আপনি ফিরে আসবেন, ম্যারাডোনা...

ক্রীড়া প্রতিবেদক ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৩৭ এএম, ২৬ নভেম্বর ২০২০

কোনো এক অবসন্ন বিকেলের ফুটবল খেলার মুহূর্ত মনে পড়ে আপনার? রঙহীন আকাশ, মেঘে ঢেকে যাওয়া, চুপচাপ। আপনি আর আপনার দস্যি বন্ধুবান্ধব। অথবা ছুপছুপিয়ে বৃষ্টি পড়া শুরু হলো, আপনি সরলেন না এমন কিছু। আপনার প্রথম ফুটবল খেলার দিন? মনে নেই?

তাহলে মনে করুণ, কোন বিশ্বকাপটা স্পষ্ট মনে আছে প্রথম। ফুটবল অবশ্যই। সেই বিশ্বকাপে আকাশি-সাদা কোনো পতাকা দেখে কি আপনি মায়ায় আটকে গিয়েছিলেন? তার কয়েকদিন পর জেনেছেন কোনো এক জাদুকরকে? বুটজোড়া পরে নিয়ে ফুটবল পায়ে অবিশ্বাস্য হয়ে ছুঁটতেন যিনি। তেমন কেউ।

প্রজন্মের ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ নয়। খেলা দেখেছেন কিনা, সেটাও। আপনি ফুটবল বোঝেন। চেনেন আকাশি সাদা জার্সি! তখন আপনাকে দিয়েগো ম্যারাডোনাকে চেনেন কিনা জিজ্ঞেস করাটা বোকামি হয়ে যায় বড্ড। সে প্রশ্ন না করে বরং জিজ্ঞেস করা যায়, আপনি কাঁদছেন কি?

***

আর্জেন্টিনা এমনিতে ফুটবলারদের উর্বরভূমি। সেটা জানে সবাই। আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর মতো ফুটবলারের জন্ম এখানে। তবুও আর্জেন্টিনার বুইন্স এরেইনা লুসনা শহর ৩০ অক্টোবর ১৯৬০ সালে সাক্ষী হলো অন্যকিছুর। জাদুকরের আগমনের।

সাত বছর বয়সে ক্লাবে খেলা শুরু। এরপর যে কত কিছু...কত প্রাপ্তি। সেসব গল্প জানা সবার। কোনো এক বেকার দিনে বসে হিসাব করা যাবে সেটা। আজকের দিনটা একেবারে অন্যরকম। ম্যারাডোনা চলে গেছেন বলে।

কোন ম্যারাডোনা? মুঠোবন্দি স্বপ্নের ডানা তিনি উড়িয়েছেন আকাশে। যার হাত মুক্তির আনন্দ এনে দিয়েছে সব আর্জেন্টাইনের মনে। খুন করেছে ইংল্যান্ডের কোটি ভক্তের হৃদয়। পা আশার সঞ্চার করেছে মুহূর্তে, আর্জেন্টাইনদের। বিষণ্নতায় ডুবিয়েছে প্রতিপক্ষকে।

যিনি পাগলাটে হয়ে ছুঁটেছেন বল পায়ে। একা হয়ে। গোল করেছেন, করিয়েছেন। জিতিয়েছেন বিশ্বকাপ। কেঁদেছেন, হাসিয়েছেনও। আসলে তিনি কি করেননি? এই প্রশ্নই বরং যথার্থ হবে।

***

ম্যারাডোনা চলে গেছেন। আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না এখনো? না হওয়াটাকেই বিশ্বাস করে রাখুন। ম্যারাডোনারা কখনো হারিয়ে যান না। তারা ফিরে আসেন বারবার। কখন?

আর্জেন্টিনার কোনো এক অধিনায়ক বিশ্বকাপটা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। খানিক আগে চুমু এঁকেছেন সেই ট্রফিতে। আপনি হাজার কোটি মাইল দূরে। বাংলাদেশের কোনো এক মফস্বল কিংবা শহরের টিভির সামনে। বলুন, ম্যারাডানো কি আপনার কাছে ফিরে আসবেন না?

