জোসনাকে খুঁজতে গিয়ে বৃষ্টির সঙ্গে সখ্যতা

রিপন দে
রিপন দে রিপন দে
প্রকাশিত: ০৫:২৭ পিএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। যা প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি। স্থানীয় লোকজনের কাছে হাওরটি ‘নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল’ নামে পরিচিত। দিন দিন পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এ হাওরে পূর্ণিমা রাতে পর্যটকদের মিলনমেলা বসে। দিনে টাঙ্গুয়ার নীল জলে হিজল-করচ গাছ উঁকি মেরে থাকে। আশেপাশের ছোট ছোট গ্রামগুলো একেকটি দ্বীপের মত। পাশেই ভারতের মেঘালয়ের উঁচু পাহাড়। যা দেখে মনে হবে দুটি দেশের মধ্যে একটি দেয়াল। পূর্ণিমা রাতে যখন আলো এসে স্বচ্ছ পানিতে প্রতিবিম্ব তৈরি করে; তা অনেকটা বিশাল এক আয়নার মত মনে হয়।

যে কারণে ‘বাঙ্গাল ট্রাভেলার্স’ উদ্যোগ নেয় টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে ঘুরে আসার। গ্রুপের পক্ষ থেকে ১ মাস আগে সিদ্ধান্ত নিলাম, সেপ্টেম্বরের পূর্ণিমা রাত কাটাব টাঙ্গুয়ার হাওরে। দুই দিন-এক রাতের পরিকল্পনা। দেখতে দেখতে ২৫ জনের টিম ৫২ জন হয়ে গেল। হাওরে গিয়ে দেখা গেল নৌকা সংকট। এত পর্যটক সেখানে যে, ২০-২৫ দিন আগে থেকেই কোন নৌকা পাওয়া যাচ্ছিল না। ৫ হাজার টাকার নৌকা ১০ হাজার টাকা দিয়েও মিলছিল না। আমরা অনেক কষ্টে দুটা নৌকা নিলাম ২৬ হাজার টাকা দিয়ে।

tangua

যাত্রার দিন ভোরে সবাই পৌঁছলাম সুনামগঞ্জে। নাস্তা সেরে আগে রিজার্ভ করা লেগুনায় উঠে তাহিরপুরের উদ্দেশে রওনা দিলাম। তাহিরপুরে আগে থেকেই স্থানীয় যুবক রাজনের মাধ্যমে মাছ কিনে রেখেছিলাম। তাহিরপুর পৌঁছে ১৬ কেজি বোয়াল এবং কালি বাউশ নিলাম প্রায় ৮ হাজার টাকা দিয়ে। সাথে চাল, ডাল, মসলা কিনে নিলাম আরও ৯ হাজার টাকায়। ডেকোরেটর থেকে রান্নার উপকরণ নিলাম ৮শ টাকায়। দুজন বাবুর্চি ৫ হাজার টাকা। লাইফ জ্যাকেট ভাড়া নিলাম।

আমাদের ২টি নৌকা রওনা দিলো হাওরের ওয়াচ টাওয়ারের দিকে। ওয়াচ টাওয়ারের পাশে হিজল-করচের মধ্যে নেমে অনেকক্ষণ সাঁতার কাটলাম। সেই ফাঁকে নৌকায় রান্না হয়ে গেল। নৌকার ছাদে বসে সবাই ডাল আর হাওরের বোয়াল মাছ দিয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। পরে রওনা দিলাম টেকের ঘাটের উদ্দেশে। এরমধ্যে শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টির মধ্যে সবাই নৌকার ভেতরে আশ্রয় নিলাম। টেকের ঘাটে পৌঁছার পর যখন বৃষ্টি থামল; তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে।

tangua

স্থানীয় বাজারে সবাই নিজেদের মত ঘোরাঘুরি করে রাতে নৌকার ছাদে শুরু হলো বিভিন্ন ধরনের গান। এরমধ্যেই আবার বৃষ্টি। সবাই নৌকার ভেতরে চলে গেলাম। গান, আড্ডা, কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে সময় কেটে গেল। বিশেষ ধন্যবাদ দিতে হয় সোহানুর রহমান সামসকে। তার সুরেলা কণ্ঠ এ ট্যুরে আমাদের সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিয়েছে।

