানে খোয়া যায় ৭ উইকেট। সেখান থেকে হাল ধরেন খালেদ মাসুদ পাইলট। তাকে সঙ্গ দেন তিন টেলএন্ডার মোহাম্মদ রফিক, তাপস বৈশ্য এবং তারেক আজিজ।

অষ্টম, নবব ও দশম উইকেট জুটিতে যুক্ত হয় ১৪৮ রান। অথৈ জলে হাবুডুবু খাওয়া দলকে সাহসী নাবিকের ন্যায় উদ্ধার করে বন্দরে পৌঁছে দেন খালেদ মাসুদ পাইলট। তার দারুণ সেঞ্চুরি (৩৩৪ মিনিট, ২৮১ বলে ১০৩*) ম্যাচে পরাজয়ের শঙ্কা এড়িয়ে দল পৌছে যায় নিরাপদ অবস্থানে।

প্রথম ইনিংসে ৬৪ আর পরের বারে ৯ উইকেটে ২৭১ রানে ইনিংস ঘোষণা, সব মিলিয়ে ৩৩৫ রানের বড় সড় লিড পেয়ে যায় বাংলাদেশ। হাতে যা সময় ছিল তাতে টি-টোয়েন্টি গতিতে ব্যাট ছুড়লেও ৩৩৬ রানের লক্ষ্য ছোঁয়া সম্ভব ছিল না। ম্যাচ ড্র হয়ে যায়।

Khaled Masud Pilot

বৃষ্টির সহায়তা ছাড়া নিজেদের শক্তিতে লড়াই করে উভয় ইনিংসে তিন তিনজনের অনবদ্য শতকে প্রথম কোন পরাশক্তির বিপক্ষে তাদের মাটিতে টেস্ট ড্র করার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করে হাবিবুল বাশারের বাংলাদেশ।

কেমন ছিল সেই ম্যাচের¯স্মৃতি? তখনকার ওয়েষ্ট ইন্ডিজ কিন্তু ওই ড্যারেন স্যামির নেতৃত্বের ভাঙ্গাচোরা আর নাম সর্বস্ব জাতীয় দল কিংবা এখনকার তারুণ্য নির্ভর ক্যারিবীয় দল ছিল না। ডেভন স্মিথ, ক্রিস গেইল, রামনরেশ সারওয়ান, ব্রায়ান লারা, শিবনারায়ন চন্দরপল, ডোয়াইন স্মিথ, রেডলি জ্যাকব, টিনো বেস্ট, পেড্রো কলিন্স, জারমিন লওসন ও ফিডেল এডওয়ার্ডসদের সাজানো একদম পুরোশক্তির ওয়েষ্ট ইন্ডিজ।

সেই দলের বিপক্ষে এমন লড়াই করে ম্যাচ ড্র করা চাট্টিখানি ব্যাপার ছিল না। সেই কাজটি বুক চিতিয়ে লড়াই করে বাস্তবে পরিণত করে দেখিয়েছিলেন হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ রফিক ও খালেদ মাসুদ পাইলটরা।

কেমন ছিল সে লড়াই? জাগো নিউজের সঙ্গে একান্ত আলাপে সে গল্পই শুনিয়েছেন খালেদ মাসুদ পাইলট।

খালেদ মাসুদ পাইলট কিছুতেই ওই ম্যাচ বাঁচানোর মিশনে নিজেকে ক্যাপ্টেন মানতে নারাজ। তার সোজা সাপ্টা কথা, ‘আসলে সুমন, রফিক আর আশরাফুল প্রথম ইনিংসে দারুণ ব্যাটিং করায় আমরা একটা মজবুত অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিলাম। সুমন আর রফিক সেঞ্চুরি করেছিল। আশরাফুল মনে হয় আশি প্লাস একটি ইনিংস খেলেছিল। ওদের ওই সাহসী ব্যাটিং আমাদের মনে একটা অন্যরকম সাহস সঞ্চার করেছিল।’

Khaled Masud Pilot

‘কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে আমরা হঠাৎ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে গেলাম। ৭০ বা ৮০ রানে (৭৯) ৬ উইকেট পড়ে গেল। সে অবস্থায় আমি চেষ্টা করলাম যতটা সময় সম্ভব উইকেটে থাকার। ওই সময় আট নম্বরে নেমে সেঞ্চুরি করতে দেখে অনেকে আমাকে ক্রেডিট দিলেও আমি নিজে দিতে নারাজ। কারণ, খুব পরিষ্কার। আমার সঙ্গে ছিল না কোন ব্যাটার। সব বোলাররা ছিল সঙ্গী। ওই অবস্থায় শেষ ৩ উইকেটে আমরা বিপর্যয় এড়িয়ে অনেকদুর গেলাম।’

