ঋতুর সাথে সাথে বদলায় যে শহরের রং

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:১২ পিএম, ১০ নভেম্বর ২০২০

মো. ইয়াকুব আলী

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিকে বলা হয় ‘সিটি অব কালারস’। সত্যিকার অর্থেই সিডনি রঙের শহর। বছরজুড়েই কোনো না কোনো উৎসব লেগে থাকে। তার সাথে তাল মিলিয়ে বদলে যায় শহরের রং। এ ছাড়াও প্রকৃতির পরিক্রমায় ঋতু বদলের সাথে সাথেও বদল হয় শহরের রং।

করোনাকালে প্রাণবন্ত শহরটাই কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। তার মধ্যে কোনো প্রকার প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তাকে যেন এক অদ্ভুত বিষণ্নতা পেয়ে বসেছে। সিডনিতে দিনের বেলায় যানবাহন থেকে শুরু করে ফুটপাতগুলো থাকে লোকারণ্য। কিন্তু করোনাকালে তার সবই প্রায় ফাঁকা। বর্তমানে সে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও পুরোপুরি প্রাণ ফিরে আসেনি এখনো। কবে আসবে সেই বিষয়েও কোনো ধারণা আপাতত করা যাচ্ছে না।

jagonews24

বড়বড় উৎসবগুলোর মধ্যে প্রতিবছর ২৬ জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়া ডে, ফেব্রুয়ারি মাসে চাইনিজ নিউ ইয়ার, মে-জুন মাসজুড়ে চলে ভিভিড ফেস্টিভ্যাল, সেপ্টেম্বরে বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে ‘ফেস্টিভ্যাল অব উন্ডস’, অক্টোবর মাসে আছে হ্যালোইন, প্রায় ডিসেম্বর মাসজুড়েই চলে ক্রিসমাস। তবে সিডনির সবচেয়ে বড় ফেস্টিভ্যাল হচ্ছে ‘নিউ ইয়ার’কে বরণ করে নেওয়ার চোখ ধাঁধানো আতশবাজি।

এ ছাড়াও বাঙালিদের রয়েছে বছরজুড়েই বিভিন্ন ধরনের মেলা ও উৎসব। এভাবেই বছরজুড়ে সিডনির মানুষ ব্যস্ত রাখে নিজেদের। ঘড়ির কাটার আগে চলে। বছরের দিনগুলো শেষ হয়ে যায়। কিন্তু করোনা আসার পর বছরটা যেন অনেক লম্বা হয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটা ঠিকই চলছে। কিন্তু মনে হচ্ছে, সময় যেন তার টাট্টু ঘোড়া থামিয়ে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে।

jagonews24

অস্ট্রেলিয়া ডে এবং চাইনিজ নিউ ইয়ারের পর মে-জুনের সবচেয়ে বড় ফেস্টিভ্যাল ছিল ভিভিড। ঋতু পরিক্রমায় জুন মাস থেকে অস্ট্রেলিয়ায় শীতকাল শুরু হয়। তাই তখন শহরটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও কিছুটা মন্দাভাব পরিলক্ষিত হয়। সেই মন্দা ভাব কাটাতেই মে মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাসব্যাপী আয়োজন করা হয় এ ফেস্টিভ্যালের।

সারা সিডনি বৈদ্যুতিক বিভিন্ন বর্ণের আলোয় সেজে ওঠে। সিডনির অপেরা হাউসের দেয়ালে এবং ছাদে খেলা করে বিভিন্ন বর্ণের আলো। তার পাশেই রাতের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেন যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে বিভিন্ন প্রকারের আলোর ঝলকানিতে। তরঙ্গা জু’তে আলো দিয়ে বিভিন্ন প্রাণির প্রতিকৃতি বানানো হয়। ডার্লিং হারবারে বর্ণিল পোশাক পরে হেঁটে যায় ছয় মিটার উঁচু মেরি ডাইন।

jagonews24

ভিভিড শো দেখতে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক ভিড় করে সিডনি শহরে। রাতের পুরো সিডনি শহর যেন প্রাণ ফিরে পায়। রাতের সিডনির রাস্তাগুলো লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। পায়ে পায়ে মানুষ একটা প্রদর্শনী থেকে অন্য একটা প্রদর্শনীতে যায়। আলোর এ ঝলকানি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করে বাচ্চারা। কিছু সময়ের জন্য হলেও বাচ্চারা যেন রূপকথার রাজ্যে হারিয়ে যায়।

