বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা বিশ্বের দরবারেও তুলে ধরতে হবে

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৫০ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০২১

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ট্যুরিজম বা পর্যটনশিল্প অনেক ভূমিকা রাখতে পারে। সেক্ষেত্রে পর্যটন সংশ্লিষ্ট লোকদের কর্মকাণ্ড পরিবেশবান্ধব হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনাগুলোও বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে হবে।

রোববার (১৪ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পর্যটন ভবনে ‘ইকোট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট’র ওপর দিনব্যাপী একটি কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা এই মতামত তুলে ধরেন। কর্মশালায় দেশের পর্যটন খাতের বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো নিয়েও আলোচনা করেন তারা। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি) এবং সমুদ্র সংরক্ষণকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘সেভ আওয়ার সি’ যৌথভাবে সাংবাদিকদের জন্য এ কর্মশালার আয়োজন করে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব জাবেদ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর দুই কোটি দেশি-বিদেশি পর্যটক ঘোরাফেরা করেন। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই সংখ্যা দেড়গুণ বাড়িয়ে তিন থেকে সাড়ে তিন কোটিতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে পর্যটন খাতকে আরও ব্যাপকতর করে তোলার জন্য ট্যুরিজম বোর্ড নানামুখী উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে আছে পর্যটন খাতকে ডিজিটালাইজড করা এবং মেরিন ও গ্রামীণ পর্যটনের উন্নয়ন। বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্টতা এই খাতের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।

Toursm

দিনব্যাপী এই কর্মশালায় পরিবেশবান্ধব টেকসই পর্যটনের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের ডিরেক্টর (মার্কেটিং, প্লানিং এবং পাবলিক রিলেশন) আবু তাহির মোহাম্মদ জাবের, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সন্তোষ কুমার দেব, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশেনোগ্রাফি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন মুন্না, ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাভেদ আহমেদ, ‘সেভ আওয়ার সি’র সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক এবং ‘সেভ আওয়ার সি’র পরিচালক (ওশেন এক্সপ্লোরার) এসএম আতিকুর রহমান। কর্মশালায় সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ ও আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক) মো. বোরহান উদ্দিন।

বাংলাদেশে পর্যটনের উন্নয়নে ট্যুরিজম বোর্ডের ভূমিকা শীর্ষক বক্তব্য তুলে ধরে আবু তাহির মোহাম্মদ জাবের বলেন, বাংলাদেশের পর্যটনকে কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য ২৭টি গাইডলাইন তৈরি করা হচ্ছে। মন্ত্রিসভায় এগুলো অনুমোদন করা হলে প্রকাশ করা হবে। গ্রামীণ এলাকায় যেন পর্যটনকে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সে লক্ষ্যেও কাজ চলছে।

পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য সরকার একটি আন্তর্জাতিকমানের ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে জানিয়ে ট্যুরিজম বোর্ডের এই ডিরেক্টর বলেন, আমরা এরই মধ্যে এই ইনস্টিটিউটের নাম ঠিক করে ফেলেছি। বঙ্গবন্ধু ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অস্থায়ী কার্যালয় স্থাপন করে আমরা এর কার্যক্রম শুরু করেছি।

আবু তাহির মোহাম্মদ জাবের বলেন, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ওয়েবসাইটে এরই মধ্যে পর্যটন সংক্রান্ত নানা তথ্য সংযোজন করা হয়েছে। এই ওয়েবসাইটে দেশের পণ্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও উদ্যোগের তথ্যের পাশাপাশি পর্যটনের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি, ট্যুর গাইড, হোটেল-মোটেল-রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে যাবতীয় সব তথ্য নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ গড়ে তোলার কাজ চলছে। পাশাপাশি আমরা এখন একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করতে কাজ করছি। অ্যাপে এসব তথ্যের পাশাপাশি ডিজিটাল ম্যাপ, ছবি, ভিডিও ও পর্যটন সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাবে। যেন দেশি-বিদেশি যে কেউ বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে এক অ্যাপেই সবকিছু পেয়ে যেতে পারেন।

Tourism

তিনি আরও বলেন, পর্যটন করপোরেশন এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয়। ডিজিটাল প্রচারণায় ইংরেজিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া চাইনিজ, জাপানিজ ও কোরিয়ান ভাষায় বাংলাদেশের পর্যটন সংশ্লিষ্ট তথ্য ব্রোশিয়ার আকারে ছাপানোর ব্যবস্থা হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ও প্রয়োজনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এসব ব্রোশিয়ার বিদেশি নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যেন তারা বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রহ পান ও এখানে বেড়াতে আসেন।

