‘বাংলাদেশের সঙ্গে টেস্ট ড্র করে অধিনায়কত্ব ছাড়তে চেয়েছিলেন লারা’

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৭:২৬ পিএম, ২৩ জুন ২০২২

আগামীকাল ২৪ জুন থেকে সেন্ট লুসিয়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে যে টেস্ট শুরু হচ্ছে তাতে সাকিব, তামিম, মুমিনুলরা কী করবেন? টাইগারদের পরিণতিই বা কী হবে? তা বলে দেবে সময়।

তবে ইতিহাস আশা জোগাচ্ছে। জানিয়ে দিচ্ছে, এই সেন্ট লুসিয়া হতে পারে আলোকবর্তিকা। টেস্টে বাংলাদেশের চার-চারটি অধরা কৃতিত্ব প্রথম অর্জিত হয়েছিল এই সেন্ট লুসিয়ায়।

২০০৪ সালে (২৮ মে-১ জুন) সেন্ট লুসিয়ায় ব্রায়ান লারার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট জিততে না পারলেও হাবিবুল বাশারের দল রীতিমত ইতিহাস রচনা করেছিল।

ওই টেস্টে প্রথমতঃ বৃষ্টির সহায়তা ছাড়া নিজেদের মেধা, সামর্থ্য আর পারফরমেন্স দিয়ে টাইগাররা কোনো এক পরাশক্তির বিপক্ষে প্রথম টেস্ট ড্র করার কৃতিত্ব দেখিয়েছিল। যে ড্র’টা ছিল জয়ের চেয়েও বেশি।

এরসঙ্গে আরও কৃতিত্ব জড়িয়ে ছিল। যার দ্বিতীয়টি হলো, সেন্ট লুসিয়ার ওই টেস্টেই বাংলাদেশের তিন-তিনজন ব্যাটার (হাবিবুল বাশার ১৩১ বলে ১১৩, মোহাম্মদ রফিক ১৫২ বলে ১১১ এবং খালেদ মাসুদ পাইলট ২৮১ বলে ১০৩*) সেঞ্চুরি করেছিলেন। এর আগে এক টেস্টে ছিল কেবল দু’জনার সেঞ্চুরি (পাকিস্তানের বিপক্ষে জাভেদ ওমর ও হাবিবুল বাশার) থাকলেও এক টেস্টে তিনজনের সেঞ্চুরি ছিল সেটাই প্রথম।

Habibul Bashar Sumon

এছাড়া ওই টেস্টে আরও দুটি অভিনব কৃতিত্ব ছিল বাংলাদেশের। ওই সময়ের আলোকে যা ছিল প্রায় কল্পনার অতীত। তাহলো, ওই ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ৬৪ রানের লিড নিয়েছিল হাবিবুল বাশার সুমনের দল। আর দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন ৯ উইকেটে ২৭১ রান করে ইনিংস ঘোষণা করেন। স্ট্যাটাস প্রাপ্তির চার বছর পর সেটাই ছিল টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস ঘোষণা করার ঘটনা।

তাতে করে ওয়েষ্ট ইন্ডিজের সামনে শেষ ইনিংসে জয়ের টার্গেট দাঁড়ায় ৩৩৬। হাতে যে সময় ছিল, তাতে ক্যারিবীয়দের পক্ষে ওই রান তাড়া করে জেতা সম্ভব ছিল না। লারার দল তা পারেওনি। ম্যাচ তাই ড্র হয়ে যায়।

১৮ বছর পর সেই চার অধরা কৃতিত্ব স্পর্শ করার স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হাবিবুল বাশার। জাগো নিউজের সঙ্গে একান্ত আলাপে অনেক কথার ভিড়ে বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক ও ওই সিরিজে টাইগার ক্যাপ্টেন বলেন, ‘এখনকার প্রেক্ষাপটে চিন্তা করলে ঠিক বোঝাতে পারবো না, ওই টেস্ট ম্যাচটি আমাদের কাছে আসলে অনেক প্রাপ্তি ও অর্জনের। বলতে পারেন, টেস্ট জয় ছাড়া এক ম্যাচ থেকে যা যা অর্জন করা সম্ভব, ২০০৪ সালে সেন্ট লুসিয়ায় আমরা তা প্রথম অ্যাচিভ করেছি। প্রথমে ব্যাট ও বলে লড়াই করে টেস্ট ড্র, একসঙ্গে তিন জনের সেঞ্চুরি আর ইনিংস ঘোষণা- সবই হয়েছে ওই ম্যাচে।’

Habibul Bashar Sumon

‘আর যাদের সঙ্গে করেছি, ব্রায়ান লারার নেতৃত্বের দলটিও কি দারুন শক্তিশালী ছিল! ক্রিস গেইল, ডেভন স্মিথ, রামনরেশ সারওয়ান, ব্রায়ান চার্লস লারা, শিব নারায়ন চন্দরপল, ডোয়েন স্মিথের সঙ্গে ৪ ফাস্ট বোলার টিনো বেস্ট, ফিডেল এডওয়ার্ডস, পেড্রো কলিন্স আর জারমেইন লওসন। সবাই ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করতেন।’

সেই ম্যাচের প্রসঙ্গ টেনে সুমন আরও যোগ করেন, ‘জানেন ওই টেস্টে আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান গ্রেট ক্রিস গেইলের দু’তিনটি ক্যাচ ফেলে দিয়েছিলাম। গেইল সেঞ্চুরি (১৪২) করেছিলেন। আমরা সময়মত ওই ক্যাচগুলো ধরতে পারলে আরও ভাল অবস্থায় থাকতে পারতাম।’

নিজের সেঞ্চুরিটা তার কাছে এখনো অন্যরকম অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। বাশার জানান, ‘এখনো মনে আছে আমি ওই ম্যাচে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে কাউন্টার অ্যটাক করেছিলাম।’ সেটা কেমন?

