শেষ মুহূর্তের আত্মঘাতী গোলে সর্বনাশ মরক্কোর

স্পোর্টস ডেস্ক
স্পোর্টস ডেস্ক স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:০৮ পিএম, ১৫ জুন ২০১৮

খেলা প্রায় শেষ। ইনজুরি সময়ের ৫ম মিনিটের খেলা চলছিল তখন। গোলশূন্য ড্র নিয়েই মাঠ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সেন্ট পিটার্সবার্গের দর্শকরা। কিন্তু নিয়তি তখনও চমক লিখে রেখেছিলেন যে, সেটাই বা ক’জন জানতো।

ম্যাচের একেবারে ইনজুরি সময়ে ফ্রি কিক পেলো ইরান। বাম উইং থেকে এহসান হাজসাফি ফ্রি কিক নিলেন। সেই বল ফেরাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে হেড করলেন আজিজ বোহাদ্দুজ। কিন্তু কী নিয়তি, বল ক্লিয়ার না হয়ে সোজা প্রবেশ করলো মরক্কোর জালেই। আত্মঘাতি এই গোলেই ইরানের কাছে হেরে গেলো মরক্কো।

পুরো ম্যাচ আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণে পুরো ম্যাচটাতেই প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল মরক্কো। আক্রমণের শানানোর পাশাপাশি ইরানের আক্রমণ ঠেকানোর জন্যও রক্ষণভাগকে বেশ কঠিন করে রেখেছিল মরক্কানরা। নিজেদের সীমানায় বল প্রবেশ করানোর কোনো সুযোগই ইরানের ফরোয়ার্ডদের দিলো না তারা।

অথচ, ইরানের শেষ মুহূর্তের আক্রমণ ঠেকানোর জন্য ফরোয়ার্ড আজিজ বোহাদ্দাজরা পর্যন্ত চলে এসেছিলেন রক্ষণে। ৭৭ মিনিটে আইয়ুব আল কা’বির পরিবর্তে মাঠে নামেন আজিজ।

কিন্তু কী দুর্ভাগ্য অনিয়মিত ডিফেন্ডারই বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালে বল জড়িয়ে দিলেন। যেন ফ্রি কিক থেকে ভেসে আসা বলটিকে তিনি প্রতিপক্ষের জালে জড়ানোর জন্যই হেড করলেন। নিজেদের জালে বল জড়িয়ে যেতেই হতাশায় মাটিয়ে শুয়ে পড়লেন আজিজ। সতীর্থরা এসে তাকে স্বান্তনা দিচ্ছিলেন; কিন্তু তাতে তো আর গোল করে ফেলার স্বান্তনা পেতে পারেন না!

দুই মুসলিম দেশের লড়াই। সেন্ট পিটার্সবার্গে অবশ্য তাদের খেলা দেখার জন্য গ্যালারি ছিল ভর্তি। আগের ম্যাচে যেমন মিসর-উরুগুয়ের ম্যাচে প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি আসন খালি ছিল, তেমনটা দেখা যায়নি সেন্ট পিটার্সবার্গে। দুই সম শক্তির দলের লড়াইটা ছিল শুরু থেকেই উপভোগ্য। আক্রমণের পর পাল্টা আক্রমণ। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীতা। কিন্তু গোলের খেলায় একমাত্র গোলটি হলো একেবারে শেষ মুহূর্তে। এর আগে দুই দল প্রথমার্ধ শেষ করলো গোলশূন্যভাবেই।

তবে মরক্কোর তুমুল আক্রমণের সামনে ইরানের গোলরকক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দ ছিলেন যেন এক শীষাঢালা প্রচীর। আক্রমণের সয়লাব তিনি কঠিন হাতে ঠেকিয়ে দিয়েছেন। জয় বঞ্চিত রেখেছেন মরক্কোকে। যে কারণে দেখা গেলো ম্যাচের পর আনন্দে কেঁদে দিয়েছেন তিনি।

১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে এই প্রথম কোনো জয় পেলো ইরান। একই সঙ্গে ২০১০ সালে জাপানের কাছে ক্যামেরুনের ১-০ গোলে হারের পর এই প্রথম কোনো আফ্রিকান দল হারলো এশিয়ান কোনো দেশের কাছে। যদিও ম্যাচের শুরু থেকেই দেখা যাচ্ছিল দারুণ শক্তিশালী দল মরক্কো। কিন্তু তাদের সবগুলো আক্রমণই এসে থমকে যায় ইরানের সামনে এসে। মরক্কান মিডফিল্ডার ইউনেস বেলহান্দা কিংবা ডিফেন্ডার মেধি বেনাতিয়াদের দুর্দান্ত শটও রুখে দিয়েছিলেন ইরান গোলরক্ষক।

ইরানও কম যায়নি। প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্ত থেকে তারাও দারুণ আক্রমণে ব্যস্ত করে তোলে মরক্কোর রক্ষণভাগ। ভাহিদ আমিরির কাছ থেকে বল পেয়ে দারুণ এক গোলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন সরদার আজমাউন। কিন্তু ‘ইরানিয়ান মেসি’ আর পারেননি সেই বলটিকে কাজে লাগাতে। তিনি যখন ভালোভাবে শটটি নেয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখনই ঝাঁপিয়ে পড়ে দলকে রক্ষা করেন মরক্কো গোলরক্ষক মুনির। তার কিছুক্ষণ পরই হাজসাফির দারুণ এক ফ্রি-কিকের শট একেবারে বার ঘেঁষে চলে যায় মাঠের বাইরে।

দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলেরই শক্তি ছিল প্রায় সমান সমান। কেউ কারও জালে ভালো কোনো আক্রমণ যখন করতে পারছিল না, তখন খেলার ৫৫ মিনিটে দারুণ এক গোলের সুযোগ তৈরি করেন হাকিম জিয়েচ। কিন্তু তার দুর্দান্ত শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন ইরানি গোলরক্ষক।

দ্বিতীয় মিনিটেই গোল লক্ষ্যে শট। ইরানের বক্সের বাম পাশ থেকে গোলমুখে শটটি নেন তিনি। যদিও তার ডান পায়ের শটটি সাইড বারের পাশ দিয়ে চলে যায় বাইরে। শুরু থেকেই আক্রমণের তীব্রতা মরক্কোর। তার কিছুক্ষণ পরই গোলের দারুণ একটি সুযোগ তৈরি করে মরক্কো। নরদিন আমরাবাতের ক্রস থেকে বল পেয়ে দুরহ কোণ থেকে হেড করেন ইউনুস বেলহানদা। যে কারণে তার হেডটি চলে যায় বারের ওপর দিয়ে।

আক্রমণ শানানোর পাশাপাশি দারুণ ডিফেন্সও তৈরি করে মরক্কো। আফ্রিকান দেশটি যেন নিজ মহাদেশের রেকর্ড অক্ষুন্ন করার লক্ষ্যেই মাঠে নামে সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামে। বিশ্বকাপে আফ্রিকান-এশিয়ান দেশগুলোর ৫ বারের মুখোমুখি লড়াইয়ে একবারও হারেনি আফ্রিকানরা। মরক্কোর সামনে সেই রেকর্ড অক্ষুন্ন রাখারও কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। ২০১০ সালে ক্যামেরুনকে জাপান ১-০ গোলে হারানোর পর থেকে ৫ ম্যাচের মধ্যে ৩টিতে জিতেছে আফ্রিকানরা। ২টি হয়েছে ড্র। শেষ পর্যন্ত তারা পারলো না রেকর্ডটি ধরে রাখতে।

৮ম মিনিটে আইয়ুব এল কা’বির বাম পায়ের শট চলে যায় পোস্টের বাম কোন ঘেঁষে। ১২ মিনিটে ইরান প্রথম সুযোগ তৈরি করে। মরক্কোর রক্ষণভাগে বল নিয়ে গেলেও তুমুল বাধার মুখে ফ্রি কিক পায় ইরান। ২৫ গজ দুর থেকে শট নেন এহসান হাজসাফি। আমিরি বল পেয়ে সেটি ক্রস করেন আজমাউনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু জটলার মধ্যে মোহাম্মেদি বল পেয়েও সেটিকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন।

এরপর ১৮ মিনিটে ইরানর জালে অসাধারণ এক আক্রমণ সাজায় মরক্কোর। নরদিন আমরাবাত কিংবা রোমান সেইসরা চারবারের চেষ্টায়ও ইরানের জালে বল প্রবেশ করাতে পারেনি। ২০ মিনিটে একই ধরনের আরও একেটি আক্রমণ তৈরি করে মরক্কানরা। অথচ গোল করতে ব্যর্থ হলো তারা।

২১ মিনিটে ইরান সত্যিকার কোনো আক্রমণ তৈরি করে। করিম আনসারিফার্ড বক্সের ভেতর বল পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা আর কাজে লাগাতে পারলেন না। এরপর দু’দলই বিক্ষিপ্ত কিছু আক্রমণ তৈরি করে। কিন্তু ৪৩ মিনিটে দারুণ গোলের সুযোগ তৈরি করেন আজমাউন। কিন্তু সেই সুযোগটা হেলায় হারালেন তিনি।

আইএইচএস

আপনার মতামত লিখুন :