ম্যরাডোনা আর কোথায় আসবেন? নাপোলিতে গিয়ে সেটি জিজ্ঞেস করে দেখুন। ম্যারাডোনা সেখানকার সব কোণায় লুকিয়ে। নাপোলির সবকিছুতে। ট্রফিতে, না পাওয়ায়, আক্ষেপে, হতাশা কিংবা আনন্দে।

নাপোলির বড় কোনো সাফল্য নেই অনেকদিন। কোনো একদিন যদি তারা সেটা পেয়ে যায়। নাপোলির যে কাউকে আপনি চাইলে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসতে পারেন, ম্যারাডোনা ফিরে এসেছিলেন কিনা।

অথবা ম্যারাডোনাকে আপনি খুঁজে পাবেন নতুন কারো মাঝে। হয়তো আর্জেন্টিনা থেকে উঠে আসা কেউ, অথবা না। আপনি তাকে দেখছেন পাঁচ-ছয়জনকে ফেলে রেখে বল নিয়ে ছুটছে।

একাই জিতিয়ে দিচ্ছে ম্যাচ। ড্রিবলিংয়ে কাবু করছে ডিফেন্ডারদের। আপনি সত্যিকারের ‘ফুটবলীয় শিল্প’ দেখেছেন কারো খেলায়। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থেকেছেন অনেকক্ষণ। আপনি বলুন, ম্যারাডোনাকে আপনার মনে পড়বে না?

অথবা কোনো এক ভালো ফুটবলার। খ্যাপাটে জীবনযাপন করলে। অনিয়ন্ত্রিত ক্যারিয়ার হলে। আপনার কি মনে হবে না এই ছেলেটা ম্যারাডোনার মতো জীবন চালাচ্ছে। তখন কি ফিরে আসবেন না ম্যারাডোনা?

Maradona

তিনি আসলে ফিরে আসবেন সবকিছুতে। ফুটবলের, আর্জেন্টিনার। সব কিছু মানে সত্যিকারার্থেই সব। ট্রফি না জেতার ক্ষণ গণনা শুরু হলে। সেটা এক, দুই করে দশ হাজার দিনে পৌঁছে গেলে। আপনার নিশ্চয়ই মনে হবে ‘ইস! আরেকবার যদি কেউ ম্যারাডোনা হতেন!’

অথবা তার উল্টোটাতেও ফিরে আসবেন ম্যারাডোনা। কোনো এক আর্জেন্টাইন অধিনায়ক বিশ্বকাপ ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরলে। ভেজা চোখে চুমু খেলে সোনালি সেই ট্রফিতে। আপনার তখন মনে হবে, ‘ইস! ম্যারাডোনা দেখে যেতে পারলেন না।’ ম্যারাডোনা ফিরে আসবেন তখনো।

ওই ট্রফি উঁচিয়ে ধরার দিনে নিশ্চয়ই ভিজে উঠবে কোটি আর্জেন্টাইন ভক্তের চোখ। ঘুম হবে না। আনন্দে, পাওয়ার খুশিতে। রাত জেগে জেগে আপনার ম্যারাডোনাকে মনে পড়বে না তখন?

খ্যাপাটে একজন। মাদক আর মদ। আস্ত একটা জীবনের উপভোগ করেছেন বেশির ভাগটাই। ক্যারিয়ারে, জীবনে খারাপ সময়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এগিয়েছেন নিজের গতিতে। যেমনটা ফুটবাল পায়েও এগোতেন তিনি। তাতে কোটি মানুষের হৃদয়ে স্বপ্ন দেখার মন্ত্র জপে দিয়েছেন তিনি।

আকাশি-সাদা জার্সিকে চিনিয়েছেন, শিখিয়েছেন ভালোবাসতে। পুরো পৃথিবী ব্যাপি। ফুটবল পায়ের জাদুতে মুগ্ধ করে চলেছেন। আর্জেন্টিনায়, বার্সেলোনাতে, নেপোলিতে। সবখানে, পুরো পৃথিবীতে।

ম্যারাডোনা তাই ফিরে আসবেন বারবার। আর্জেন্টিনার ব্যর্থতায়, সফলতায়। ট্রফি জিততে না পারায় অথবা জয়ে। নাপোলির আবার বড় কোনো আসরে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দিনে। কোনো প্রতিভাবান তরুণের হয়ে। 'এই ছেলেটা ম্যারাডোনার মতো খেলে' বলায়। খ্যাপাটে, অনিয়ন্ত্রিত জীবনের কোনো সেরা হয়ে।

কোনো এক সকালের চায়ের সঙ্গে দেখা ফুটবলে। অথবা তার কোনো ভক্তের দৃষ্টিতে, অঁজোপাড়াগায়ে। মফস্বলে, শহরে, উন্নত অথবা অনুন্নত কোনো এক দেশে। টিভি পর্দায়, ফোনের স্ক্রিণে অথবা ছোট্ট এক মাঠের তরুণ ফুটবলার হয়ে। ম্যারাডোনা ফিরে আসেন। একবার, বারবার, বহুবার।

সবকিছুর আগে প্রশ্ন। ম্যারাডোনা কি সত্যিই চলে গেছেন? যেতে পারেন আসলেই?

লিখেছেন : মাহমুদুল হাসান বাপ্পি।

এমএইচবি/আইএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]