যেভাবে ফিফা রেফারি হলেন নেত্রকোনার কন্যা সালমা আক্তার মনি

রফিকুল ইসলাম
রফিকুল ইসলাম রফিকুল ইসলাম , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৭:৫৬ পিএম, ২৪ আগস্ট ২০১৯

বিকেল হলে নেত্রকোনা স্টেডিয়ামে ক্রীড়াবিদদের মেলা বসে। কেউ ফুটবল খেলেন, কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়েন ক্রিকেট কিংবা অ্যাথলেটিকস নিয়ে।

নেত্রকোনা আদর্শ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সালমা আক্তার মনি অ্যাথলেটিকস অনুশীলন শেষ করেই নেমে পড়তেন ফুটবল নিয়ে। ফুটবলের সঙ্গে মনির পরিচয় সেখান থেকেই। ছোটকাল থেকে ঝোঁক ছিল অ্যাথলেটিকসেই- খেলতেন ১০০ ও ২০০ মিটার স্প্রিন্ট, দীর্ঘ লম্ফ ও উচ্চ লম্ফ। ২০১২ সালে জাতীয় জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে দীর্ঘ লম্ফে ব্রোঞ্জও জিতেছিলেন তিনি।

অ্যাথলেটিকস-ফুটবলের পাশপাশি হ্যান্ডবলও খেলতেন মনি। ময়মনসিংহ অঞ্চলের হয়ে জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৬ হ্যান্ডবল চ্যাম্পিয়নশিপেও অংশ নিয়েছেন। ফুটবলে তার গন্ডিটা ছিল জেলা পর্যায়েই। অথচ সেই ফুটবলেই ইতিহাস গড়লেন নেত্রকোনার কন্যা সালাম আক্তার মনি। বাংলাদেশে প্রথম যে দুই নারী ফিফা রেফারি হয়েছেন একদিন আগে, তার মধ্যে মনি একজন। অন্যজন বিকেএসপির নারী ফুটবলের কোচ জয়া চাকমা।

রাঙ্গামাটির জয়া চাকমা ফুটবলে পরিচিত মুখ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন, ফুটবল খেলেছেন। লাল-সবুজ জার্সিতে প্রতিনিধিত্ব করেছেন জাতীয় দলেও। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) নারী ফুটবলের কোচ। ১০ বছর ধরে আছেন রেফারি হিসেবে। বাঁশি বাজিয়েছেন ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচে। সে তুলনায় সালমা আক্তার মনি কমই ছিলেন প্রচারের আলোয়। ফিফা রেফারি হওয়ার পর নেত্রকোনার এ যুবতী এখন মিডিয়ার আলোয়।

স্কুল জীবনে অ্যাথলেটিকসের ফাঁকে ফাঁকে ফুটবল খেলা সেই সালমা কিভাবে হলেন বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা ফিফার রেফারি? কিভাবে তিনি হলেন বাংলাদেশের ফুটবলের এই ইতিহাসের অংশ?

আজ (শনিবার) বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে দাঁড়িয়ে জাগো নিউজের পাঠকদের সেই গল্প শোনালেন সালমা আক্তার মনি। যে মাঠেই আগের দিন পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রেফারি হিসেবে বাঁশি বাজানোর অপেক্ষায়।

নেত্রকোনা সদরের মো. শহর আলী ও রেখা আক্তার দম্পতির এক পুত্র ও ৩ কন্যার মধ্যে সবার ছোট সালমা আক্তার মনি। ব্যবসায়িক বাবা আর গৃহিনী মায়ের ছোট সন্তান সালমা এখন আর ওই পরিবারের গর্ব নন, গর্ব পুরো বাংলাদেশের। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় বড় ম্যাচে বাঁশি বাজানো বা পতাকা হাতে তার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে যে লাল-সবুজের দেশের নামও ছড়িয়ে পড়বে বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনে!

নেত্রকোনা আদর্শ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও ঢাকার বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে এখন স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজে। লেখাপড়ার পাশপাশি ফুটবল রেফারি হওয়ার জন্য যে পরিশ্রম করে গেছেন মনি তার পূর্ণতা এসেছে ২৩ আগস্ট। দিনটি তার জন্য স্মরণীয়। স্মরণীয় দেশের ফুটবলের জন্যও। এই দিনটিতেই যে প্রথম দুইজন নারী ফিফা রেফারি পেলো বাংলাদেশের ফুটবল।

