উঁকি মারছেন মাবিয়া-হামিদুলদের উত্তরসূরিরা

রফিকুল ইসলাম
রফিকুল ইসলাম রফিকুল ইসলাম , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৩:৫৪ পিএম, ১৫ এপ্রিল ২০২১

মাবিয়া আক্তার সীমান্ত আর জিয়ারুল ইসলাম নেপাল থেকে জিতে এসেছিলেন এসএ গেমসের স্বর্ণ। তার আগের এসএ গেমসে লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে কেঁদেছিলেন মাবিয়া। এ নারী ভারোত্তলক দক্ষিণ এশিয়ান গেমসের পরপর দুই আসরে দেশকে এনে দিয়েছে সোনার পদক। তার আগে দক্ষিণ এশীয় গেমস থেকে ভারোত্তোলনে স্বর্ণ জিতেছেন হামিদুল ইসলাম। দেশের সম্ভাবনাময় ডিসিপ্লিন ভারোত্তলনে আগামীর তারকা কারা?

এই তো কয়েকদিন আগেই শেষ হলো দেশের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বাংলাদেশ গেমসের নবম আসর। ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই গেমস কী শুধুই আয়োজনের জন্য ছিল? নাকি এই গেমসের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া গেছে আগামীর সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদ?

জাগোনিউজের পাঠকদের জন্য ভারোত্তলন দিয়েই শুরু হলো সেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

কতদিন খেলবেন? দেশের ভারোত্তলনের পোস্টাগার্ল মাবিয়াকে জিজ্ঞেস করলেই উত্তর দেন, ‘যতদিন পারবো খেলবো।’ ঠিক আছে, মন চললে, শরীর চললে তো খেলবেনই। কিন্তু তারও একটা শেষ আছে। সেই শেষের আগে মাবিয়া আক্তার সীমান্তও চান তার মতো আরো ভারোত্তোলক উঠে আসুক, যারা আগামীতে আন্তর্জাতিক প্লাটফর্ম থেকে দেশকে সম্মান এনে দিতে পারবেন।

ফেডারেশনগুলো আয়োজিত জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই উঠে আসে নতুন নতুন খেলোয়াড়। বাংলাদেশ গেমস ও বাংলাদেশ যুব গেমসের মতো বড় আসরে অংশ নিয়ে প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদরা তাদের মেধার বিকাশ ঘটান। নতুনের কেতন উড়িয়ে তারা জানান দেন ‘আমরা আসছি।’ এবারের বাংলাদেশ গেমসও উপহার দিয়েছেন সে রকম কিছু প্রতিভা।

Jagonews

নবম বাংলাদেশ গেমসে রেকর্ড হয়েছে ৬০ টি। যার মধ্যে ভারোত্তলনেই হয়েছে ৩৫টি- ১৯টি ছেলেদের, মেয়েদের ১৬টি। ছেলে ও মেয়েদের ২০ ইভেন্টে ৩৫ রেকর্ডই বলে দিচ্ছে ভারোত্তলকদের পারফরম্যান্সের পারদ ওপরের দিকে, যা আশাবাদী করে তুলছে সবাইকে।

হামিদুল ইসলাম, মোস্তাইন বিল্লাহ, বাকি বিল্লাহ, জিয়ারুল ইসলাম, মাবিয়া আক্তার সীমান্ত, মোল্লা সাবিরা সুলতানা, ফাহিমা আক্তার ময়না, ফুলপতি চাকমা, জহুরা খাতুন নিশা দেশের ভারোত্তলনে পরিচিত মুখ। দেশের সবচেয়ে বড় গেমসে তারা নিজ নিজ ইভেন্টে শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছেন। তাহলে আগামীর মাবিয়া, হামিদুল, জিয়ারুল হবেন কারা? গেমসের পর এ হিসাব-নিকাশ ওঠাটা স্বাভাবিক।

দেশের সিনিয়র কোচ শাহরিয়া সুলতানা সূচির চোখে এবার যে কয়কজন নতুন ভারোত্তলক আগামনীবার্তা দিয়েছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- জাকারিয়া মোড়ল, আশিকুর রহমান, মনিরা কাজী, ফারজানা আক্তার রিয়া ও মারজিয়া আক্তার ইকরা। রিয়া ও ইকরার মধ্যে রিয়া ৭১ কেজিতে স্বর্ণ জিতেছেন। ইকরা স্বর্ণের লড়াইয়ে সিনিয়র খেলোয়াড় ফুলপতি চাকমার কাছে হারলেও দুর্দান্ত লড়াই করেছেন ৫৫ কেজিতে।

সম্ভাবনাময় এই দুই নারী ভারোত্তলক উঠে এসেছেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ট্যালেন্ট হান্টিং কর্মসূচির মাধ্যমে। শাহরিয়া সুলতানা সূচি জানালেন, ‘এই মেয়েরা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচির মাধ্যমে উঠে আসার পর প্রথমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক চাকরি করেন। এখন স্থায়ীভাবে চাকরি করছেন দেশের সবচেয়ে বড় এই সার্ভিসেস প্রতিষ্ঠানে। তাদের মধ্যে অনেক সম্ভাবনা। রিয়া ৭১ কেজিতে ক্লিন অ্যান্ড জার্কে রেকর্ড ৭৮ কেজি উত্তোলনসহ মোট ১৭৮ কেজি তুলে স্বর্ণ জিতেছেন। ইকরা ৫৫ কেজিতে রৌপ্য জিতলেও রেকর্ড করেছেন স্ন্যাচে ৬৭ কেজি তুলে।’

নারী ভারোত্তলকদের মধ্যে আগামীর তারকা হওয়ার লাইনের সামনে দাঁড়িয়ে মনিরা কাজী। গোপালগঞ্জের মুকসুদপরের এই ভারোত্তালককে মাবিয়া আক্তার সীমান্তের চেয়ে বেশি দূরে দেখছেন না তার কোচ শাহরিয়া সুলতানা সূচি, ‘আমি মাবিয়ারও কোচ ছিলাম, এখন মনিরা কাজীর কোচ। আমি মনিরার মধ্যে দেখছি অনেক সম্ভাবনা। আমরা যদি আগামীর মাবিয়া খুঁজতে চাই তাহলে সেটা এই মনিরা কাজীর মধ্যেই আছে।’

Jagonews

মনিরা কাজী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরি পেয়েছিলেন অ্যাথলেট হিসেবে। পরে তাকে ভারোত্তলনে নিয়ে আসেন শাহরিয়া সুলতানা সূচি। সেই মনিরা কাজীই এখন দেশের সম্ভাবনাময় নারী ভারোত্তালক।

বাংলাদেশ ভারোত্তলন ফেডারেশনের সহসভাপতি উইং কমান্ডার (অব.) মহিউদ্দিন আহমেদ আশাবাদী পাইপলাইনে অনেক খেলোয়াড় দেখে। ‘ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে ভালো ফলাফল পেতে পাইপলাইনে খেলোয়াড় থাকতে হবে। করোনার যে অবস্থা তাতে পরবর্তী এসএ গেমস কবে হবে তা নিশ্চিত নয়। তাই আমাদের এখন থেকেই পাইপলাইনে খেলোয়াড় রেখে তৈরি হতে হবে’- বলছিলেন দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারোত্তলনের অভিজ্ঞ এ সংগঠক।

সার্ভিসেস সংস্থাগুলোর প্রশংসা করে মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ আনসার, বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ জেল, ফায়ার সার্ভিস চাকরি দিয়ে অনেক খেলোয়াড়ের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। যে কারণে, নতুন খেলোয়াড় উঠে আসছে। বিভিন্ন স্থানে ভারোত্তলনে ট্রেনিং হচ্ছে। এবার বাংলাদেশ গেমসে ১০০ খেলোয়াড় অংশ নিয়েছে, ৬০ জন পদক পেয়েছে। নিয়মিত ট্রেনিং হয় বলেই গেমসে সবাই ভালো করেছে।’

দেশসেরা নারী ভারোত্তলক মাবিয়া আক্তার সীমান্তও আশাবাদী নতুন নতুন খেলোয়াড় উঠে আসায়। পরপর দুই এসএ গেমসে স্বর্ণজয়ী এ ভারোত্তলক এখন অলিম্পিক গেমসে খেলার স্বপ্ন দেখছেন। ‘কেউ সারাজীবন স্বর্ণ জিততে পারবে না। একজনের ফর্ম শেষ হবে, নতুন একজন আসবে। সেটাই নিয়ম। আমি চাই কেউ এসে আমাকে চ্যালেঞ্জ করুক। সেটা ভারোত্তলনের জন্য ভালো। এবারের বাংলাদশ গেমসে বেশ কয়েকজন নতুন খেলোয়াড় নজর কেড়েছেন। তারা আগামীতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালো করবেন বলেই আমার বিশ্বাস’- বললেন এসএ গেমসে স্বর্ণজয়ী ভারোত্তলক মাবিয়া আক্তার সীমান্ত।

মেয়েরা এখন আগের চেয়ে বেশি ভারোত্তলনে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এর একটা কারণ মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। মাবিয়া এসএ গেমসে স্বর্ণ পাওয়ার পর এ খেলায় মেয়েরা আসছে আগামীর মাবিয়া হতেই। মাবিয়া নিজেও ভারোত্তলনে মেয়েদের আগ্রহ বাড়ায় খুশি।

Jagonews

দেশের ভালোত্তলনের পাইপলাইন হিসেবে বড় ভূমিকা রাখছে বাগেরহাট জেলার ফকিরহাটের একটি ক্লাব। সাতশৈয়া ভারোত্তলন ক্লাবে প্রশিক্ষণ নেয়া ৬ জন এবার স্বর্ণ জিতেছে বিভিন্ন সংস্থার হয়ে বাংলাদেশ গেমসে অংশ নিয়ে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ হচ্ছেন- বাংলাদেশ আনসারের জাকারিয়া মোড়ল ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আশিকুর রহমান।

দুইজনের মধ্যেই দারুণ সম্ভাবনা দেখছেন সাতশৈয়া ভারোত্তলন ক্লাবের কোচ বিশ্বাস আনিসুর রহমান। সাবেক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন আনিসুর বলেছেন, ‘জাকারিয়া মোড়লকে আমি প্রশিক্ষণ দিয়ে ভারোত্তলক বানিয়েছি। ওর বয়স মাত্র ১৮ বছর। আরো ২-৩ বছর ট্রেনিং নিলে এসএ গেমসে স্বর্ণ পাওয়া সম্ভব তার পক্ষে। এমনকি আমি তাকে নিয়ে এশিয়ান গেমসেও আশাবাদী। ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১১১ কেজি তুলে রেকর্ড করেছেন। ১২৫-১৩০ কেজি তুলতে পারলে এসএ গেমসে ভালো করা সম্ভব।’

১০২ কেজিতে স্বর্ণজয়ী আশিকুর রহমানের মধ্যে যেমন সম্ভাবনা দেখছেন তৃণমূলের এই কোচ তেমন সম্ভাবনা দেখছেন ৭৩ কেজিতে অল্প ব্যবধানে অভিজ্ঞ ভারোত্তলক হামিদুল ইসলামের কাছে হেরে যাওয়া বাংলাদেশ আনসারের নাঈমুল ইসলামের মধ্যেও।

আরআই/আইএইএস/

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]