প্রতিভা অনেক, অভাব কেবল সুযোগ-সুবিধার

রফিকুল ইসলাম
রফিকুল ইসলাম রফিকুল ইসলাম , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৫:৩২ পিএম, ১৬ এপ্রিল ২০২১

এসএ গেমসে ফাতেমা মুজিবের স্বর্ণ জয়ের আগে দেশে ফেন্সিং খেলা আলোচনাতেই ছিল না। ২০০৭ সালে অ্যাসোসিয়েশন গঠন এবং পরের বছর ১০ জন খেলোয়াড় নিয়ে ট্রেনিং কার্যক্রম শুরু- বাংলাদেশের ফেন্সিংয়ের পথচলা শুরুর গল্পটা ওখানেই।

সর্বশেষ এসএ গেমসে অপরিচিত এই ডিসিপ্লিন থেকে স্বর্ণ আসার পর শুরু হয় খেলাটির খোঁজ-খবর নেয়া। নীরবে কার্যক্রম চালিয়ে খেলাটিকে হঠাৎ প্রচারের আলোয় নিয়ে আসেন ফাতেমা মুজিব নেপাল থেকে স্বর্ণ জিতে।

দেশে অনেক খেলাই আছে যাদের আন্তর্জাতিক কোনো সাফল্য না থাকলেও যুগযুগ ধরে ওই খেলার কর্মকর্তারা মোড়লগিরি করছেন ক্রীড়াঙ্গনে। বিদেশে কোনো গেমসে দল পাঠাতে গেলে বড় ভাগটা নিয়ে নেন তারা। অর্থ আছে, ভেন্যু আছে- কিন্তু সাফল্য নেই তাদের। সে তুলনায় ফেন্সিং স্বল্প সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও দেশকে উপহার দিয়েছে এসএ গেমসে স্বর্ণ।

Fencing

ফেন্সিং বলতেই সবার আগে আসে ফাতেমা মুজিবের নাম। তলোয়ার নিয়ে খেলা এই ডিসিপ্লিনটি পরিচিত পেয়েছে তার জন্যই। তাহলে ফাতেমার পর কি কেউ নেই যাকে নিয়ে আগামীতে আরো সাফল্য আশা করা যায়?

দেশের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর বাংলাদেশ গেমসের মাধ্যমে আগামী দিনের ফাতেমা মুজিবদের কী খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ ফেন্সিং অ্যাসোসিয়েশন?

ফেন্সিং কিভাবে খেলে জানেন না অনেকে। তলোয়ার হাতে লড়াই। না, রক্তারক্তি নয়। যে তলোয়ার নিয়ে খেলা হয় সেটাকে বলা হয় ব্লেড, তবে কোনো ধার থাকে না। মাথায় একটা বাটন থাকে। প্রতিপক্ষের শরীর স্পর্শ করলে বাতি জ্বলে এবং পয়েন্ট হয়। গায়ে থাকা জ্যাকেট ও পিস্টে (যার ওপরে খেলা হয়) থাকে কম ভোল্টের ইলেকট্রিক ডিভাইস। কৌশল আর প্রযুক্তি- দুয়ে মিলেই একজন দক্ষ খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের ওপর খবরদারী করতে পারেন।

জাতীয় ফেন্সিং দলের কোচ মো. আবু জাহিদ চৌধুরীর মতে বাংলাদেশে অনেক প্রতিভা আছে। কিন্তু অনুশীলন ও প্রতিযোগিতার সুযোগ কম। যে কারণে, সম্ভাবনা থাকার পর ফেন্সিং খেলাটি সেভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না।

গত এসএ গেমসের আগে ৫-৬ মাস অনুশীলন হয়েছিল ফেন্সিং দলের। বাংলাদেশের ফেন্সিংয়ের ইতিহাসে প্রথম ক্যাম্প ছিল ওটা। এরপর নিজ নিজ সংস্থায় অনুশীলন করা ছাড়া ক্যাম্প কি সেটা দেখেননি ফেন্সিং খেলোয়াড়রা।

Fencing

মজার বিষয় হলো মিরপুর শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে ফেন্সিংয়ের কার্যক্রম বলে খেলাটি যেন মিরপুর কেন্দ্রিকই হয়ে গেছে। খেলোয়াড়দের বেশিরভাগই মিরপুরের। জাতীয় দলের কোচের দেয়া তথ্য অনুযায়ী যে ২৪ জনের জাতীয় দল নেপালে গিয়েছিল এসএ গেমেস তার বেশিরভাগই ছিলেন মিরপুরের ছেলে-মেয়ে।

২০১২ সাল থেকে ফেন্সিংয়ের প্রসার বেড়েছে সার্ভিসেস সংস্থাগুলোর কল্যাণে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ আনসার ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ফেন্সিংয়ে দল গঠনের পর থেকে খেলোয়াড়রা আর্থিক সুবিধা পেতে থাকেন। ছেলে-মেয়েদের আগ্রহও বাড়তে থাকে। তবে নিজ সংস্থার বাইরে আর কোথাও থেকে খেলোয়াড়দের কানাকড়িও আসে না।

এসএ গেমস থেকে ফেন্সিংয়ে পদক এসেছে ১১টি। যার মধ্যে একটি স্বর্ণ, ৩ টি রৌপ্য ও ৭ টি ব্রোঞ্জ। মেয়েদের সেভার এককে ফাতেমা মুজিব স্বর্ণ পান। রৌপ্য তিনটিই আসে ছেলেদে সেভার, ফয়েল ও ইপি ইভেন্ট থেকে।

বাংলাদেশ গেমসে ছেলে-মেয়ে মিলিয়ে ১৪৪ জন অংশ নিয়েছিলেন ফেন্সিংয়ে। লড়াই হয়েছে ১২ স্বর্ণ পদকের। এসএ গেমসে রৌপ্য জিতেছেন এবং ঘরের প্রতিযোগিতায় স্বর্ণ জিতে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন এমন কয়েকজন খেলোয়াড় নিয়েই আগামীর জন্য আশবাদী জাতীয় দলের কোচ।

ফাতেমা নিজের ইভেন্টে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছেন। ফয়েল ইভেন্টে বাংলাদেশ আনসারের কামরুন নাহার সবার নজর কেড়েছেন। ইপি ইভেন্টে স্বর্ণজয়ী ২২ বছর বয়সী জামালপুরের এই নারীর মধ্যে সম্ভাবনা দেখছেন কোচ। কামরুন নাহার নিজেও আত্মবিশ্বাসী- আগামীতে দেশকে পদক উপহার দিতে পারবেন বলে।

Fencing

এসএ গেমসে ফয়েল ইভেন্টে দুটি ব্রোঞ্জ জেতা মহিমা বাংলাদেশ গেমসে জিতেছেন স্বর্ণ। ছেলেদের ইপিতে এসএ গেমসে রৌপ্য জেতা ইমতিয়াজ ও ছেলেদের সেভার ইভেন্টে এসএ গেমেস রৌপ্য জেতা বিপুলও বাংলাদেশ গেমসে সবাই পরাস্ত করেছেন। নেফাউর নামের আরেক খেলোয়াড়ও গেমসে স্বর্ণ জিতে চলে এসেছেন কোচের নজরে।

যে কোনো খেলায় আন্তর্জাতিক সাফল্য পেতে চাই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও বেশি বেশি প্রতিযোগিতা। এ জায়গাতেই বড় ঘাটতি ফেন্সিংয়ে। এসএ গেমসে যে ২৪ জনকে পাঠানো হয়েছিল তার মধ্যে ১৯ জনেরই ছিল প্রথম বিদেশ সফর। এমনকি স্বর্ণজয়ী ফাতেমা মুজিবেরও।

জাতীয় দলেন কোচ মো. আবু জাহিদ বলেন, ‘ক্যাম্প হয় না, ট্রেনিং হয় না বলে দলও কমে যাচ্ছে। ফাতেমা ৪-৫ বছর ধরে ফেন্সিং খেলেন। অথচ নেপাল হলো তার বিদেশ সফরে অভিষেক। তারপর আর কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযেগিতায়ই খেলতে পারেনি ওরা। অথচ ফাতেমা ভারতের যে মেয়েকে হারিয়েছেন, গেমসে সেই মেয়েরা কিন্তু এই গত মার্চেই হাঙ্গেরি গিয়ে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ খেলে এসেছেন। আমাদের দেশে ফেন্সিংয়ে অনেক ট্যালেন্ট আছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। ছেলে-মেয়েরা যা পান তাদের প্রতিষ্ঠান থেকেই পান, ফেডারেশন বা কোনো পৃষ্ঠপোষকদের কাছ থেকে কিছু পান না।’

Fencing

ফেন্সিং খেলাও ব্যয়বহুল। যে পিস্টের ওপর খেলা হয় তার মূল্য ৮-১০ লাখ থেকে ২৪-২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। আর খেলোয়াড়দের জ্যাকেটসহ সবকিছু দিয়ে সাজাতে লেগে যায় প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকার জিনিসপত্র। দেশে এসব পাওয়া যায় না, আনতে হয় চীন থেকে। এসব সরঞ্জাম আবার টিকে সর্বোচ্চ এক থেকে দেড় বছর।

গেমসে স্বর্ণজয়ীদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী জামালপুরের কামরুন নাহার। বাংলাদেশ আনসারের এ খেলোয়াড় জীবনে অন্য কোনো খেলা খেলেনি। তার আপন মামা শহিদুল ইসলাম আনসারের ফেন্সিং কোচ। মামা একদিন সফিপুর আনসার ক্যাম্পে নিয়ে আসেন তাকে। সেটা ২০১৭ সালের ঘটনা। সেখানে কোচিং করে ওই বছরই বিজয় দিবস প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ব্রোঞ্জ জিতলে আনসার তাকে ৫০০০ টাকা করে ভাতা দিতে থাকে।

২০১৮ সালে ভাতা বৃদ্ধি পায় দ্বিগুনেরও বেশি। পরের বছর স্থায়ী চাকরি হওয়ার পর জায়গা হয় এসএ গেমসগামী জাতীয় দলে। প্রথম আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণে কামরুন্নাহার পান দলগত ব্রোঞ্জ। কামরুন নাহাররা ৪ বোন। কোনো ভাই নেই। বাবা-মায়ের ৩ নম্বও এই সন্তান এখন স্বপ্ন দেখেন ফেন্সিংয়ে।

Fencing

‘আসলে আমাদের ক্যাম্প হয় না, প্রতিযোগিতা বেশি হয় না। আমি ৫ বছরে মাত্র ৭ টি কম্পিটিশন করতে পেরেছি। এসএ গেমসের পর আর ক্যাম্প হয়নি। আমার আত্মবিশ্বাস আছে আগামী এসএ গেমসে আরো ভালো করার। কিন্তু প্রতিযোগিতায়, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে না পারলেতো নিজেকে প্রমাণ করা যাবে না’- বলছিলেন বাংলাদেশ গেমসে ইপি এককে স্বর্ণজয়ী কামরুন নাহার।

আরআই/আইএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]