রাতে হাওরের রাজহাঁস মাছের গরম গরম ভাজির সাথে মুড়িঘণ্ট খেয়ে যে যার মত পারি ২০ জনের জায়গায় ৩০ জন ঘুম দিলাম। তখন রাত ২টা। আমাদের সুপার স্লো বাবুর্চিকে রাতেই বলে দিয়েছিলাম, রাত থাকতেই যেন সকালের খিচুড়ি রান্না বসায়। আমরা ৭টার ভেতর নাস্তা শেষ করে সিরাজ লেক, লাকমাছড়া ঘুরে বারিক্কা টিলা যাব।

tangua

সকাল ৭টায় ঘুম থেকে উঠে দেখি বাবুর্চি সাহেব মাত্র নাস্তা বসাচ্ছেন। এরমধ্যে বৃষ্টি চলছেই। নাস্তা না করে নৌকা থেকে বের হওয়া ঠিক হবে না ভেবে তাড়াতাড়ি নাস্তা তৈরির তাগাদা দিলাম। আরেকটি সমস্যা হলো, সবাইকে আগে থেকে বলে দেওয়ার পরেও ৯০% ট্রিপ মেইট ছাতা সাথে নেননি। এরমধ্য অনেকেই নৌকা থেকে বের হয়ে যে যার মত বের হয়ে গেছেন। সর্বশেষ যারা ছিলাম, সবাই মিলে আলোচনা করে বের হলাম লাকমাছড়া আর সিরাজ লেক ঘুরতে। এরমধ্যে মাঝি জানাল, বারিক্কা টিলা যেতে তার ৫ ঘণ্টা লাগবে। কারণ মেঘালয় থেকে প্রচুর পানি নেমে এসেছে। যে কারণে নদীর উল্টা স্রোতে যেতে সময় লাগবে। ৫ ঘণ্টা যেতে, আসতে ৩ ঘণ্টা। তাহলে তাহিরপুর থেকে সুনামগঞ্জ যেতে সময় লাগবে আরও দুই ঘণ্টা।

কয়েকজনের বাসের টিকিট রাত ৮টায়। মাঝিকে কিছু ফাইনাল না করে ভাবলাম, আগে অন্তত ১-২টা জায়গা ঘুরে আসি। ঘুরে আসতে আসতে যারা নৌকা থেকে বের হয়ে গেছেন আগে; তারাও নৌকায় চলে আসবেন। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেব। চলে গেলাম লাকমাছড়া। এরমধ্যে একজন কল দিয়ে জানালেন, তিনি আমাদের না বলে নিজের মত করে আগেই বের হয়ে গেছিলেন। এভাবে আমরা কি বিচ্ছিন্নভাবে ঘুরব? বললাম, ২০ মিনিটে আসতেছি।

tangua

আসার পথে স্থানীয় কয়েকজন জানালেন, মাঝি যে সময় বলেছে তা ভুল। ৫ ঘণ্টা নয়, ৩ ঘণ্টা লাগবে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা চলে যাব বারিক্কা টিলা। নৌকার পাশে এসে দেখি, যিনি কল দিয়েছিলেন তার সাথে কয়েকজন মোটরসাইকেলে বারিক্কা টিলা যাবে। তারা চলে গেলেন। আমরা নৌকা নিয়ে রওনা দিলাম। এরমধ্যে আগে ঠিক করে রাখা লেগুনাকে বললাম, আমরা তাহিরপুর আর আসব না। বারিক্কা টিলার সাথে থাকা লাউরের ঘর থেকে উঠব।