‘মানে ক্যারিবীয় ফাস্ট বোলারদের বিপক্ষে আমি শুরু থেকেই পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছি। কারণ, দ্বিতীয় ইনিংসের প্রথম বলেই আমরা উইকেট হারাই। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ফাস্ট বোলার পেড্রো কলিন্সের প্রথম বলেই আমাদের ওপেনার হান্নান সরকার সাজঘরে ফেরত আসে। আমাকে তিন নম্বরে উইকেটে যেতে হয় ঠিক ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই। আমি উইকেটে গিয়েই পড়ি ক্যারিবীয় ফাস্ট বোলিং তোপের মুখে। তখন আমি চিন্তা করি, তাদের এই ১৪০ প্লাস গতির ডেলিভারির বিপক্ষে লড়াই করতে হলে পাল্টা আঘাত করতে হবে। তাই একদম শুরু থেকে পাল্টা চালিয়ে খেলতে শুরু করি। ক্যারিবীয়দের আগ্রাসী বোলিংয়ের বিপক্ষে আমিও চরম আক্রমণাত্মক মেজাজে উইকেটের চারিদিকে ইচ্ছেমত শটস খেলে শতরান পূর্ণ করি।’

Habibul Bashar Sumon

পরিসংখ্যানও বাশারের কথার সত্যতা জানান দিচ্ছে। তিনি মাত্র ৩ ঘণ্টা ১৭ মিনিট উইকেটে থেকে ১৩১ বলে ৮৬.২৫ স্ট্রাইকরেটে শতকরানটি পূর্ণ করেন। যার মধ্যে ৬০ রান আসে শুধুই বাউন্ডারি থেকে।

তবে ম্যাচ ড্র‘র বিচেনায় অধিনায়ক হাবিবুল বাশার তার সহযোদ্ধা খালেদ মাসুদ পাইলট আর নিচের দিককার ব্যাটারদের কৃতিত্ব দিয়েছেন বেশি।

তার মূল্যায়ন, ‘ওই ম্যাচে আমাদের টিম এফোর্ট ছিল অসাধারণ। ব্যাটাররা সবাই ভাল খেলেছে। সেঞ্চুরি না পেলেও প্রথম ইনিংসে আশরাফুল দারুন ব্যাটিং করেছে। আর রফিক, পাইলট এবং আমিতো সেঞ্চুরিই করেছি। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে চরম সংকটে পাইলটের অনমনীয় দৃঢ়তা, চরম ধৈর্য্য আর তিন লোয়ার অর্ডারে রফিক, তাপস বৈশ্য এবং তারেক আজিজের সময়মত জ্বলে ওঠা আমাদের বিপদ কাটাতে দারুণ সহায়তা করেছে। এক সময় আমরা ইনিংস ঘোষণা করার মত অবস্থায়ও চলে যাই। ১০০‘র নিচে ৬ আর শতরান পার হতেই ৭ উইকেট হারিয়ে বসা এবং এরপর ২৭১ পর্যন্ত যাওয়া এবং অলআউট না হওয়া- ওই ম্যাচের প্রেক্ষাপটে সেটা ছিল দুর্দান্ত কৃতিত্ব। আমরা সেটা করেছিলাম।’

Habibul Bashar Sumon

সেন্ট লুসিয়ায় বাংলাদেশের দারুন উজ্জ্বল আর উজ্জীবিত পারফরমেন্স ভক্ত ও সমর্থকদের মাঝে খুশির ঝিলিক বয়ে গেলেও স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজ শিবিরে বয়ে এনেছিল গভীর হতাশা। ৪০০ প্লাস স্কোর গড়ে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে লিড নিতে পারে, আবার পরেরবার কঠিন বিপদে পড়েও (৭৯ রানে ৬ উইকেট হারিয়েও) উল্টো ২৭১ রান করে ম্যাচ ড্র করে বসতে পারে- সেটা ক্যারিবীয়রা স্বপ্নেও ভাবেনি।

ওয়েষ্ট ইন্ডিজ ক্যাপ্টেন ব্রায়ান লারা রীতিমত হতাশায় মুষড়ে পড়েন। তা জানিয়ে বাশার বলেন, ‘আমাদের টিম স্পিরিট আর টিম পারফরমেন্স ওয়েস্ট ইন্ডিজকে চরম হতাশায় ডুবিয়েছিল। তার একটি বড় উদাহরন দেই। আমরা সেন্ট লুসিয়ায় টেস্ট ড্র করার পর ওয়েষ্ট ইন্ডিজ ক্যাপ্টেন ব্রায়ান লারা এতটাই হতাশ হয়েছিলেন যে, টেস্ট শেষে তিনি বলে ফেলেন, যদি পরের টেস্টে বাংলাদেশকে হারাতে না পারি- তাহলে আর ক্যাপ্টেন্সিই করবো না।’

এআরবি/আইএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]