প্রতিদিন বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে শুরু হয়ে রাত সাড়ে দশটা অবধি চলে এ প্রদর্শনী। সিডনি হারবারের ছোট-বড় জাহাজগুলোও সাজে বিভিন্ন রঙে। অনেকেই জাহাজে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। ট্রেনে, বাসে অনেক মানুষ আসা-যাওয়া করে। খাবার দোকানগুলোতে থাকে লম্বা লাইন। গত বছর প্রায় দুই দশমিক চার মিলিয়ন দর্শনার্থী ভিভিড শো উপভোগ করেন, যেখান থেকে আয় হয় প্রায় ১৭২ মিলিয়ন ডলার।

jagonews24

এরপর সেপ্টেম্বরে সিডনির বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে চলে দিনব্যাপী ঘুড়ি উড়ানোর উৎসব। এটাকে বলা হয় ‘ফেস্টিভ্যাল অব উইন্ডস’। সকাল থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এ ঘুড়ি উড়ানোর উৎসব। ওয়েভারলি কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে চলে এ উৎসব। বাহারি রং আর আকৃতির ঘুড়িতে ছেয়ে যায় বন্ডাই সমুদ্রসৈকতের আকাশ। এ উৎসব দেখতে শতশত পর্যটক আসেন। ঘুড়ির সাথে সাথে তাদেরও মন হয়তো বা ঘুড়ি হয়ে কিছুক্ষণের জন্য হলেও বন্ডাই সৈকতের শীতল বাতাসে উড়ে বেড়ায়।

পাশাপাশি চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে অস্ট্রেলিয়ার কৃষ্টি এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন রকমের পরিবেশনা চলতে থাকে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে তাদের অভিভাবকরাও অনেক সময় ঘুড়ি কিনে নিয়ে ওড়াতে শুরু করেন। এভাবেই একটি দিন কেটে যায় বাতাসে বাতাসে। এ উৎসবের সময় বন্ডাই সমুদ্রসৈকত লোকারণ্য হয়ে যায়। এমনিতেই বন্ডাই সৈকত পর্যটকদের কাছে অনেক বড় আকর্ষণ উপরন্তু ফেস্টিভ্যাল অব উইন্ডস তাতে বাড়তি রং যোগ করে।

jagonews24

এরপর প্রতিবছর অক্টোবর মাসের ৩১ তারিখে পালন করা হয় হ্যালোইন উৎসব। সারা অস্ট্রেলিয়ায় এদিন বাচ্চারা বিভিন্ন রকমের সাজে এক বাসা থেকে অন্য বাসার দরজায় গিয়ে টোকা দিয়ে বলে ‘ট্রিক অর ট্রিট’। হ্যালোইনের আগে থেকেই দোকানগুলোয় হ্যালোইনের পোশাক থেকে শুরু করে ক্যান্ডি তোলা হয়। সেগুলো সবাই কিনে নিয়ে আসেন। বাচ্চারা সবাই বিভিন্ন ধরনের ভূত সাজে।

আবার অনেক অভিভাবকও বাচ্চাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য নিজেরাও ভূত সেজে বেরিয়ে পড়েন। কেউবা বালতি আবার কেউবা ব্যাগে চকোলেট সংগ্রহ করে। আশেপাশের পাড়া ঘুরে তারা অনেক চকোলেট সংগ্রহ করে। এসময় সবাই আগে থেকেই অনেক চকোলেট এবং ক্যান্ডি কিনে রাখেন। যাতে বাচ্চারা খালি হাতে ফিরে না যায়। দিনশেষে বাচ্চারা একগাদা চকোলেট আর ক্যান্ডি নিয়ে বাসায় ফেরে। চকোলেটের পরিমাণ দেখেই তার খুশিতে ডগমগ। এর পরদিন স্কুলে গিয়ে কে কী পরিমাণ চকোলেট পেয়েছে, সেটা নিয়ে গল্প করে।

চলবে...

লেখক: অস্ট্রেলিয়ার সিডনি প্রবাসী।

এসইউ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]