ভাসানী স্টেডিয়াম যেন বিরাণভূমি

রফিকুল ইসলাম
রফিকুল ইসলাম , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৬:১৪ পিএম, ০৮ জানুয়ারি ২০১৮

চারিদিকে কোলাহল। মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের চার পাশ ঘিরে চলমান সব ব্যবসাই রমরমা। স্টেডিয়ামের প্রধান ফটকের এপার-ওপারে পা রাখার জায়গা নেই। গাড়ীর হর্ণ, হকারদের চিল্লাপাল্লা আর ক্রেতা-পথচারীদের ব্যস্ততায় গমগম পুরো এলাকা। অথচ স্টেডিয়ামের ভেতরটাই নীরব-নিস্তব্ধ, যেন প্রাচীরে ঘেরা এক বিরাণভূমি।

স্টেডিয়ামের প্রধান প্রবেশদ্বারে চোখে পড়বে বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠনের টানানো গোটা পঁচিশেক ব্যানার। সবগুলোই বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক খাজা রহমতউল্লাহর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে। সিঁড়ি ভেঙ্গে দোতলায় উঠে ফেডারেশনের কার্যালয়ের করিডোরের দিকে চোখ পড়তেই দেখা যাবে শোক প্রকাশের আরেকটি পোস্টার। একটি ছবি যেন তাকিয়ে নীল টার্ফের দিকে। এশিয়া কাপের পরপরই চির বিদায় নিয়েছেন খাজা রহমতউল্লাহ। তার আত্মাও যেন হাহাকার করছে হকির এ হাল দেখে।

ফেডারেশনে কর্মকর্তাদের কক্ষগুলোয় তালা ঝুলছে। দরজার নামফলকগুলো উঠানো হয়েছিল এশিয়া কাপের সংস্কার কাজের সময়। সবগুলো আর লাগেনি। লাগবে কিভাবে? এশিয়া কাপের পর তো আর ফেডারেশনে পা পড়ছে না কর্মকর্তাদের। মাঝে-মধ্যে দুয়েকজন আসেন। কিছু সময় বসে চলে যান। বড়জোড় এক কাপ চা পানের সময়টা ব্যয় করেন ফেডারেশনে। অলস সময় কাটাচ্ছেন বেতনভূক্ত স্টাফরাও। তাদেরও তো কোনো কাজ নেই।

হকি ফেডারেশনের স্টাফ ৬ জন। হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা তৈয়বুর রহমান, কম্পিউটার অপারেটর হুমায়ুন আহমেদ, অফিস সহকারী আ. মান্নান চৌধুরী, পিয়ন আবু হাসান নান্নু, মাঠকর্মী বাবুল মিয়া ও সুইপার কান্ডিয়া। তারা বেতনটা পাচ্ছেন নিয়মিত। অফিসও করছেন। কিন্তু সেটা তাদের কারোরই ভালো লাগছে না। ফেডারেশন কার্যালয়ে পা রাখতেই তাদের একজনের আকুল জিজ্ঞাসা ‘স্যার, ফেডারেশনের খবর কী? নির্বাচন হবে নাকি অ্যাডহক কমিটি? চোখে-মুখে তার সংশয়। হকিটা কী তাহলে ধ্বংস হয়ে যাবে?

Hockey-1

অক্টোবরে এশিয়া কাপ উপলক্ষ্যে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ হয়েছে মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামে। ফ্লাডলাইট ও ডিজিটাল স্কোরবোর্ড বসেছে। কর্মকর্তাদের দোতলায় ওঠার জন্য বসেছে লিফট। সেটা আর চালাতে হয়নি এশিয়া কাপের পর। কর্মকর্তারা ফেডারেশনে পা রাখলেই না লিফট চলবে! এশিয়া কাপে জ্বলা ফ্লাডলাইড দাঁড়িয়ে স্বাক্ষীগোপাল হয়ে। জড়ো পদার্থটির প্রাণ থাকলে হয়তো বলতো, আমি জ্বললাম, আর হকির আলো নিভে গোলো? স্কোরবোর্ডের গায়ে ময়লা লেগে বিবর্ণ হচ্ছে। পুরো স্টেডিয়ামে দমবন্ধ পরিবেশ। হকি স্টেডিয়ামের বাইরে সবকিছু রমরমা হলেও ভেতরে শুধু হকিটাই নেই।

নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে আগেই। নতুন নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরুর পর মাঝপথে স্থগিত করা হয়েছে দেশে বন্যার কারণ দেখিয়ে। নির্বাচন পরিচালনার মালিক জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বলেছিল, এশিয়া কাপের পরই নির্বাচন সম্পন্ন হবে। এশিয়া কাপের পর একাধিকবার প্রতিষ্ঠানের প্রধান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ড. বীরেন শিকদারও বলেছিলেন- নির্বাচন সহসাই হবে; কিন্তু ওই পর্যন্তই। এশিয়া কাপের পর তিন মাস চলে যেতে বসেছে। কিন্তু না হচ্ছে নির্বাচন, না হচ্ছে অ্যাডহক কমিটি গঠন। দেশের তৃতীয় জনপ্রিয় খেলাটি গলাটিপে হত্যার দায়িত্ব যেন নিয়েছে ফেডারেশনের জন্মদাতা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদই।

নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ শেষ। নেই অ্যাডহক কমিটি। স্থগিত হওয়া নির্বাচন সম্পন্নের পরিবর্তে অ্যাডহক কমিটি গঠনের চাপ এক পক্ষের। সেখানেও সমস্যা। কে থাকবেন, কাকে রাখা যাবে না- এমন প্রেসক্রিপশনের চাপে চ্যাপ্টা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। ফেডারেশনগুলোর নির্বাচনে দেশের ক্রীড়া প্রশাসন প্রতিষ্ঠানটি যেন ঠুঁটো জগন্নাথ! প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদেরও এ নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। না থাকারই কথা। তারা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে আসেন চাকুরি করতে, খেলার উন্নয়নে নয়।

Hockey-2

ঘরোয়া হকি স্থবির থাকলেও আন্তর্জাতিক কয়েকটি আসর বাংলাদেশের সামনে। মার্চে ওমানে বসবে এশিয়ান গেমস হকির বাছাই পর্ব। এপ্রিলে থাইল্যান্ডে আছে যুব অলিম্পিক গেমস হকির বাছাই পর্ব। বাংলাদেশ চাইলে জুলাইয়ের এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিও আয়োজন করতে পারবে।

বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আবদুস সাদেক অবশ্য এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজনে আগ্রহী নন। কারণ ঘরোয়া খেলা নেই, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট করে কী হবে? তবে থাইল্যান্ড আর ওমানের টুর্নামেন্ট দুটিতে অংশ নেবে বাংলাদেশ। শুক্রবার শুরু হচ্ছে এশিয়ান গেমস হকির বাছাই পর্বের প্রস্তুতি। যুব অলিম্পিক গেমসের বাছাই পর্বে অংশ নেয়া প্রসঙ্গে আবদুস সাদেক বলেছেন, ওখানে আমরা অবশ্যই খেলবো। এন্ট্রি নিশ্চিত করেছি।’

এশিয়া কাপের পর একটি তারিখ দিয়েও ঘরোয়া হকির দলবদল আয়োজন করতে পারেনি ফেডারেশন। বিজয় দিবস হকি হবে- এমন ঘোষণা দিয়েও পিছু হটেছে মেয়াদ শেষ হওয়া কমিটি। এখন তারা নামছে আরেকটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট অংশ নেয়ার মিশনে। যে আন্তর্জাতিক খেলাগুলো সামনে সেগুলোতে অংশ নেয়া জরুরী। তবে ঘরোয়া হকি, বিশেষ করে লিগ না হওয়ায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে খেলোয়াড় তৈরির পথ।

আরআই/আইএইচএস/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :