ভ্রমণ

নীরবতার মাঝে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার যাত্রা

এল চালতেনের অপার পাহাড়ি সৌন্দর্য, বরফে মোড়া শৃঙ্গ, হাইকিংয়ের রোমাঞ্চ, শান্ত রাতের তারাময় আকাশ ও প্রকৃতির সাথে একান্ত আলাপের এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। এবারের যাত্রা যেন নিজের ভেতরের নীরবতাকে খুঁজে নেওয়ার এক গভীর আহ্বান। গন্তব্য আর্জেন্টিনার দক্ষিণে, প্যাটাগোনিয়ার বুকে লুকিয়ে থাকা এক অপার সৌন্দর্যের শহর এল চালতেন। নামটা শুনলেই মনে হয় যেন বাতাসে ভেসে থাকা কোনো পাহাড়ি গল্প। চারপাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়, দূরে নয়, একেবারে কাছে এত কাছে যে মনে হয় হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যাবে। এই শহরে ঢুকতেই প্রথম যে অনুভূতিটা হয়, তা হলো বিশালতার সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা। সেই ক্ষুদ্রতাই যেন এখানে সবচেয়ে সুন্দর হয়ে ওঠে। এল চালতেন এমন এক জায়গা, যেখানে প্রকৃতি কোনো দর্শনীয় বস্তু নয় বরং সে নিজেই জীবনের ছন্দ।

এল চালতেন শহরটি খুব বড় নয়, জনসংখ্যা মাত্র দুই হাজারের মতো। কিন্তু এই ছোট্ট শহরের বুকের ভেতর যে বিশালতা লুকিয়ে আছে, তা কোনো সংখ্যায় মাপা যায় না। এখানে বাড়িঘরগুলোও যেন প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে তৈরি রঙিন টিনের ছাদ, কাঠের দেওয়াল, আর প্রতিটি জানালা দিয়ে পাহাড়ের দিকে তাকানোর সুযোগ। সকালে ঘুম ভাঙলে জানালার বাইরে দেখা যায় মেঘে ঢাকা ফিটজ রয়, কখনো আবার পরিষ্কার আকাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার ধারালো চূড়া। শহরের প্রতিটি সকাল আলাদা, প্রতিটি বিকেল আলাদা, আর প্রতিটি সন্ধ্যা যেন পাহাড়ের সাথে একান্ত আলাপের সময়।

এখানকার আবহাওয়া ঠান্ডা, আর বাতাস যেন প্যাটাগোনিয়ার নিজস্ব ভাষায় কথা বলে। কখনো শান্ত, কখনো হঠাৎ তীব্র, আবার কখনো এমনভাবে ছুটে আসে যে মনে হয় সে তোমাকে পরীক্ষা করছে; তুমি কি সত্যিই প্রকৃতির সামনে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত। এই বাতাসই এল চালতেনের আত্মা। পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে, হিমবাহ ছুঁয়ে, বন পেরিয়ে সে শহরে ঢুকে পড়ে। হাঁটতে হাঁটতে যখন হঠাৎ জোরে বাতাস আসে, তখন আর বিরক্ত লাগে না; বরং মনে হয়, এই বাতাসই তো এই জায়গার স্বাক্ষর।

এল চালতেনকে বলা হয় আর্জেন্টিনার ট্রেকিংয়ের রাজধানী। এই নামটা শুধু গর্বের নয়, একেবারেই যথার্থ। শহরের প্রান্ত থেকেই শুরু হয়ে গেছে অসংখ্য হাইকিং ট্রেইল কোনোটা সহজ, কোনোটা কঠিন, কোনোটা আবার শুধু ধৈর্য আর সময়ের পরীক্ষা। ফিটজ রয়, সেরো টোরে, লাগুনা দে লস ত্রেস, লাগুনা তোরে—এই নামগুলো শুধু মানচিত্রের বিন্দু নয় বরং স্বপ্নের মতো জায়গা, যেগুলো দেখতে দেখতে হাঁটতে হয়, ঘাম ঝরাতে হয়, শ্বাস নিতে হয় গভীর করে। প্রতিটি ট্রেইল যেন একেকটা গল্প, যেখানে তুমি নিজেই প্রধান চরিত্র।

হাইকিং করতে করতে চারপাশে যে দৃশ্যগুলো ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে, তা ভাষায় ধরা কঠিন। কখনো ঘন বন, যেখানে সূর্যের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে মাটিতে পড়ে। কখনো খোলা প্রান্তর, যেখানে দূরে বরফে মোড়া পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে নীরব প্রহরীর মতো। কখনো আবার হিমবাহের ধারে এসে দাঁড়ালে মনে হয়, সময় এখানে থেমে গেছে হাজার হাজার বছর আগে। পায়ের নিচে পাথর, সামনে বরফ, আর মাথার ওপর আকাশ এই তিনের মাঝে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজেকে নতুন করে চিনতে শেখে।

এল চালতেন শুধু হাইকিংয়ের জায়গা নয়, এটি আত্মার জন্য এক বিশ্রাম। এখানে এসে কেউ শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া নিয়ে হাঁটে না; বরং হাঁটার মাঝখানেই থেমে যায়, বসে পড়ে, দূরে তাকায়। পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে অনেকেই চুপ করে থাকে দীর্ঘসময়। এখানে কথা কম, শোনার জায়গা বেশি। বাতাসের শব্দ, পাখির ডাক, দূরে হিমবাহের ভাঙার ক্ষীণ আওয়াজ সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সিম্ফনি তৈরি হয়।