বাংলাদেশে পর্যটন নিয়ে কাজ করা ট্যুর অপারেটরদের কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা এখন পর্যন্ত নেই। তাদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করাও কষ্টসাধ্য কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গাইডলাইনও নেই। ফলে অনেক পর্যটকই এক্ষেত্রে নৈরাজ্যের শিকার হন বলে অভিযোগ তোলা হয়। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ট্যুরিজম বোর্ডের এই ডিরেক্টর বলেন, ট্যুর অপারেশন ও ট্যুর গাইড নিবন্ধন আইন পাসের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। চলতি সংসদ অধিবেশনেই এটি পাস হতে পারে। এই আইন পাস হলে নিবন্ধন ছাড়া কোনো ট্যুর অপারেটর কাজ করতে পারবে না। কোনো ট্যুর অপারেটর অন্যায় করলে তাকে আইনের আওতায় আনা যাবে।

ড. সন্তোষ কুমার দেব কথা বলেন ইকো ট্যুরিজম নিয়ে। ইকো ট্যুরিজমের নীতিমালা কী হওয়া উচিত, ইকো ট্যুরিজমের উপাদান কী কী, এটার চরিত্র বা ধরন কেমন, ইকো ট্যুরিজমের ফলে সামাজিক এবং পরিবেশগত প্রভাব কী তৈরি হতে পারে এবং বাংলাদেশে সমুদ্রনির্ভর পর্যটন কীভাবে সম্ভব, এর উন্নয়নে কার কী ভূমিকা নেওয়া উচিৎ সে সম্পর্কে বক্তব্য তুলে ধরেন তিনি।

সন্তোষ কুমার বাংলাদেশে পর্যটনের অপার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি জানান, এ দেশের আবর্জনা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা রয়েছে সবচেয়ে বেশি। বিদেশি একজন পর্যটক বাংলাদেশে একবার আসার পর এ কারণে দ্বিতীয়বার আসার চিন্তাও করেন না।

এসএম আতিকুর রহমান সমুদ্র পর্যটনের সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরেন কর্মশালায়। তিনি কথা বলেন পানির নিচের বৈচিত্র্য দেখার জন্য যে পর্যটন তথা আন্ডারওয়াটার ট্যুরিজম নিয়ে। স্কুবা ডাইভিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশেও যে পানির নিচের পর্যটনের দারুণ সম্ভবনা রয়েছে- সে ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে পানির নিচে গিয়ে পর্যটকরা কী করবেন, কীভাবে ছবি তুলবেন বা ভিডিওগ্রাফি করবেন- সে সম্পর্কে দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন আতিকুর রহমান।

ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন মুন্না কথা বলেন কোস্টাল ট্যুরিজম তথা উপকূলীয় পর্যটন নিয়ে। পর্যটনের এই সেক্টরে রয়েছে ম্যানগ্রোভ, উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য, বাস্তুতন্ত্র, সামুদ্রিক প্রাণী এবং পাখি। সে সঙ্গে উপকূলীয় পর্যটনে কিংবা সাগর পর্যটনে পর্যটকদের ব্যবহার কেমন হওয়া উচিত সে সম্পর্কে বক্তব্য তুলে ধরেন তিনি।

তিনি অভিযোগ করেন, সাগর ঘিরে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা থাকলেও একে রক্ষার উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। ড. মোসলিম উদ্দিন বলেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপে নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে নানা প্রজাতির মাছ, কাঁকড়া ও সামুদ্রিক নানা প্রাণীর পাশাপাশি নানা বৈচিত্র্যের সামুদ্রিক জীব, উদ্ভিদ ও কোরাল দেখা যেত। এর অধিকাংশই এখন বিলুপ্তপ্রায়।

তিনি আরও বলেন, সাগর হলো পৃথিবীর ফুসফুস। বিশ্বের যত দূষণ, তাপমাত্রার অধিকাংশই সাগর শোষণ করে নেয়। ফলে স্থলের প্রাণ-প্রকৃতি ভালো থাকে। তাই নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে টিকিয়ে রাখতে হলেও আমাদের সাগর রক্ষার কথা ভাবতে হবে। শুধু স্থলেই নয়, সমুদ্রের তলদেশেও উদ্ভিদ রোপণ, কোরাল ফার্ম স্থাপনের মাধ্যমে কোরাল রক্ষায় কাজ করতে হবে।

পরিবেশ, ইকো ট্যুরিজম, কোস্টাল ট্যুরিজম, আন্ডারওয়াটার ট্যুরিজমসহ এই সেক্টরের বিভিন্ন দিক নিয়ে কীভাবে রিপোর্টিং করতে হবে- তা নিয়ে সাংবাদিকদের জন্য বিভিন্ন দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক।

সর্বশেষ বাংলাদেশে পর্যটনের উন্নয়নে মিডিয়া কী ভূমিকা রাখতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন জাবেদ আহমেদ। তিনি কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবও দেন। কর্মশালা শেষে অশগ্রহণকারীদের মধ্যে সার্টিফিকেট বিতরণ করা হয়।

এসইউজে/এইচএ/এএসএম

বাংলাদেশে প্রতিবছর দুই কোটি দেশি-বিদেশি পর্যটক ঘোরাফেরা করেন। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই সংখ্যা দেড়গুণ বাড়িয়ে তিন থেকে সাড়ে তিন কোটিতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]