বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালের ৬ ডিসেম্বর শেয়ারবাজারকে আইসিইউতে ঢুকিয়ে দিয়েছে। যা ওই সরকারের পতনের দিন পর্যন্ত (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট) ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সেই আইসিইউতে প্রবেশ করে সংস্কারের নামে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের ‘অর্থনৈতিক গণহত্যার শিকারে’ পরিণত করেছে। যার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন বর্তমান ভয়াবহ দুর্বিষহ বাজার পরিস্থিতি।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. সাজ্জাদুল হক। এতে সংগঠনটির সভাপতি কাজী মো. নজরুলসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সাজ্জাদুল হক বলেন, এই সরকার ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের সময় ডিএসইএক্স সূচক ছিল ৬ হাজার ১৫ পয়েন্ট। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর যা নেমে এসেছে ৪ হাজার ৮৫০ পয়েন্টে। অর্থাৎ বিগত ১৭ মাসে সূচকের পতন হয়েছে এক হাজার ১৫০ পয়েন্টের উপরে। দৈনিক লেনদেন ১৪০০/১৫০০ কোটি টাকা থেকে ৩৫০ কোটিতে নেমেছে। এছাড়া মার্কেট পিই ৯ এর নিচে, যা বিশ্বের কোনো পুঁজিবাজারে নেই। পৃথিবীতে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে শেয়ারবাজার ১২ বছর আগে যেখানে ছিল তার চেয়েও খারাপ অবস্থায় গেছে।
তিনি বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকগুলো যদি তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতেন, তাহলে এতটা ভয়াবহ দিন দেখতে হতো না। পুঁজিবাজারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি না করে ১০ হাজার কোটি টাকার ফান্ড কেন, ১০ লাখ কোটি টাকা দিলেও কোনো ফল পাওয়া যাবে না। উল্টো সরকার আরও বিব্রতকর অবস্থায় পড়বে।
সাজ্জাদুল হক আরও বলেন, বিগত ১৭ মাসে বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর শেয়ারবাজারে উৎসাহমূলক কোনো একটা কাজ দেখাতে পারেনি, নিরুৎসাহিতমূলক কর্মকাণ্ড প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে করেছে। যার প্রমাণ হলো আন্তর্জাতিক মার্জার রুলস অনুসরণ না করে ৫টি ব্যাংক মার্জার করে ব্যাংকের আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডার বিনিয়োগকারীদের দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিগত ১৭ মাসে একটাও গ্রহণযোগ্য আকর্ষণীয় কোম্পানিকে আইপিওতে আনার সক্ষমতা দেখাতে পারেনি।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র শেয়ারবাজারের উন্নয়নে কিছু প্রস্তাবনা ও সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। এর মধ্যে রয়েছে-
১. আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে বিনিয়োগকারী সংগঠনের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা করে বিনিয়োগকারীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে সময়োপযোগী যুগান্তকারী প্রস্তাবনা থাকতে হবে। দলগুলোর ইশতেহারে সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাংকিং সেক্টরে,পুঁজিবাজারে এবং ইন্সুরেন্স সেক্টরে কী কী সংস্কার করবে, বিনিয়োগবান্ধব কোন কোন পদক্ষেপ রাখবে- তা পরিষ্কার করতে হবে।
২. পুঁজিবাজারে দৈনিক শেয়ার লেনদেনের ক্ষেত্রে একই শেয়ার দিয়ে নিটিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। এই নিয়ম ২০০৭ সালে বাজারে ইতিবাচকভাবে প্রচলিত ছিল। এতে বাজারে প্রতিটি কোম্পানির শেয়ারের একটি শক্তিশালী ও টেকসই মূল্যস্তর বজায় থাকবে। এই নিয়মটি মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকার হাউজদের অনৈতিক কমিশন প্রাপ্তির লোভের কারণে পুঁজিবাজারে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
আরও পড়ুনবছরের প্রথম কার্যদিবসে শেয়ারবাজারে বড় উত্থান বছরের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমেছে প্রায় ২ শতাংশ