‘ভুলে গেলে চলবে না, সেখানে আমি একদিক আগলে রাখলেও আমার সঙ্গী তিন বোলার রফিক (২৯), তাপস বৈশ্য (২৬) ও তারেক আজিজ (২৯ মিনিটে ২২ বলে নট আউট ১ রান) দারুন সাপোর্ট দিয়েছিল। ওরা এমন চমৎকার সাপোর্ট না দিয়ে চটজলদি আউট হয়ে গেলেই আর আমার কিছুই করার থাকতো না। তাই আমি মনে করি, ওই টেস্ট ড্র করা আর আমার সেঞ্চুরি হওয়ার পিছনে রফিক, তাপস আর তারেক আজিজের অবদানও অনেক।’

‘এখনো মনে পড়লে খুব ভাল লাগে। কি শক্তিশালি ওয়েষ্ট ইন্ডিজ ছিল সেটা! তাদের বিপক্ষে প্রকৃতির সহায়তা ছাড়া আমরা প্রথম কোন টেস্ট ম্যাচ ড্র করেছিলাম। আর ওই মিশনে আমিও ছিলাম। একটা অন্যরকম ভাল লাগায় আচ্ছন্ন হয় মন।’

একদিকে আসা যাওয়ার পালা চলছে। আর অন্যদিকে আট নম্বরে নেমে একপাশ আগলে রেখে ক্যারিবীয় ভয়ঙ্কর ফাষ্টবোলারদের বিপক্ষে খাদের কিনারায় পড়ে যাওয়া অবস্থায় শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে দলকে নিরাপদ অবস্থানে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়েছিল কিভাবে?

Khaled Masud Pilot

এ প্রশ্নে পাইলটের স্বভাবসূলভ রসিকতা মাখা জবাব, ‘জানেন তো আমি বরাবরই ধীরে-সুস্থে, ধৈর্য্য ধরে ব্যাট করতাম। বিশেষ করে টেস্টে উইকেটে গেলে একটাই চিন্তা মাথায় ফুরপাক খেতো। তাহলো, আমাকে লম্বা সময় উইকেটে টিকে থাকতে হবে। যতক্ষণ পারি ততক্ষণ ব্যাট করে যাব। ওই ম্যাচে আমরা যখন কঠিন চাপে, তখনো আমার সেটাই ছিল লক্ষ্য। আমি শেষ পর্যন্ত উইকেটে টিকে থাকবো, প্রাণপন লড়াই করবো। দেখি কি হয়?’

‘এ লড়াইয়ের পথে আমাকে কিছু মাইন্ড গেমও খেলতে হয়েছে। ওই সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ পেসারদের মধ্যে ফিডেল এডওয়ার্ডস খুব জোরে বল করতো। তার গুড লেন্থ ডেলিভারিগুলো সাঁই-সাঁই করে আমার ব্যাটের আশপাশ দিয়ে বিপজ্জনকভাবে উইকেটরক্ষকের গ্লাভসে চলে যাচ্ছিল। আমি ভাবলাম, এমন সব দুর্দান্ত ডেলিভারির বিপক্ষে দীর্ঘ সময় টেকা কঠিন।’

‘আমি টিনো বেস্ট আর ফিডেল এডওয়ার্ডসকে উত্তেজিত করতে একটু ছল-চাতুরির আশ্রয় নিলাম। ননস্ট্রাইকে থাকা অবস্থায় ওরা যখন ডেলিভারি দিয়ে নিজের বোলিং মার্কের দিকে যাচ্ছিল তখন দু’জনকে আলাদা আলাদা বললাম, আরে কি অফস্পিন মার্কা বল ছুঁড়ছো!’

Khaled Masud Pilot

‘এই শুনে টিনো বেস্ট আর ফিডেল এডওয়ার্ডস তো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো। আমাকের পেলেই শর্ট বল মানে বাউন্সার দেয়া শুরু করলো। আমি আবার বাউন্সারে ভয় পেতাম না। হয় বসে যেতাম। না হয় হুক বা পুল খেলতাম। এতে করে যেটা হলো, টিনো বেস্ট আর ফিডেল এডওয়ার্ডস ওদের মারাত্মক আর ভাল ডেলিভারিগুলো ছোঁড়া বাদ দিয়ে আমি স্ট্রাইকে থাকলে অনবরত বাউন্সার ছোঁড়ায় ব্যস্ত হলো। তাতে তাদের বোলিং কার্যকরিতা কমে গেলো এবং কিছুক্ষণ পর হাঁপিয়ে উঠলো। আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। লম্বা সময় উইকেটেও কাটাতে পারলাম।’

এআরবি/আইএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]