অ্যাথলেটিকসে ভালো। রানিং আর ফিটনসে যুতসই দেখেই তার গ্রামের এক ফিফা রেফারি ফেরদৌস আহমেদ পছন্দ করেন, সালমা আক্তার মনিকে। একদিন মনিদের বাড়ি গিয়ে তার মায়ের কাছে ফেরদৌস প্রস্তাব দেন তাকে রেফারি শেখানোর। মনির মা সম্মতি দিলে শুরু হয়ে মনির রেফারিং জগতে পথচলা।

সেই শুরুর গল্পটা শোনা যাক সালমার কাছেই ‘২০১৩ সালে বাফুফে আমাদের নেত্রকোনায় ৭ দিনের একটা রেফারিং কোর্স করেছিল। ছেলেদের সঙ্গে একমাত্র আমি ছিলাম ওই কোর্সের একমাত্র নারী অংশ গ্রহণকারী; কিন্তু শুরুতে বাধা পেয়েছিলাম। কারো নাম বলতে চাই না। কিন্তু আমাদের জেলা ক্রীড়া সংস্থার কেউ কেউ আমার অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, বাধা দিয়েছিলেন। অভিযোগ ছিল আমার নাকি বয়স কম ছিল রেফারিং কোর্সের জন্য। তারপরও আমি করেছি। ওই কোর্সের প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন সাবেক রেফারি এম আর মুকুল স্যার। কোর্সে আমি তৃতীয় হয়েছিলাম।’

এভাবে কোর্সের প্রতিটি ধাপ পার হয়ে ২০১৬ সালে জয়া চাকমার সঙ্গে এক সাথেই জাতীয় রেফারি হন মনি। এবার দুইজন এক সাথেই হলেন ফিফা রেফারি। অথচ মনি এক পর্যায়ে রেফারি প্রশিক্ষণ ছেড়েই দিয়েছিলেন। ‘ব্যাক্তিগত কিছু কারণে আমি ২০১৭ ও ২০১৮ সালে রেফারি প্রশিক্ষণ থেকে দুরে ছিলাম; কিন্তু আমি আবার ফিরে আসি এ বছর এবং এই ফিরে আসার পেছনে নাহিদ ভাই’র (রেফারি মাহমুদ জামাল ফারুকী নাহিদ) অবদান সবচেয়ে বেশি। তার অনুপ্রেরণায় আমি আবার প্র্যাকটিস শুরু করি এবং এবার দ্বিতীয়বারের মতো ফিফা রেফারি হওয়ার পরীক্ষা দেই। আল্লাহর রহমতে দ্বিতীয় পরীক্ষাতেই পাশ করি। ২০১৭ সালে প্রথমবার দিয়েছিলাম। পাশ করতে পারিনি’- বলছিলেন সদ্য ফিফা রেফারি হওয়া সালমা আক্তার মনি।

দুইজন এক সঙ্গে ফিফা রেফারি হয়েছেন। তবে জয়া ও সালমার একজন হবেন রেফারি, অরেকজন সহকারী। ফিফার কোটা এরকমই। এখন বাফুফের রেফারিজ কমিটি যেভাবে ফিফায় নাম পাঠাবে সেভাবেই তাদের একজন রেফারি হবেন, আরেকজন সহকারী।

এ ক্ষেত্রে রেফারি হওয়ার সম্ভাবনা জয়া চাকমারই বেশি। কারণ, মনির চেয়ে তার ক্যারিয়ারটা বেশি সমৃদ্ধ। মনি যে ১৫টি ম্যাচে রেফারি ও সহকারী রেফারির দায়িত্ব পালন করেছেন তা দক্ষিণ এশিয়াতে- বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, নেপাল ও ভুটানে। জয়া চাকমা ৩৫টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করেছেন। দক্ষিণ এশিয়া, এশিয়া ছাপিয়ে ইউরোপেও রেফারির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

‘আমার ইচ্ছে রেফারি হওয়া। এখন রেফারিজ কমিটি যেভাবে নাম পাঠাবে সেভাবেই হবে। যে দায়িত্বই পাই আমি, তাতে এলিট রেফারি হতে চাই। এই পেশাটা অনেক চ্যালেঞ্জিং। আমি চ্যালেঞ্জ নিয়েই দায়িত্ব পালন করে দেশের সুনাম অর্জন করতে চাই। জানি, এই পেশায় ভুলগুলো নিয়েই বেশি আলোচনা-সমালোচনা হয়। আমার স্বপ্ন ছিল ভালো রেফারি হওয়া। ফিফার রেফারি হয়ে ভালোভাবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সেই পূর্ণতা আসবে’- বলছিলেন সালমা আক্তার মনি।

আরআই/আইএইচএস/এমকেএইচ