৩. বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা, ক্ষমতা ও প্রটোকল সমান সমান করতে হবে। এতে দেশের পুরো আর্থিক খাত এবং পুঁজিবাজারে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের অযাচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত মুরুব্বিয়ানা দূর হয়ে সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে।
৪. পাঁচ ব্যাংক মার্জারের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই ৫টি ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের ফেসভ্যালু ১০ টাকা প্রদান করতে হবে অথবা নতুন সম্মিলিত ব্যাংকের সমপরিমাণ শেয়ার প্রত্যেক শেয়ারহোল্ডারকে প্রদান করতে হবে। এছাড়াও বর্তমান সরকারের দুই মাস মেয়াদে ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। নতুন নির্বাচিত সরকার এসে মার্জার ও অবসায়ন সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেবে। আগামী দুই মাস বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কেবলমাত্র তার রুটিন ওয়ার্ক সম্পাদন করতে পারবেন।
৫. আগামী ৩ মাসের মধ্যে পদ্মা সেতু পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্ত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সেতু বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর বিন্দুমাত্র শৈথিল্যতা বরদাশত করা হবে না। এছাড়া নেসলে, ইউনিলিভারসহ অন্যান্য মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, মেটলাইফ, অপসোনিন, এসকেএফ সহ সরকারি লাভজনক স্বায়ত্তশাসিত কোম্পানি, দেশের অন্যান্য লাভজনক কোম্পানি বাজারে অবিলম্বে তালিকাভুক্ত করলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবে।
৬. কোনো কোম্পানি ৫০ কোটি টাকা ক্যাপিটাল রেইজ (মূলধন সংগ্রহ) করতে হলে কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবে না। তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে মূলধন সংগ্রহ করতে হবে। এতে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে এবং পুঁজিবাজারে ভালো ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়ে বাজারকে টেকসই ও গতিশীল ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করবে।
৭. কোনো কোম্পানির ইপিএস, এনএভি, নেট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো পজিটিভ থাকার পরও নো ডিভিডেন্ড বা ১০ পয়সা, ২৫ পয়সা লভ্যাংশ ঘোষণা করলে ওই কোম্পানিকে জেড গ্রুপে না পাঠিয়ে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ওই কোম্পানির সব পরিচালকের শেয়ার ফ্রিজ করে পুরো বোর্ড ভেঙে নতুন বোর্ড গঠন করতে হবে। এর ফলে অন্য কোম্পানি এ ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি করার সাহস করবে না।
৮. বিএসইসির কাজের স্বচ্ছতা, আইপিও অনুমোদনের স্বচ্ছতা এবং বাজারে ইতিবাচক অবদান রাখার জন্য একটি শক্তিশালী অ্যাডভাইজরি কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দুইজন, হাইকোর্ট বিভাগের দুইজন আইনজীবী, অডিট ফার্ম থেকে দুইজন, লিস্টেড কোম্পানি অ্যাসোসিয়েশন থেকে দুইজন, বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ থেকে দুইজন ও দুইটি স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে দুইজন প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৯. বিগত ১৭ বছরে রাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামোর পলিসি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে উল্লেখ করার মতো যোগ্য একজনও দায়িত্বে আসেননি, যিনি দেশের অর্থনীতিকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিস্থাপন করবেন। আগামী দিনগুলোতে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও মতামতের ভিত্তিতে একটি মেধাভিত্তিক সার্চ কমিটির মাধ্যমে (নির্বাচন কমিশনের আদলে) বিএসইসি চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ দিতে হবে।
১০. বিএসইসি বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল থেকে ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত যেসব বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের ওই তহবিল থেকে নতুন ফান্ড বরাদ্দ করার দাবি জানানো হয়।
এমএএস/কেএসআর