এল চালতেনের ক্যাফেগুলো ছোট কিন্তু উষ্ণ। কাঠের ভেতর সাজানো, দেওয়ালে হাইকিং ম্যাপ, পুরোনো পর্বতারোহীদের ছবি। ভেতরে ঢুকলে ভেজা জ্যাকেট ঝোলানো, বুট শুকানোর দৃশ্য—সবাই যেন একই ভাষায় কথা বলে, হোক না ভাষা আলাদা। এখানে এসে বোঝা যায়, প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানুষদের মধ্যে এক অদ্ভুত মিল থাকে। তারা খুব বেশি কথা না বললেও চোখে চোখে অনেক কিছু বুঝে নেয়।

আরও পড়ুনফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের বিস্ময়কর ভ্রমণ আফ্রিকার মাসাই জাতিগোষ্ঠীর জীবনযাপন 

রকি ক্লাইমিংয়ের জন্যও এল চালতেন বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সেরো টোরে আর ফিটজ রয়ের খাড়া দেওয়াল বহু ক্লাইম্বারের স্বপ্ন। যদিও এই পাহাড়গুলো সহজ নয় বরং পৃথিবীর সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং শৃঙ্গগুলোর মধ্যে পড়ে, তবুও মানুষ এখানে আসে চেষ্টা করতে। কেউ সফল হয়, কেউ হয় না, কিন্তু সবাই কিছু না কিছু নিয়ে ফিরে যায় নিজের সীমা সম্পর্কে নতুন উপলব্ধিতে।

লস গ্লেসিয়ারেস ন্যাশনাল পার্কের প্রবেশদ্বার হিসেবে এল চালতেন এক বিশেষ ভূমিকা রাখে। এই পার্কের ভেতরে ঢুকলেই মনে হয়, পৃথিবীর আদিম কোনো অধ্যায়ে ঢুকে পড়েছি। বরফ, পাথর আর আকাশ এই তিনের গল্প এখানে হাজার হাজার বছর ধরে লেখা হচ্ছে। মানুষ এখানে অতিথি মাত্র। এই অনুভূতিটাই এল চালতেনকে আলাদা করে তোলে।

সন্ধ্যা নামলে শহরটা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। সূর্য পাহাড়ের পেছনে লুকিয়ে গেলে আকাশে রঙের খেলা শুরু হয় কমলা, গোলাপি, বেগুনি। ফিটজ রয় তখন একেবারে অন্যরকম লাগে, যেন আগুনে রাঙানো কোনো ভাস্কর্য। এই সময়টায় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। কথা বললে মুহূর্তটা নষ্ট হয়ে যাবে মনে হয়।

রাতে ঠান্ডা আরও বাড়ে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে তারাগুলো এত কাছের মনে হয় যে, মনে হয় হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। শহরের আলো কম, তাই আকাশ নিজের মতো করে ঝলমল করতে পারে। এই নীরব রাতগুলোতে মানুষ নিজের সাথে কথা বলে, পাহাড়ের সাথে কথা বলে, আর হয়তো জীবনের অনেক প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যায়; যেগুলো শহরের কোলাহলে কখনো শোনা যায় না।

এল চালতেন আসলে কোনো বিলাসী গন্তব্য নয়। এখানে পাঁচতারকা হোটেলের ঝলক নেই, শপিং মলের ভিড় নেই। কিন্তু এখানে আছে এমন এক সমৃদ্ধি, যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না। খোলা আকাশ, বিশাল পাহাড়, আর নিজের ভেতরের প্রশান্তি। যারা প্রকৃতিকে ভালোবাসেন, যারা একা হাঁটতে ভালোবাসেন, যারা পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অহংকার ভেঙে ফেলতে চান, এল চালতেন তাদের জন্য।

এই শহরে কয়েকদিন কাটানো মানে নিজের ভেতরের শব্দগুলো একটু ধীর করে দেওয়া। এখানে এসে মানুষ শিখে নেয়, সবকিছুর উত্তর দ্রুত পাওয়া জরুরি নয়। কিছু প্রশ্ন পাহাড়ের মতোই বিশাল, তাদের সামনে শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে থাকাই যথেষ্ট। এল চালতেন সেই নীরবতার শিক্ষা দেয়।

যখন এই শহর ছেড়ে যেতে হয়; তখন একটা অদ্ভুত ভার লাগে বুকের ভেতর। মনে হয়, কিছু একটা ফেলে যাচ্ছি এখানে। হয়তো নিজের কোনো অংশ। কিন্তু একই সাথে মনে হয়, এই পাহাড়গুলো আমাকে কিছু দিয়ে দিচ্ছে এক ধরনের স্থিরতা, যা শহরের জীবনে ফিরে গিয়ে খুব কাজে লাগে। এল চালতেন শুধু দেখা শেষ হলে শেষ হয়ে যায় না; সে মনে থেকে যায়, দীর্ঘদিন, হয়তো আজীবন।

এই যাত্রা তাই শুধু একটি জায়গায় যাওয়ার গল্প নয়। এটি প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়ার, বাতাসের সাথে হাঁটার, পাহাড়ের সাথে কথা বলার গল্প। এল চালতেন সেই জায়গা, যেখানে গিয়ে মানুষ আবার মানুষ হয়ে ফিরে আসে।

এসইউ