বারিক্কা টিলা যেতে যেতে যাদুকাটা নদী দেখলাম। তার সামনেই মেঘালয়ের পাহাড়। পাহাড়ের উপর ঝরনা। দেখে আফসোস হয়, জায়গাটি আমাদের হলো না কেন? আবার মনে হয়, আমাদের হলে কি এভাবে রাখতে পারতাম! টাঙ্গুয়ার হাওরে যে পরিমাণ প্লাস্টিক পর্যটকদের ফেলতে দেখেছি, জানি না হাওর আর কয়দিন তার ভারসাম্য রাখতে পারবে।

শিমুল বাগানের পাশ দিয়ে আমরা চলে গেলাম বারিক্কা টিলা। শিমুল বাগান যাইনি। কারণ এখন সব সবুজ। শিমুল বাগান লাল হয় ফাগুনে। তার ওপর আমাদের হাতে সময় কম। রাত ৮টার ভেতর ফিরতে হবে সুনামগঞ্জ। বারিক্কা টিলায় ৩০ মিনিট কাটিয়ে আবার নৌকায় উঠে রওনা দিলাম।

tangua

আমরা গিয়েছিলাম জোসনা বিলাসে। বৃষ্টির জন্য জোসনা পাইনি। এমনকি রাতে নৌকার ছাদে বসতেও পারিনি। তাই সবার মাঝে একটা হতাশা কাজ করছিল। এক মাস আগে থেকেই প্লান ছিল, সারারাত নৌকায় বসে কাটাব। স্বপ্নভঙ্গ হলেও পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছেন সবাই।

সুনামগঞ্জ ফিরলাম সন্ধ্যা ৭টায়। কয়েকজন ছিল চট্টগ্রামের। তাদের টিকিট ৮টায়। তাদের বিদায় দিয়ে আমরা রাতের খাবার খেয়ে সাড়ে ৯টার গাড়িতে উঠব বলে ঠিক করলাম। স্থানীয় হোটেলে খেয়ে উঠলাম গাড়িতে। গাড়ির সিট ১৫ দিন আগেই বুক করেছিলাম। ছাড়ার আগ মুহূর্তে সুপারভাইজার জানাল, গাড়ি ঢাকা এয়ারপোর্ট পর্যন্ত যাবে। শোনার সাথে সাথে অনেকের মন্তব্য, যে গাড়ি মহাখালী যাবে না; সে গাড়িতে যাব না। দৌড়ে গেলাম কাউন্টারে। জানালাম যে, আমরা যখন বুক করি; তখন মহাখালী বলা ছিল। পরে কাউন্টার থেকে ড্রাইভারকে বলা হলো, যেন মহাখালী নামিয়ে দেয়।

অনেক অপূর্ণতা নিয়ে ট্যুর শেষ হয়েছে। যেমন- চাঁদ দেখতে না পারা, সারারাত হাওরের বুকে নৌকার ছাদে থাকতে না পারা, ইচ্ছেমত সব স্পটে সময় কাটাতে না পারা। তবুও বিশাল হাওরের বদলে যাওয়া চরিত্র থেকে আনন্দ এসেছে।

tangua

যারা যাবেন; তাদের জন্য উপদেশ। হাওরের রং প্রতি মুহূর্তে বদলায়। তাই পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে চলতে পারে এমন মানুষ বা সঙ্গী নিয়ে যাবেন। তবে এখানে নৌকা ভাড়াসহ প্রতি পদে পদে ঠকানোর চেষ্টা করা হবে। এখানে মাঝিদের আছে বিশাল সিন্ডিকেট।

হাওর আমাদের, আমরা একে রক্ষা করতে না পারলে তা আর টিকে থাকবে না। হাওরে গিয়ে প্লাস্টিক ফেলা, আতশবাজি করা শুধু নৈতিকতা বিরোধী নয়; অপরাধও বটে। তাই পরিবেশ রক্ষায় সচেতন থাকবেন।

এসইউ/এমকেএইচ

বিনোদন, লাইফস্টাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, ভ্রমণ, তারুণ্য, ক্যাম্পাস নিয়ে লিখতে পারেন আপনিও - [email protected]